
১৮ জুলাই ২০২৬, মায়ামির হার্ড রক স্টেডিয়াম। বিশ্বকাপের তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে ফ্রান্সের বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করলেন বুকায়ো সাকা। পাঁচ বছর আগে একটি পেনাল্টি মিসের পর যে তরুণকে বর্ণবাদী বিদ্বেষ ও নির্মম সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল, সেই সাকাই এবার বিশ্বকাপের মঞ্চে ইংল্যান্ডকে এনে দিলেন ৬–৪ গোলের স্মরণীয় জয়। সেদিন যেন একটি ম্যাচের ফলের পাশাপাশি পূর্ণতা পেল ঘুরে দাঁড়ানোর এক অসাধারণ গল্প।
সাকা শুধু একজন দ্রুতগতির উইঙ্গার নন, শুধু গোল বা অ্যাসিস্টের কারিগরও নন। তিনি এমন এক ফুটবলারের প্রতীক, যিনি ব্যর্থতার ক্ষত বুকে নিয়েও মাথা নত করেননি। বরং সেই অভিজ্ঞতাকেই শক্তিতে পরিণত করে তিনি নিজেকে আর্সেনাল ও ইংল্যান্ডের আক্রমণভাগের অন্যতম প্রধান খেলোয়াড় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
বুকায়ো সাকার জন্ম ২০০১ সালের ৫ সেপ্টেম্বর, পশ্চিম লন্ডনের ইলিং এলাকায়। তাঁর বাবা ইয়োমি সাকা ও মা আদেনিকে নাইজেরিয়া থেকে যুক্তরাজ্যে এসে নতুন জীবন গড়ে তুলেছিলেন। পরিবারে শিক্ষা, শৃঙ্খলা, পরিশ্রম ও বিনয়ের ওপর বিশেষ গুরুত্ব ছিল। বিশ্ব ফুটবলের পরিচিত তারকা হয়ে ওঠার পরও সাকার আচরণে সেই পারিবারিক শিক্ষার ছাপ স্পষ্ট থেকেছে।
শৈশব থেকেই ফুটবল ছিল তাঁর সবচেয়ে প্রিয় ভাষা। স্কুলের মাঠ, স্থানীয় পার্ক কিংবা বাড়ির সামনে, যেখানেই বল গড়িয়েছে, সেখানেই ছুটে গেছেন তিনি। স্থানীয় ক্লাব গ্রিনফোর্ড সেলটিকে তাঁর সংগঠিত ফুটবলের শুরু। মাত্র আট বছর বয়সে যোগ দেন আর্সেনালের বিখ্যাত হেল এন্ড একাডেমিতে। সেখানেই শুরু হয় এমন এক পথচলা, যা একদিন তাঁকে একই সঙ্গে আর্সেনাল ও ইংল্যান্ডের আস্থার প্রতীকে পরিণত করে।
একাডেমির কোচদের নজর কাড়তে তাঁর বেশি সময় লাগেনি। প্রতিভার পাশাপাশি বয়সের তুলনায় তাঁর খেলা বোঝার ক্ষমতাও ছিল অসাধারণ। কখন প্রতিপক্ষকে পাশ কাটাতে হবে, কখন সতীর্থকে বল দিতে হবে এবং কখন নিজে গোলের চেষ্টা করতে হবে, অল্প বয়সেই সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা তৈরি হয়েছিল তাঁর মধ্যে। বয়সের সঙ্গে তাঁর খেলার পরিপক্বতাও দ্রুত বাড়তে থাকে।
২০১৮ সালের নভেম্বরে মাত্র ১৭ বছর বয়সে আর্সেনালের মূল দলে অভিষেক হয় সাকার। ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে বাঁ প্রান্তের রক্ষণ ও আক্রমণ উভয় ভূমিকায় তাঁকে ব্যবহার করা হলেও পরে ডান দিকের আক্রমণভাগে নিজের স্থায়ী জায়গা তৈরি করেন। আর্সেনালের পুনর্গঠনের কঠিন সময়ে তিনি শুধু সম্ভাবনাময় তরুণ ছিলেন না, ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন দলের আক্রমণের প্রধান ভরসা। ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের স্বীকৃতি হিসেবে পরপর দুই মৌসুমে আর্সেনালের বর্ষসেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হন। এরপর ২০২৬ সালের মার্চে আর্সেনালের জার্সিতে নিজের ৩০০তম ম্যাচেও গোল করে আরেকটি মাইলফলক স্পর্শ করেন তিনি।
জাতীয় দলেও তাঁর উত্থান ছিল দ্রুত। ২০২০ সালের অক্টোবরে ইংল্যান্ডের সিনিয়র দলে অভিষেকের পর ডান প্রান্তে গতি, ড্রিবলিং ও সৃজনশীলতা দিয়ে নিজের জায়গা স্থায়ী করেন সাকা। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে তিনটি গোল করে প্রথম বিশ্বকাপেই নিজের সামর্থ্যের পরিচয় দেন তিনি। ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের স্বীকৃতি হিসেবে ২০২১–২২ ও ২০২২–২৩ মৌসুমে টানা দুবার ইংল্যান্ডের বর্ষসেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হন। কাতারে তিন গোল করে যে বিশ্বকাপ যাত্রার সূচনা হয়েছিল, ২০২৬ সালে ফ্রান্সের বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করে সেটিই পৌঁছে যায় নতুন উচ্চতায়। সেই হ্যাটট্রিক ছিল ইংল্যান্ডের জার্সিতে তাঁর দ্বিতীয় এবং বিশ্বমঞ্চে একজন পরিণত ও দায়িত্বশীল তারকা হিসেবে প্রতিষ্ঠার আরেকটি উজ্জ্বল ঘোষণা।
সাকার খেলার সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো, তিনি বল পায়ে দর্শককে আনন্দ দিতে পারেন। প্রতিপক্ষকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করার সাহসের সঙ্গে তাঁর খেলায় মিশে থাকে সৃজনশীলতা ও দলীয় দায়িত্ববোধ। তিনি নিজের জন্য সুযোগ তৈরি করেন, আবার সতীর্থদের জন্যও আক্রমণের পথ খুলে দেন। তাই গোল ও অ্যাসিস্টের পরিসংখ্যানের বাইরেও একটি ম্যাচে তাঁর প্রভাব স্পষ্টভাবে অনুভব করা যায়।
সাকার গল্পের সবচেয়ে শক্তিশালী অধ্যায়টি হলো তাঁর ফিরে আসা। ২০২১ সালের ১১ জুলাই, লন্ডনের ওয়েম্বলি স্টেডিয়াম। উয়েফা ইউরো ২০২০-এর ফাইনালে ইতালির বিপক্ষে ম্যাচ গড়িয়েছে পেনাল্টি শুটআউটে। কয়েক মুহূর্তের জন্য পুরো ইংল্যান্ড যেন নিঃশ্বাস আটকে রেখেছে। কোটি মানুষের চোখ একটি বল, একটি গোলপোস্ট এবং মাত্র উনিশ বছর বয়সী বুকায়ো সাকার দিকে। ইংল্যান্ডের পঞ্চম পেনাল্টিটি নিতে এগিয়ে গেলেন তিনি। কিন্তু তাঁর শট ঠেকিয়ে দিলেন ইতালির গোলরক্ষক জিয়ানলুইজি দোন্নারুম্মা। ইতালি ইউরোপের চ্যাম্পিয়ন হলো, আর ওয়েম্বলির আলোয় মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলেন ইংল্যান্ডের তরুণ ফুটবলারটি।
সেদিন শুধু একটি পেনাল্টি মিস হয়নি; কোটি মানুষের সামনে ভেঙে পড়েছিল একজন তরুণ ফুটবলারের স্বপ্ন। ম্যাচ শেষ হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁকে লক্ষ্য করে ছড়িয়ে পড়ে ভয়াবহ বর্ণবাদী বিদ্বেষ। ফুটবলের একটি ভুলের জন্য তাঁকে আক্রমণ করা হয়েছিল তাঁর গায়ের রং ও পারিবারিক শিকড় নিয়ে।
২০২১ সালের পর ক্লাব, সতীর্থ এবং সাধারণ সমর্থকেরা তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। সাকাও সেই ভালোবাসার উত্তর দিয়েছেন মাঠে। ইউরো ২০২৪-এর কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে ইংল্যান্ড পিছিয়ে পড়লে সমতাসূচক গোল করেন তিনি। পরে পেনাল্টি শুটআউটেও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নিজের শট জালে পাঠান। ওয়েম্বলির সেই ব্যর্থতার তিন বছর পর চাপের আরেকটি মুহূর্তে সফল হওয়া ছিল অতীতের দুঃসহ স্মৃতিকে পেছনে ফেলার এক শক্তিশালী প্রতীক।
২০২৬ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের শিরোপার স্বপ্ন সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনার কাছে থেমে যায়। তবে ১৮ জুলাই মায়ামির হার্ড রক স্টেডিয়ামে ফ্রান্সকে ৬–৪ গোলে হারিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে তৃতীয় স্থান অর্জন করে দলটি। প্রথমার্ধে দুটি গোল করার পর ৮৭ মিনিটে পেনাল্টি থেকে হ্যাটট্রিক পূর্ণ করেন সাকা। এটি ছিল ইংল্যান্ডের জার্সিতে তাঁর দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক হ্যাটট্রিক। বিশ্বকাপের তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড গড়া সেই দশ গোলের লড়াইয়ে সাকাই ছিলেন ইংল্যান্ডের প্রধান নায়ক। ১৯৬৬ সালে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর এটিই বিশ্বকাপে দেশটির সেরা সমাপ্তি।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে অনেক নায়ক ট্রফি জিতে অমর হয়েছেন। আবার কেউ কেউ মাঠের নৈপুণ্য ও ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি দিয়ে মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছেন। বুকায়ো সাকা সেই নায়কদেরই একজন। কারণ তিনি শিখিয়েছেন, জীবন সব সময় প্রথম সুযোগে জিতে যাওয়ার গল্প নয়। কখনও কখনও জীবনের সবচেয়ে সুন্দর জয় আসে সেই মানুষটির কাছে, যে একদিন সবার সামনে হেরে গিয়েও আবার উঠে দাঁড়াতে পেরেছিল।
তথ্যসূত্র:
Associated Press
Reuters
Arsenal Football Club









