সম্পাদকের পাতা

নিউইয়র্কে স্ত্রী ও দুই সন্তানকে বাঁচিয়ে আগুনের কাছে হার মানলেন ‘সুপারহিরো বাবা’

নজরুল মিন্টো

নিউইয়র্কের কুইন্সের জ্যামাইকা এলাকার একটি কাঠের তৈরি দোতলা আবাসিক ভবনের বেজমেন্টে থাকতেন তাঁরা। নতুন দেশে তখনো তাঁদের জীবন পুরোপুরি গুছিয়ে ওঠেনি। স্বামী ফুড ডেলিভারির কাজ করতেন। নিউইয়র্কের ব্যস্ত সড়কে ই-বাইক চালিয়ে এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়িতে খাবার পৌঁছে দিতেন। রোদ, বৃষ্টি কিংবা শীত উপেক্ষা করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাজ করতেন, স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে একটু স্বচ্ছন্দে বাঁচার আশায়।

এই শহরে ফুড ডেলিভারি কর্মীদের জীবন সহজ নয়। রাস্তায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি, আবহাওয়ার প্রতিকূলতা এবং সময়মতো অর্ডার পৌঁছে দেওয়ার চাপ নিয়েই তাঁদের কাজ করতে হয়। তবু হাজারো অভিবাসী এই পেশা বেছে নেন। কারণ দিনের শেষে তাঁদের উপার্জনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে পরিবারের খাবার, বাড়িভাড়া এবং সন্তানদের ভবিষ্যৎ। রফিকুল ইসলাম সোহাগ ছিলেন সেই পরিশ্রমী অভিবাসীদেরই একজন।

২৬ জুন ভোর। ঘড়ির কাঁটা তখন ৪টা ১৫ মিনিট পেরিয়েছে। ছোট্ট বেজমেন্টের ঘরটিতে পাশাপাশি ঘুমিয়ে ছিলেন বাবা, মা ও তাঁদের দুই ছেলে। শহরের অধিকাংশ মানুষ যখন ঘুমে, তখনই তাঁদের বাসায় আগুনের সূত্রপাত হয়। অল্প সময়ের মধ্যে আগুন ও ঘন ধোঁয়া চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।

সোহাগ প্রথমে প্রধান দরজা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হন। কিন্তু বাইরে এসে বুঝতে পারেন, স্ত্রী ও দুই ছেলে তখনো ভেতরে আটকা। বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে তিনি আবার আগুন ও ধোঁয়ার দিকে ফিরে যান। বেজমেন্টের জানালা ভেঙে একে একে বাইরে বের করে আনেন স্ত্রী ঝরনা আক্তার এবং দুই ছেলে জিহাদ ও জুবায়েরকে।

এদিকে খবর পেয়ে ২১টি ইউনিটের ৭৯ জন অগ্নিনির্বাপণকর্মী ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন এবং প্রায় ৩০ মিনিটের মধ্যে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। স্ত্রী ও দুই সন্তানকে উদ্ধার করতে পারলেও সোহাগ নিজে মারাত্মকভাবে অগ্নিদগ্ধ হন। বিষাক্ত ধোঁয়াও তাঁর ফুসফুসে প্রবেশ করে। গুরুতর অবস্থায় তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয়।

হাসপাতালে সোহাগের চিকিৎসা চলতে থাকে। স্বজন ও পরিচিতজনেরা প্রতিদিন তাঁর সুস্থতার আশায় অপেক্ষা করেছেন। স্ত্রী ও দুই সন্তানেরও আশা ছিল, তিনি সুস্থ হয়ে ঘরে ফিরবেন।

উদ্বেগ, প্রার্থনা ও অপেক্ষার মধ্য দিয়ে কেটে যায় তিনটি সপ্তাহ। অগ্নিকাণ্ডের ২১ দিন পর শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬, রাত ৮টা ৫৫ মিনিটে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। নিজের জীবন বিপন্ন করে স্ত্রী ও সন্তানদের রক্ষা করলেও শেষ পর্যন্ত তিনি আর তাঁদের কাছে ফিরে আসতে পারলেন না।

সোহাগের মৃত্যুসংবাদ ছড়িয়ে পড়তেই নিউইয়র্কের বাংলাদেশি কমিউনিটিতে নেমে আসে গভীর শোক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিসহ অসংখ্য মানুষ তাঁর সাহস ও আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করেন। অনেকের কাছে তিনি হয়ে ওঠেন একজন প্রকৃত ‘সুপারহিরো বাবা’।

রফিকুল ইসলাম সোহাগের বাড়ি বাংলাদেশের নোয়াখালী জেলার সোনাইমুড়ী উপজেলায়। জানা যায়, স্ত্রী ঝরনা আক্তার এবং দুই ছেলে জিহাদ ও জুবায়েরকে নিয়ে সাত থেকে আট মাস আগে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিলেন।

অন্য অনেক অভিবাসী পরিবারের মতো তাঁদের বুকেও ছিল নতুন জীবনের স্বপ্ন। সন্তানদের সুন্দর ভবিষ্যৎ, পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা এবং অচেনা দেশে ধীরে ধীরে নিজেদের একটি ঠিকানা তৈরি করার আকাঙ্ক্ষা নিয়েই শুরু হয়েছিল তাঁদের প্রবাসজীবন।

পরিবারের সদস্য ও পরিচিতজনদের ধারণা, সোহাগের খাবার সরবরাহের কাজে ব্যবহৃত ই-বাইকের লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে। জানা গেছে, বড় ব্যাটারিটি তিনি বাসায় চার্জ করতেন। তবে ব্যাটারিই আগুনের কারণ কি না, তা এখনো চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

নিউইয়র্কের ডেলিভারি কর্মীদের কাছে ই-বাইক জীবিকা নির্বাহের গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ। কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত, নিম্নমানের বা অননুমোদিত লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি চার্জ করার সময় আগুন লাগার ঝুঁকি থাকে। বিশেষ করে ঘুমানোর সময়, ঘরের ভেতর কিংবা বের হওয়ার পথের কাছে এমন ব্যাটারি চার্জে রাখা বিপজ্জনক।

স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, বেজমেন্ট থেকে বের হওয়ার পথ ছিল মাত্র একটি। সেখানে কার্যকর ফায়ার অ্যালার্মও ছিল না। রাতের ঘুমের মধ্যে ধোঁয়া ও আগুন ছড়িয়ে পড়ায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। এমন বদ্ধ জায়গায় আগুন লাগলে দৃষ্টিসীমা কয়েক মুহূর্তের মধ্যে কমে যেতে পারে। বিষাক্ত ধোঁয়ায় শ্বাস নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে এবং মানুষ দিক হারিয়ে ফেলতে পারেন।

ঘটনাটি অভিবাসী ও ডেলিভারি কর্মীদের আবাসন এবং কর্মপরিবেশের একটি কঠিন বাস্তবতা সামনে নিয়ে এসেছে। সীমিত আয়ের কারণে অনেক পরিবার ছোট বেজমেন্টে বসবাস করে। একই জায়গায় ঘুমানো, রান্না এবং কাজের সরঞ্জাম রাখার কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।

মানুষের জীবনের দৈর্ঘ্য দিয়ে সব সময় তার মহত্ত্ব বিচার করা যায় না। কোনো কোনো জীবনের পরিচয় লেখা হয়ে যায় একটি মুহূর্তের সিদ্ধান্তে। আগুনের সামনে দাঁড়িয়ে সোহাগ নিজের নিরাপত্তার হিসাব করেননি। একজন স্বামী ও বাবার দায়িত্ববোধ থেকে তিনি ফিরে গিয়েছিলেন স্ত্রী ও সন্তানদের কাছে।

জিহাদ ও জুবায়ের বড় হবে বাবার সাহসের গল্প শুনে। তারা জানবে, পৃথিবীর কোনো চলচ্চিত্রের কল্পিত নায়ক নয়, তাদের নিজের বাবাই আগুনের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তাদের জীবন রক্ষা করেছিলেন। স্ত্রী ঝরনার স্মৃতিতে থেকে যাবে সেই ভয়াবহ ভোর, যখন সোহাগ নিজের জীবন বিপন্ন করে পরিবারের তিন সদস্যকে নিরাপদে বের করে এনেছিলেন।

আগুন শেষ পর্যন্ত রফিকুল ইসলাম সোহাগের জীবন কেড়ে নিয়েছে। কিন্তু স্ত্রী ও দুই সন্তানের জীবনে বেঁচে থাকবে তাঁর সাহস ও আত্মত্যাগের স্মৃতি। তিনি নিজে ঘরে ফিরতে পারেননি, কিন্তু মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে দিয়ে গেছেন তাঁর সবচেয়ে প্রিয় তিনজন মানুষকে।

এনএন/ ২২ জুলাই ২০২৬


Back to top button