সম্পাদকের পাতা

কার্যকর হলো কানাডার নতুন হেইট ক্রাইম আইন

নজরুল মিন্টো

কানাডার পরিচয় গড়ে উঠেছে নানা ভাষা, ধর্ম, বর্ণ ও সংস্কৃতির মানুষের সহাবস্থানে। একই মহল্লায় মসজিদের আজান, গির্জার ঘণ্টা, মন্দিরের প্রার্থনা আর গুরুদ্বারের কীর্তন শোনা যায়। ভিন্ন পরিচয়ের মানুষ এখানে পাশাপাশি বাস করেন, কাজ করেন এবং সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলেন। কিন্তু এই বৈচিত্র্যময় সমাজেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঘৃণা, ভয়ভীতি ও বিদ্বেষমূলক অপরাধ উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে।

কখনও ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কাউকে উপাসনালয়ে ঢুকতে বাধা দেওয়া হচ্ছে, কখনও কোনো জনগোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠান ভাঙচুর করা হচ্ছে, আবার কখনও প্রকাশ্যে এমন প্রতীক দেখানো হচ্ছে, যার উদ্দেশ্য একটি সম্প্রদায়ের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করা। এসব ঘটনার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা আরও স্পষ্ট ও কঠোর করতে কানাডার নতুন হেইট ক্রাইম আইন আজ, ১৮ জুলাই থেকে কার্যকর হয়েছে।

পার্লামেন্টে Bill C-9 নামে পরিচিত Combatting Hate Act গত ১৮ জুন রাজকীয় সম্মতি পেয়ে আইনে পরিণত হয়। এর মাধ্যমে কানাডার ফৌজদারি আইনে ঘৃণাজনিত অপরাধ, নির্দিষ্ট স্থানে প্রবেশে ভয়ভীতি ও বাধা এবং বিদ্বেষ ছড়াতে কিছু প্রতীকের ব্যবহার নিয়ে নতুন বিধান যুক্ত হয়েছে।

সহজভাবে বললে, নতুন আইনটি তিনটি বিষয়ে কঠোর হয়েছে। ঘৃণার উদ্দেশ্যে কোনো অপরাধ করা, উপাসনালয় ও নির্দিষ্ট কমিউনিটি প্রতিষ্ঠানে মানুষের প্রবেশে ভয় দেখানো বা বাধা দেওয়া এবং প্রকাশ্যে কিছু প্রতীক ব্যবহার করে ইচ্ছাকৃতভাবে বিদ্বেষ ছড়ানো এখন আরও স্পষ্টভাবে ফৌজদারি আইনের আওতায় এসেছে।

আগেও কানাডায় ঘৃণাজনিত অপরাধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ ছিল। অনেক ক্ষেত্রে অপরাধের পেছনে বিদ্বেষ থাকলে সাজা দেওয়ার সময় সেটি গুরুতর বিষয় হিসেবে বিবেচিত হতো। নতুন আইনে ঘৃণার উদ্দেশ্যে সংঘটিত অপরাধকে স্বতন্ত্র অভিযোগ হিসেবে আনার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে শুধু কারও মনে বিদ্বেষ আছে বলে তাঁকে অভিযুক্ত করা যাবে না। হামলা, হুমকি, ভাঙচুর বা অগ্নিসংযোগের মতো কোনো অপরাধ ঘটতে হবে এবং প্রমাণ করতে হবে, সেটি ভুক্তভোগীর পরিচয়ের প্রতি ঘৃণা থেকে করা হয়েছে।

ধরা যাক, চুরি বা সাধারণ ভাঙচুরের উদ্দেশ্যে একটি দোকানের জানালা ভাঙা হয়েছে। সেটি এক ধরনের অপরাধ। কিন্তু দোকানের মালিক একটি বিশেষ ধর্ম বা জাতিগোষ্ঠীর মানুষ বলে তাঁর দোকানটি বেছে নিয়ে হামলা চালানো হলে বিষয়টি ভিন্ন। তখন মূল অপরাধের পাশাপাশি এর পেছনের ঘৃণার উদ্দেশ্যও আদালতের সামনে আসবে।

ঘৃণার উদ্দেশ্য প্রমাণিত হলে মূল অপরাধের গুরুত্ব অনুযায়ী সর্বোচ্চ সাজা পাঁচ বছর, ১০ বছর, ১৪ বছর কিংবা গুরুতর ক্ষেত্রে যাবজ্জীবন পর্যন্ত হতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে প্রত্যেক ঘটনায় এমন সাজাই হবে। অভিযোগের ধরন, প্রমাণ এবং ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনা করে আদালত সিদ্ধান্ত দেবেন।

নতুন আইনে মসজিদ, মন্দির, গির্জা, সিনাগগ, গুরুদ্বার ও কবরস্থানের পাশাপাশি স্কুল, ডে-কেয়ার, সাংস্কৃতিক বা কমিউনিটি সেন্টার, কোনো জনগোষ্ঠীর সামাজিক ও খেলাধুলার প্রতিষ্ঠান এবং সিনিয়রদের আবাসনকেন্দ্র বিশেষ আইনি সুরক্ষার আওতায় এসেছে। কাউকে ভয় দেখিয়ে এসব স্থানে যেতে বাধা দেওয়া কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে দরজা, ড্রাইভওয়ে বা প্রবেশের রাস্তা বন্ধ করা অপরাধ হতে পারে।

তবে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ এবং মানুষের চলাচল বন্ধ করার মধ্যে আইনি পার্থক্য রয়েছে। কেউ প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়াতে, লিফলেট বিলি করতে বা সরকারের নীতির সমালোচনা করতে পারেন। কিন্তু প্রতিবাদ যদি হুমকি, ভয়ভীতি কিংবা মানুষের বৈধ প্রবেশপথ বন্ধ করার কাজে পরিণত হয়, তখন নতুন আইন প্রযোজ্য হতে পারে। আইনটি উপাসনালয় বা কমিউনিটি প্রতিষ্ঠানের চারপাশে প্রতিবাদমুক্ত এলাকা তৈরি করছে না।

আইনটিতে নির্দিষ্ট কিছু প্রতীকের প্রকাশ্য ব্যবহার নিয়েও বিধান রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কানাডার তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী সংগঠনের সঙ্গে প্রধানত যুক্ত প্রতীক, নাৎসি হাকেনক্রয়ৎস, নাৎসি এসএস চিহ্ন এবং ফাঁসের দড়ির প্রতীক। তবে প্রতীকটি শুধু দেখা গেলেই অপরাধ হবে না। প্রমাণ করতে হবে, একটি জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ইচ্ছাকৃতভাবে ঘৃণা ছড়ানোর জন্য সেটি প্রদর্শন করা হয়েছে। এ অপরাধে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড হতে পারে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাস শেখানো, সংবাদ প্রতিবেদন, প্রামাণ্যচিত্র, জাদুঘর, নাটক বা ঘৃণাবিরোধী প্রচারে এসব প্রতীক ব্যবহার করা অপরাধ নয়। সাংবাদিকতা, শিক্ষা ও শিল্পের মতো বৈধ উদ্দেশ্যে ব্যবহারের জন্য আইনে সুরক্ষা রাখা হয়েছে।

সব আপত্তিকর, কষ্টদায়ক বা অপমানজনক কথাই আইনের চোখে ঘৃণা নয়। নতুন আইনে ঘৃণা বলতে এমন তীব্র ও চরম বিদ্বেষ বোঝানো হয়েছে, যা একটি জনগোষ্ঠীকে ঘৃণিত বা মানবিক মর্যাদাহীন করে তুলে ধরে। শুধু কোনো কথা কারও অনুভূতিতে আঘাত করেছে, এটুকু দিয়ে ঘৃণা প্রচারের অপরাধ প্রমাণিত হবে না।

রাজনৈতিক মতবিরোধ, ধর্মীয় বিতর্ক, কঠোর সমালোচনা বা অজনপ্রিয় মতামতও নিজে থেকে অপরাধ হয়ে যাবে না। পুলিশ ও আদালত বক্তব্যের ভাষা, পরিস্থিতি, উদ্দেশ্য এবং সেটি ইচ্ছাকৃতভাবে চরম বিদ্বেষ ছড়িয়েছে কি না, সবকিছু বিবেচনা করবেন।

আইনটির একটি পরিবর্তন নিয়ে ধর্মীয় মহলে আলোচনা হয়েছে। আগে ধর্মীয় বিষয় বা ধর্মগ্রন্থের ভিত্তিতে সৎ বিশ্বাসে দেওয়া মতামতের জন্য আলাদা আইনি আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ ছিল, যা নতুন আইনে তুলে দেওয়া হয়েছে। তবে ধর্মীয় শিক্ষা, ধর্মগ্রন্থ পাঠ, উপাসনা বা সৎ বিশ্বাসে ধর্মীয় মত প্রকাশকে অপরাধ করা হয়নি। কাউকে দোষী করতে হলে প্রমাণ করতে হবে, তিনি জেনেশুনে ও ইচ্ছাকৃতভাবে একটি জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে চরম ঘৃণা ছড়িয়েছেন।

২০২৪ সালে কানাডার পুলিশ ৪ হাজার ৮৮২টি ঘৃণাজনিত অপরাধ নথিভুক্ত করেছে, যা ২০১৮ সালের তুলনায় ১৬৯ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে জাতি বা জাতিগত পরিচয়কে লক্ষ্য করে ঘটেছে ২ হাজার ৩৭৭টি এবং ধর্মকে কেন্দ্র করে ১ হাজার ৩৪২টি ঘটনা। এগুলো শুধু পুলিশের কাছে জানানো এবং ঘৃণাজনিত হিসেবে চিহ্নিত ঘটনা। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে আছেন একজন মানুষ, একটি পরিবার কিংবা একটি কমিউনিটি, যারা নিজেদের পরিচয়ের কারণে ভয়, অপমান বা হামলার মুখে পড়েছেন।

নতুন আইন একদিনে মানুষের মনের ঘৃণা দূর করতে পারবে না। কোনো আইনই তা পারে না। কিন্তু আইন সীমারেখা টেনে দিতে পারে। বলতে পারে, মত প্রকাশের স্বাধীনতা আছে, কিন্তু মানুষকে ভয় দেখানোর স্বাধীনতা নেই। প্রতিবাদের অধিকার আছে, কিন্তু উপাসনালয় বা স্কুলে যাওয়ার পথ বন্ধ করার অধিকার নেই। নিজের বিশ্বাস পালনের অধিকার আছে, কিন্তু অন্যের পরিচয়ের কারণে তাঁকে আক্রমণ করার অধিকার নেই।

কেউ ঘৃণাজনিত হুমকি, হামলা বা ভাঙচুরের শিকার হলে প্রথমে নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। সম্ভব হলে ঘটনার সময়, স্থান, ছবি, ভিডিও, ব্যবহৃত ভাষা ও প্রত্যক্ষদর্শীর তথ্য সংরক্ষণ করে পুলিশকে জানানো উচিত। তাৎক্ষণিক বিপদে ৯১১ নম্বরে ফোন করতে হবে।

কানাডার শক্তি বহু ভাষা, বহু ধর্ম ও বহু সংস্কৃতির মানুষের সহাবস্থানে। নতুন আইন কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে পুলিশ, আদালত এবং সমাজ কতটা ন্যায়সংগতভাবে এর প্রয়োগ ও চর্চা করে তার ওপর। আইন অপরাধের শাস্তি দিতে পারে, কিন্তু পরস্পরের প্রতি সম্মান, সংযম ও মানবিকতা গড়ে তোলার দায়িত্ব সমাজের প্রতিটি মানুষের।

তথ্যসূত্র:
Department of Justice Canada
Parliament of Canada
Statistics Canada


Back to top button