
২০২৬ সালের ১০ জুলাই সকাল। গ্রিসের থেসালোনিকি থেকে জার্মানির মেমিংগেনগামী ফ্লাইট FR1879 পরিচালনা করছিল রায়ানএয়ার গ্রুপের সহযোগী বিমান সংস্থা মাল্টা এয়ার। বোয়িং ৭৩৭-৮০০ উড়োজাহাজটি উড্ডয়নের প্রায় ছয় মিনিটের মধ্যে ১৫ হাজার ফুটের বেশি উচ্চতায় পৌঁছায়। ঠিক তখনই যাত্রীরা গাড়ির টায়ার ফেটে যাওয়ার মতো বিকট একটি শব্দ শুনতে পান। সেই শব্দের সঙ্গে সঙ্গেই ভেঙে যায় উড়োজাহাজটির একটি জানালা।
মুহূর্তের মধ্যে কেবিনের বায়ুচাপ কমে যায়। ভাঙা জানালার পাশের আসনে বসেছিলেন সার্বিয়ার নাগরিক লিউবিসা কারোভিচ। আকস্মিক ও প্রচণ্ড বায়ুপ্রবাহে তাঁর মাথা ও কাঁধসহ শরীরের ওপরের অংশ জানালার বাইরে চলে যায়। সৌভাগ্যক্রমে তাঁর সিটবেল্ট বাঁধা ছিল। পাশে বসা স্ত্রী স্বেতলানা সঙ্গে সঙ্গে স্বামীর পা শক্ত করে ধরে ফেলেন। কেবিনের ভেতর ও বাইরের বায়ুচাপের তীব্র পার্থক্য লিউবিসাকে আরও বাইরে টেনে নিচ্ছিল। স্বেতলানার মনে হয়েছিল, তিনি বুঝি আর স্বামীকে ফিরিয়ে আনতে পারবেন না। তবু এক মুহূর্তের জন্যও হাত আলগা করেননি তিনি। তাঁর মনে তখন একটিই কথা, “মরলে আমরা একসঙ্গেই মরব।”
স্বেতলানা পরে বলেন, “আমার কাছে তাঁর বেঁচে থাকাটাই বড় কথা।” লিউবিসার একটি হাত গুরুতরভাবে জখম হয়েছে। প্রচণ্ড বায়ুপ্রবাহে তাঁর শরীরে ঘর্ষণজনিত পোড়া ক্ষত তৈরি হয়েছে এবং ঘাড় ও কাঁধে আঘাত লেগেছে। তাঁকে থেসালোনিকির একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। স্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, লিউবিসা গভীর মানসিক আঘাতের মধ্যে রয়েছেন। পুরো ঘটনাটি তিনি মনে করতে পারছেন না। উড়োজাহাজের কথা শুনলেই আতঙ্কে কাঁপতে শুরু করেন।
কেবিনের অন্য যাত্রীদের অভিজ্ঞতাও ছিল ভয়াবহ। অক্সিজেন মাস্ক নেমে আসার পর অনেকে ঠিকমতো শ্বাস নিতে পারছিলেন না। কেউ ভেবেছিলেন, ভুল করে জরুরি বহির্গমন দরজা খুলে গেছে। আবার কারও মনে হয়েছিল, উড়োজাহাজটি বুঝি ভেঙে পড়তে যাচ্ছে। ক্রিস্টিনা নামের এক যাত্রী জানান, বেশির ভাগ মানুষ তখন ঘুমিয়ে ছিলেন। হঠাৎ বিকট শব্দের পর কেবিনে চিৎকার শুরু হয়। সোফিয়া নামের আরেক যাত্রী বলেন, বায়ুচাপ কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের মনে হয়েছিল, উড়োজাহাজটি নিচে পড়ে যাচ্ছে।
ফ্লাইট ট্র্যাকিংয়ের তথ্য বলছে, উড়োজাহাজটি ১৫ হাজার ফুটের বেশি উচ্চতা থেকে দ্রুত প্রায় ৬ হাজার ফুটে নেমে আসে। অর্থাৎ এর উচ্চতা কমে যায় প্রায় ৯ হাজার ফুট। তবে এটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নিচে পড়ে যাওয়া ছিল না। কেবিনের বায়ুচাপ কমে যাওয়ার পর যাত্রীদের নিরাপদে শ্বাস নেওয়ার উপযোগী উচ্চতায় পৌঁছাতে পাইলটরা জরুরি অবতরণের প্রস্তুতি হিসেবে দ্রুত উড়োজাহাজটিকে নিচে নামান। এরপর প্রায় ৩০ মিনিট অপেক্ষাকৃত নিচু উচ্চতায় উড়ে প্রয়োজনীয় জ্বালানি পোড়ানোর পর উড্ডয়নের প্রায় এক ঘণ্টার মাথায় উড়োজাহাজটি থেসালোনিকিতে ফিরে আসে।
রায়ানএয়ার জানিয়েছে, মাঝ আকাশে যাত্রী কেবিনের একটি জানালা ভেঙে খুলে যাওয়ার পর ফ্লাইটটি থেসালোনিকিতে ফিরে আসে এবং উড়োজাহাজটি স্বাভাবিকভাবে অবতরণ করে।
প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, উড়োজাহাজটির ডান পাশের ইঞ্জিনে সমস্যা দেখা দেওয়ার পর সেখান থেকে ছিটকে আসা কোনো অংশ জানালায় আঘাত করে থাকতে পারে। তবে এটিই জানালা ভাঙার নিশ্চিত কারণ কি না, তা এখনো বলা যাচ্ছে না। ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তদন্ত চলছে।
এ লোমহর্ষক ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে, আসনে বসে থাকার সময় সিটবেল্ট বাঁধা রাখা কতটা জরুরি। সেদিন লিউবিসাকে সম্পূর্ণ বাইরে ছিটকে যাওয়া থেকে প্রথমে রক্ষা করেছিল তাঁর বাঁধা সিটবেল্ট। একটি সাধারণ সতর্কতাই কখনো কখনো মানুষের জীবনের শেষ প্রতিরক্ষা হয়ে উঠতে পারে।
সেদিন লিউবিসাকে বাঁচাতে এগিয়ে এসেছিলেন অপরিচিত সহযাত্রীরা, আর পাইলটরা দ্রুত উচ্চতা কমিয়ে উড়োজাহাজটিকে নিরাপদে ফিরিয়ে আনেন। স্বেতলানা দুই হাতে স্বামীর পা আঁকড়ে ধরেছিলেন; প্রকৃতপক্ষে তিনি ধরে রেখেছিলেন তাঁদের একসঙ্গে ঘরে ফেরার শেষ সম্ভাবনাটুকু।
তথ্যসূত্র:
The Guardian (July 14, 2026)
People (July 14, 2026)
BBC (July 15, 2026)









