সম্পাদকের পাতা

২০২৬ বিশ্বকাপে যত অঘটন!

নজরুল মিন্টো

বিশ্বকাপ শুরু হয়েছিল একটি বল দিয়ে, শেষ হলো ট্রফি, রাজনীতি, হাতাহাতি আর একটি রহস্যময় করমর্দনের গল্প দিয়ে। মাঝখানের ৩৯ দিনে কখনও রেফারির সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, কখনও রাষ্ট্রক্ষমতা ঢুকে পড়েছে ফুটবলের নিয়মে। কানাডা, মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্রে আয়োজিত প্রথম ৪৮ দলের বিশ্বকাপটি তাই শুধু স্পেনের শিরোপা জয়ের গল্প নয়। এটি একই সঙ্গে গোল, ভুল, অবিচার, ক্ষমতা, কৌশল, প্রতিবাদ, গুজব এবং অবাক করা সব কাণ্ডের এক বিশাল সংকলন।

শুরু থেকেই আয়োজনটি আকারে ছিল দৈত্যের মতো। তিন দেশের ১৬টি শহর, ৪৮টি দল এবং ১০৪টি ম্যাচ। এক শহর থেকে আরেক শহরের দূরত্ব কখনও এত বেশি ছিল যে, বিশ্বকাপ ফুটবলের চেয়ে বিমানবন্দরের বিজ্ঞাপন বলেও ভুল হতে পারত। দল, সাংবাদিক ও সমর্থকদের পাড়ি দিতে হয়েছে হাজার হাজার কিলোমিটার। এর সঙ্গে যোগ হয় ব্যয়বহুল হোটেল, যাতায়াতের ঝামেলা এবং আকাশছোঁয়া টিকিটের দাম।

ফিফা বিশ্বকাপকে “সবার জন্য” আয়োজন হিসেবে তুলে ধরলেও অনেক সাধারণ সমর্থকের কাছে টিকিটের মূল্য ছিল নাগালের বাইরে। প্রবল সমালোচনার পর সীমিতসংখ্যক কম দামের টিকিট ছাড়তে বাধ্য হয় ফিফা। কিন্তু তত দিনে প্রশ্ন উঠে গেছে, বিশ্বকাপ কি ফুটবলপ্রেমীদের উৎসব, নাকি বড়লোক দর্শকদের বিলাসবহুল বিনোদন?

এবারের বিশ্বকাপে মাঠের ফুটবলের মতো টিকিটের দামও বহুবার দর্শকদের চমকে দিয়েছে। ফাইনালের সর্বোচ্চ শ্রেণির টিকিটের প্রাথমিক সরকারি মূল্য ছিল ৬ হাজার ৭৩০ মার্কিন ডলার। কিন্তু ফিফার ডায়নামিক প্রাইসিংয়ের কারণে শেষ দিকে সংস্থাটির বিক্রয় প্ল্যাটফর্মে কোনো কোনো টিকিটের মূল্য প্রায় ৩২ হাজার ডলার বা ৩৯ লাখ বাংলাদেশি টাকায় পৌঁছে যায়। আরও বিস্ময়কর ঘটনা ঘটে পুনর্বিক্রয় বাজারে। সেখানে ফাইনালের একটি টিকিটের জন্য সর্বোচ্চ ২৩ লাখ মার্কিন ডলার, অর্থাৎ ২৮ কোটি টাকার বেশি দাম চাওয়া হয়েছিল। তবে ওই দামে টিকিটটি সত্যিই বিক্রি হয়েছিল কি না, তা নিশ্চিত নয়। এত ব্যয় ও সমালোচনার পরও ১০৪টি ম্যাচে দর্শক-উপস্থিতির যোগফল ছিল ৬৮ লাখ ১০ হাজার ৯৬৬। যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর ভিসানীতির কারণে কয়েকটি দেশের বহু সমর্থক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বিশ্বকাপে যেতে পারেননি। তারপরও বিশ্বকাপে এটি একটি রেকর্ড। এছাড়া ঘরে বসে টেলিভিশন ও ডিজিটাল মাধ্যমে দেখেছেন আনুমানিক ৫০০ থেকে ৬০০ কোটি দর্শক। শুধু স্পেন ও আর্জেন্টিনার ফাইনালই বিশ্বজুড়ে প্রায় ১৫০ থেকে ১৮০ কোটি মানুষ দেখেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিশ্বকাপের উন্মাদনা অবশ্য আয়োজক তিন দেশের সীমানায় আটকে থাকেনি। বাংলাদেশ প্রতিযোগিতায় না থাকলেও ঢাকার টিকাটুলির একটি সরু গলি ৪৮ দলের পতাকা ও ফুটবল তারকাদের প্রতিকৃতিতে সাজিয়ে তৈরি করা হয় ‘ফিফা গলি’। সেখানে বিভিন্ন দলের সমর্থকদের রসিক তর্কও দর্শকদের বিনোদনের অংশ হয়ে ওঠে। অন্যদিকে ২৮ বছর পর বিশ্বকাপে ফেরা স্কটল্যান্ডের সমর্থকেরা বোস্টনে এমন উৎসব শুরু করেন যে, কয়েকটি পানশালায় বিয়ারের সরবরাহ প্রায় শেষ হয়ে যায়। বিশ্বকাপ দেখতে আসা এক স্কটিশ যুগল আবার বোস্টন সিটি হলে বিয়ে করে ফুটবলের সফরকেই জীবনের নতুন অধ্যায়ে পরিণত করেন।

আয়োজনের বিশালত্বের সঙ্গে পাল্লা দিতে এবার প্রকৃতিও যেন নিজের শক্তি দেখাতে শুরু করে। উত্তর আমেরিকার কোনো কোনো শহরে সূর্য এমনভাবে তাপ ছড়িয়েছে যে, বলের সঙ্গে খেলোয়াড়দের লড়াইয়ের আগে শুরু হয়েছে গরমের সঙ্গে টিকে থাকার পরীক্ষা। যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি অঞ্চলে তাপমাত্রার অনুভূতি ১০৫ থেকে ১১৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত পৌঁছানোর আশঙ্কা তৈরি হয়।

মাঠের ভেতরে এবারের বিশ্বকাপের অন্যতম বড় খলনায়ক ছিল VAR। ক্রোয়েশিয়া ও পর্তুগালের ম্যাচে ক্রোয়েশিয়ার একটি গোল ভিডিও পর্যালোচনার পর বাতিল হয়। শেষ পর্যন্ত ২-১ ব্যবধানে হেরে বিদায় নেয় তারা। মিসরও আর্জেন্টিনার বিপক্ষে নিজেদের অবিচারের শিকার বলে দাবি করে। একদিকে প্রযুক্তি বলেছে, সে ভুল কমাতে এসেছে। অন্যদিকে সমর্থকেরা আবিষ্কার করেছেন, গোলের পর সঙ্গে সঙ্গে আনন্দ করা এখন ঝুঁকিপূর্ণ। আগে গোল হলে দর্শক লাফিয়ে উঠতেন, এখন প্রথমে স্ক্রিনের দিকে তাকান।

তবে এবারের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনায় বাঁশির ওপর এসে পড়ে রাষ্ট্রক্ষমতার ছায়া। বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার বিপক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের ফরোয়ার্ড ফোলারিন বালোগুন লাল কার্ড দেখেন। নিয়ম অনুযায়ী তাঁর পরের ম্যাচে খেলার কথা ছিল না। কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোকে ফোন করে সিদ্ধান্তটি পর্যালোচনার অনুরোধ করেন। এরপর ফিফা লাল কার্ড বহাল রেখেও এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা এক বছরের পরীক্ষাকালীন সময়ের জন্য স্থগিত করে দেয়।

ফলে বেলজিয়ামের বিপক্ষে খেলতে নামেন বালোগুন। বেলজিয়াম ক্ষুব্ধ হয়ে জানতে চায়, একজন রাষ্ট্রপ্রধানের ফোন কি এখন আপিলের নতুন পদ্ধতি? শেষ পর্যন্ত অবশ্য ফোন, ক্ষমতা কিংবা বিশেষ ছাড় কোনোটিই যুক্তরাষ্ট্রকে রক্ষা করতে পারেনি। বেলজিয়ামের কাছে ৪-১ গোলে হেরে বিদায় নেয় স্বাগতিকেরা। বেলজিয়ান খেলোয়াড়েরা পরে ট্রাম্পের পরিচিত নাচের ভঙ্গি নকল করে উদ্‌যাপন করেন। ফুটবল সেদিন সম্ভবত নিজস্ব ভাষায় বলেছিল, ক্ষমতা দিয়ে নিষেধাজ্ঞা সরানো যায়, স্কোরবোর্ড নয়।

বিশ্বকাপের মাঠে নরওয়ের সাফল্য ইংল্যান্ডের সাবেক অধিনায়ক ওয়েন রুনিকেও শেষ পর্যন্ত বৈঠা হাতে নামিয়ে দেয়। রুনি ঘোষণা করেছিলেন, নরওয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠলে তিনি নদীতে নৌকা চালাবেন। নরওয়ে ব্রাজিলকে হারিয়ে শেষ আটে পৌঁছানোর পর আর্লিং হালান্ড তাঁকে সেই প্রতিশ্রুতির কথা মনে করিয়ে দেন। কথার দাম রাখতে রুনি শেষ পর্যন্ত নিউইয়র্কের হাডসন নদীতে নৌকা চালিয়ে বাজির শর্ত পূরণ করেন। ফুটবলজীবনে প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভাঙতে অভ্যস্ত রুনিকে এবার স্রোতের বিপরীতে বৈঠা চালাতে দেখে সামাজিক মাধ্যমেও হাসির ঢেউ ওঠে।

নরওয়ের আর্লিং হালান্ডের গোলের পাশাপাশি তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কাণ্ডকারখানাও আলোচনায় ছিল। আরও বড় চমক হয়ে ওঠে লামিন ইয়ামালের তিন বছরের ছোট ভাই কেইন। কখনও গ্যালারিতে তার মুখভঙ্গি, কখনও বড় ভাইকে দেখে উচ্ছ্বাস, কখনও ক্যামেরার সামনে শিশুসুলভ আচরণ সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ফাইনালের পর সে গোলের জালের একটি অংশ হাতে নিয়ে ইয়ামালের কাছে ছুটে যায়, পুলিশের বড় টুপি মাথায় পরার চেষ্টা করে এবং ট্রফির পাশে এমন স্বচ্ছন্দে ঘোরে, যেন স্পেনের শিরোপা জয়ের পরিকল্পনাটি তারই করা।

বিশ্বকাপের শেষ দিনটি যেন গোটা আয়োজনের সংক্ষিপ্ত সংস্করণ। ফাইনালের বিরতিতেও ফুটবলের পাশাপাশি বয়সকে হার মানানোর এক প্রদর্শনী দেখা গেল। মঞ্চে ছিলেন ৬৭ বছর বয়সী ম্যাডোনা এবং ৪৯ বছর বয়সী শাকিরাসহ বিশ্বের কয়েকজন জনপ্রিয় শিল্পী। তাঁদের প্রাণবন্ত পরিবেশনা দেখে সামাজিক মাধ্যমে অনেক দর্শকের রসিক প্রশ্ন ছিল, ম্যাডোনা ও শাকিরার বয়স কি সত্যিই বাড়ে, নাকি ক্যালেন্ডারই তাঁদের হিসাব রাখতে ভুলে গেছে? ফুটবল মাঠে যেখানে তরুণদের গতি নিয়ে আলোচনা চলছিল, সেখানে বিরতির মঞ্চে দুই শিল্পী বুঝিয়ে দিলেন, তারুণ্য সব সময় জন্মসনদের হিসাব মেনে চলে না।

ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে দ্বিতীয়বার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয় স্পেন। শেষ বাঁশির পর স্পেন যখন উদ্‌যাপনে ব্যস্ত, তখন দুই দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি ও সংঘর্ষ শুরু হয়। আর্জেন্টিনার লিয়ান্দ্রো পারেদেস স্পেনের এক খেলোয়াড়কে মাটিতে ফেলে দেন এবং ম্যাচ শেষ হওয়ার পরও লাল কার্ড দেখেন। নাহুয়েল মোলিনা, এরিক গার্সিয়া, থিয়াগো আলমাদাসহ আরও কয়েকজন উত্তেজনায় জড়িয়ে পড়েন। ফিফা ঘটনাটি নিয়ে শৃঙ্খলামূলক তদন্ত শুরু করেছে।

এরপর মঞ্চে আসেন ট্রাম্প ও ইনফান্তিনো। গ্যালারি থেকে ট্রাম্প ও ইনফান্তিনোর উদ্দেশে প্রতিবাদসূচক চিৎকার ও বিদ্রূপ শোনা গেলেও, ট্রফি হস্তান্তরের পর ট্রাম্প বিজয়ী খেলোয়াড়দের পাশেই দাঁড়িয়ে থাকেন। মুহূর্তটি অনেককে আগের বছরের ক্লাব বিশ্বকাপের দৃশ্য মনে করিয়ে দেয়। শেষ পর্যন্ত তাঁকে সরে যাওয়ার ইঙ্গিত দেওয়া হয়। স্পেনের মিকেল মেরিনো আবার ট্রাম্পের নাচ নকল করে মুহূর্তটিকে আরও মজার করে তোলেন।

পদক বিতরণের আরেকটি মুহূর্ত সামাজিক মাধ্যমে জন্ম দেয় রহস্যময় করমর্দনের গল্প। প্রথমে ছড়িয়ে পড়ে, স্পেনের লামিন ইয়ামাল নাকি ট্রাম্পের সঙ্গে হাত মেলাননি। কিন্তু ভিন্ন কোণ থেকে ধারণ করা পূর্ণ ভিডিওতে ইয়ামালকে করমর্দন করতে দেখা যায়। ট্রাম্পের বাড়ানো হাত এড়িয়ে গিয়েছিলেন আর্জেন্টিনার ডিফেন্ডার ক্রিস্তিয়ান রোমেরো। কয়েক সেকেন্ডের অসম্পূর্ণ ভিডিও এভাবেই এক খেলোয়াড়ের ঘটনাকে আরেকজনের নামে ছড়িয়ে দেয়। বিশ্বকাপ তাই বুঝিয়ে দিল, VAR শুধু মাঠে নয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও প্রয়োজন।

শেষ পর্যন্ত স্পেন ট্রফি নিয়ে দেশে ফিরেছে, কিন্তু বিশ্বকাপ রেখে গেছে অসংখ্য গল্প। কোথাও নিয়মের সঙ্গে ক্ষমতার লড়াই, কোথাও প্রযুক্তির সঙ্গে মানুষের বিচারবোধের বিরোধ, কোথাও পরাজয়ের হতাশা, আবার কোথাও তিন বছরের শিশুর নির্মল আনন্দ। ৩০৮টি গোলের হিসাব ফিফার খাতায় থাকবে। কিন্তু মানুষ মনে রাখবে আরও অনেক কিছু।

কারণ বিশ্বকাপে শুধু ফুটবল খেলা হয় না। এখানে মানুষের আবেগ, ক্ষমতার দম্ভ, বাণিজ্যের হিসাব, প্রযুক্তির ভুল এবং সামাজিক মাধ্যমের তাড়াহুড়োও একই সঙ্গে মাঠে নামে। ট্রফি পায় একটি দল, কিন্তু অঘটনের বিশ্বকাপে প্রায় সবাই কোনো না কোনোভাবে চ্যাম্পিয়ন।

তথ্যসূত্র: ফিফা, দ্য স্ট্যান্ডার্স, রয়টার্স।


Back to top button