
সোমবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কানাডার বিভিন্ন পণ্যের ওপর অতিরিক্ত ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন। তাঁর এই ঘোষণায় কানাডার শিল্পাঞ্চল, কারখানা, নির্মাণ খাত ও ব্যবসায়ী মহলে গভীর উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। ওয়াইন, হকি স্টিক ও সিমেন্টসহ যেসব কানাডীয় পণ্য এত দিন উত্তর আমেরিকার বাণিজ্যচুক্তির আওতায় শুল্কমুক্ত সুবিধা পেয়ে আসছিল, সেগুলোর ওপরও নতুন এই শুল্ক প্রযোজ্য হবে।
আগামী ১৯ আগস্ট নতুন শুল্ক কার্যকর হওয়ার কথা। অর্থাৎ আলোচনা ও সম্ভাব্য সমঝোতার জন্য হাতে রয়েছে মাত্র ৩০ দিন। এর মধ্যে কোনো সমাধান না এলে সীমান্ত পেরোনোর সঙ্গে সঙ্গে অনেক কানাডীয় পণ্যের দাম এমন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে, যেখানে মার্কিন বাজারে প্রতিযোগিতা করা কঠিন হয়ে পড়বে।
এটি শুধু শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত নয়; দীর্ঘদিনের মিত্র, প্রতিবেশী ও ঘনিষ্ঠ বাণিজ্যিক অংশীদার কানাডার প্রতি ট্রাম্প প্রশাসনের এক ঔদ্ধত্যপূর্ণ রাজনৈতিক হুমকি। সেই হুমকির ভাষা নির্মমভাবে স্পষ্ট: যুক্তরাষ্ট্র একের পর এক আঘাত করবে, আর কানাডাকে তা মুখ বুজে সহ্য করতে হবে; কারণ ওয়াশিংটন ধরে নিয়েছে, পাল্টা জবাব দেওয়ার সাহস কিংবা সামর্থ্য কোনোটিই অটোয়ার নেই।
হোয়াইট হাউস দাবি করছে, কানাডা মার্কিন গাড়ি, দুগ্ধজাত পণ্য ও অ্যালকোহলের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করেছে। কিন্তু পুরো ঘটনাক্রম সামনে রাখলে অন্য একটি ছবি স্পষ্ট হয়। গত বছর ট্রাম্প প্রশাসন কানাডার ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম ও গাড়ির ওপর ভারী শুল্ক আরোপ করেছিল। তার প্রতিক্রিয়ায় অটোয়া মার্কিন গাড়িতে ২৫ শতাংশ পাল্টা শুল্ক বসায়। অন্টারিওসহ অধিকাংশ প্রদেশ দোকান থেকে মার্কিন অ্যালকোহলজাত পণ্য সরিয়ে নেয়। কানাডা প্রথম আঘাত করেনি। কেবল আঘাতের জবাব দিয়েছে।
এখন সেই আত্মরক্ষাকেই ওয়াশিংটন ‘বৈষম্য’ বলে অভিহিত করছে। যেন কানাডার দায়িত্ব হলো মার্কিন শুল্ক মেনে নিয়ে নিজেদের কারখানা সংকুচিত হতে দেওয়া, শ্রমিকদের কর্মসংস্থান বিপন্ন হওয়া দেখা এবং তারপরও প্রতিবাদ না করা। প্রতিবেশীর কাছ থেকে এমন আচরণ কেবল হতাশাজনক নয়, নিন্দনীয়ও।
নতুন শুল্ক আরোপের জন্য ট্রাম্প ১৯৩০ সালের ট্যারিফ আইনের ৩৩৮ ধারা প্রয়োগ করেছেন। প্রায় এক শতাব্দী পুরোনো এই বিধান অনুযায়ী, কোনো দেশ মার্কিন বাণিজ্যের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করছে বলে প্রেসিডেন্ট আনুষ্ঠানিকভাবে সিদ্ধান্তে পৌঁছালে নির্দিষ্ট পণ্যের ওপর সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত শুল্ক বসানো যায়। পিটারসন ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিকসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আইনটি প্রণয়নের পর প্রায় একশ বছরে এমন অভিযোগের ভিত্তিতে প্রেসিডেন্টের শুল্ক আরোপের নজির পাওয়া যায় না। ট্রাম্প সেই প্রায় বিস্মৃত বিধানটিই এবার কানাডার বিরুদ্ধে প্রয়োগ করলেন।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, কানাডা–যুক্তরাষ্ট্র–মেক্সিকো চুক্তির আওতাভুক্ত পণ্যও এবার ছাড় পাবে না। চুক্তিটি বহাল থাকা অবস্থাতেই এর আওতায় শুল্কমুক্ত সুবিধাপ্রাপ্ত পণ্যের ওপর নতুন শুল্ক চাপানো হচ্ছে। তিন দেশের ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের স্থিতিশীলতা দেওয়ার জন্য যে চুক্তি করা হয়েছিল, ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত সেই আস্থার ভিত্তিতেই আঘাত করেছে। স্বাক্ষরিত চুক্তির সুবিধা যদি প্রয়োজনমতো অগ্রাহ্য করা যায়, তাহলে সেই চুক্তির মূল্য কোথায়?
তবে ট্রাম্প হিসাব করেই কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ খাতকে নতুন শুল্কের বাইরে রেখেছেন। কানাডার তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস, পটাশ, মাছ ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ আপাতত এই শুল্কের আওতায় পড়ছে না। কারণ এসব পণ্যের ওপর একই ধরনের শুল্ক বসানো হলে যুক্তরাষ্ট্রের শিল্প, কৃষি ও সাধারণ ভোক্তারাও দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। কানাডীয় জ্বালানির আমদানি ব্যয় বাড়লে আমেরিকার বহু অঞ্চলে জ্বালানির দাম ও উৎপাদন খরচ বাড়তে পারে। পটাশের দাম বাড়লে মার্কিন কৃষকের উৎপাদন ব্যয়ও বাড়বে।
ফলে এমন ধারণা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক যে, যেসব কানাডীয় সম্পদ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের শিল্প ও কৃষি খাতের চলা কঠিন, সেগুলোকে ছাড় দেওয়া হয়েছে। আর যেসব পণ্যে কানাডীয় প্রতিষ্ঠানকে চাপে ফেলে মার্কিন উৎপাদকদের সুবিধা দেওয়া সম্ভব, সেগুলোকে নিশানা বানানো হয়েছে। হোয়াইট হাউস একে ‘সমান প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র’ তৈরির পদক্ষেপ বললেও বাস্তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল বাজারক্ষমতা ব্যবহার করে কানাডার ওপর চাপ সৃষ্টির কৌশল।
দুই দেশের অর্থনীতি কতটা গভীরভাবে জড়িত, পরিসংখ্যানেই তার প্রমাণ পাওয়া যায়। ২০২৫ সালে কানাডার মোট পণ্য রপ্তানির ৭১ দশমিক ৭ শতাংশ গেছে যুক্তরাষ্ট্রে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কানাডার পণ্যবাণিজ্য উদ্বৃত্ত ছিল ৮১ দশমিক ৬ বিলিয়ন কানাডীয় ডলার। তবে এই উদ্বৃত্তের বড় অংশ জ্বালানিনির্ভর। আর সেই জ্বালানিই আমেরিকার ঘর, গাড়ি ও কারখানা সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
কানাডা সরকারের তথ্য অনুযায়ী, দুই দেশের বাণিজ্যের সঙ্গে প্রায় ৮০ লাখ মার্কিন চাকরি জড়িত। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল প্রায় ২৬ লাখ কানাডীয় কর্মসংস্থান। কানাডা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়া পণ্যের ৭০ শতাংশের বেশি আবার মার্কিন উৎপাদনব্যবস্থায় কাঁচামাল বা উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ফলে সীমান্তে ৫০ শতাংশ শুল্ক বসানো মানে শুধু কানাডীয় বিক্রেতাকে শাস্তি দেওয়া নয়; মার্কিন কারখানার উৎপাদন ব্যয় এবং আমেরিকান পরিবারের কেনাকাটার খরচও বাড়িয়ে দেওয়া।
অন্টারিওর প্রিমিয়ার ডাগ ফোর্ড ইতিমধ্যে স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, শুল্ক কার্যকর হলে কানাডাকে “শুল্কের বদলে শুল্ক, ডলারের বদলে ডলার” জবাব দিতে হবে। তাঁর বক্তব্য কানাডার ভেতরে জমতে থাকা ক্ষোভেরই প্রতিফলন। আত্মসম্মানসম্পন্ন একটি দেশের সামনে প্রতিরোধ ছাড়া আর কী পথ খোলা আছে? ট্রাম্পের দাবি ও হুমকির যেন শেষ নেই; তাই প্রতিবার চাপের মুখে একতরফা ছাড় দিয়ে কানাডার অর্থনৈতিক স্বার্থ ও জাতীয় মর্যাদা রক্ষা করা সম্ভব নয়।
মাত্র তিন দিন আগে ট্রাম্প উত্তর অন্টারিওর দাবানলের ধোঁয়া যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার জন্য কানাডাকে দায়ী করে আরও শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছিলেন। তিনি অভিযোগ করেন, কানাডা তার বনাঞ্চল ঠিকমতো রক্ষণাবেক্ষণ করছে না। এমনকি ক্ষতিপূরণের কথাও তোলেন। দাবানল ও ধোঁয়ার মতো জটিল প্রাকৃতিক দুর্যোগকে শুল্ক আদায়ের অজুহাতে পরিণত করার এই প্রবণতা দুই দেশের সম্পর্ককে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে।
হোয়াইট হাউস বলছে, এবারের ৫০ শতাংশ শুল্কের সঙ্গে কথিত ‘দাবানল শুল্কের’ সম্পর্ক নেই। কিন্তু একই সপ্তাহে একটি দেশের বিরুদ্ধে একের পর এক শুল্কের হুমকি এলে কানাডীয়দের মনে সন্দেহ জাগাটাই স্বাভাবিক: এটি কি কানাডাকে ক্রমাগত চাপে রেখে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ছাড় আদায়ের বৃহত্তর পরিকল্পনা?
এই সংকট কানাডার অর্থনীতির একটি দীর্ঘদিনের দুর্বলতাও সামনে এনেছে। দেশের রপ্তানির এত বড় অংশ একটিমাত্র বাজারের ওপর নির্ভরশীল থাকলে প্রতিবেশীর রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গোটা অর্থনীতিকে কাঁপিয়ে দিতে পারে। ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে কানাডার পণ্য রপ্তানি ৫ দশমিক ৮ শতাংশ কমেছে। এটি একটি সতর্কসংকেত। ইউরোপ, এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার বাজারে কানাডীয় পণ্যের প্রবেশ বাড়াতে হবে। দেশের ভেতরে প্রদেশগুলোর মধ্যকার বাণিজ্যবাধা কমানোর পাশাপাশি সরকারি প্রকল্পে কানাডীয় ইস্পাত, কাঠ, কৃষিপণ্য ও প্রযুক্তিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
কানাডা পাল্টা শুল্ক আরোপ করলে সেটিও হতে হবে লক্ষ্যভিত্তিক ও কৌশলগত। এমন মার্কিন পণ্য বেছে নিতে হবে, যেগুলোর ওপর ব্যবস্থা নিলে সংশ্লিষ্ট অঙ্গরাজ্য ও শিল্পগোষ্ঠী ওয়াশিংটনের ওপর রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করবে। একই সঙ্গে কানাডীয় পরিবার ও ক্ষুদ্র ব্যবসার ওপর যাতে অপ্রয়োজনীয় মূল্যবৃদ্ধির বোঝা না পড়ে, সেদিকেও সতর্ক থাকতে হবে। ক্ষোভ প্রতিবাদের শক্তি জোগাতে পারে, কিন্তু এই বাণিজ্যযুদ্ধ মোকাবিলায় প্রয়োজন ঠান্ডা মাথার পরিকল্পনা।
আগামী ১৯ আগস্ট তাই কেবল ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ নয়; তার আগের প্রতিটি দিনই কানাডার জন্য পরীক্ষা। আলোচনার টেবিলে মার্ক কার্নি সরকারকে দৃঢ় থাকতে হবে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও শ্রমিকদের জন্য আর্থিক সহায়তা এবং নতুন বাজারে প্রবেশের পরিকল্পনা প্রস্তুত রাখতে হবে। বিশ্বকে বুঝিয়ে দিতে হবে, কানাডা মুক্তবাণিজ্যের পক্ষে, কিন্তু একতরফা অপমানের কাছে আত্মসমর্পণের পক্ষে নয়।
যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার হতে পারে, কিন্তু কানাডার মালিক নয়। বন্ধুত্বের অর্থ আনুগত্য নয়, প্রতিবেশিতার অর্থ অধীনতা নয়। ওয়াশিংটন যদি শুল্কের দেয়াল তোলে, অটোয়াকে শুধু পাল্টা দেয়াল তুললেই চলবে না; নতুন দরজা এবং নতুন বাজারও খুলতে হবে।
এবারের প্রশ্ন শুধু কয়েকটি পণ্যের ওপর শুল্কের নয়; প্রশ্ন কানাডার অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, জাতীয় মর্যাদা এবং নিজেদের সিদ্ধান্ত নিজেরা নেওয়ার অধিকার নিয়ে। সামনে উদ্বেগ আছে, অনিশ্চয়তা আছে, কঠিন সিদ্ধান্তও আছে। কিন্তু মাথা নত করার কোনো জায়গা নেই।
তথ্যসূত্র:
Associated Press (AP): July 20, 2026
The Globe and Mail: July 20, 2026
Toronto Star: July 20, 2026









