সম্পাদকের পাতা

যে ট্রফির জন্য পৃথিবী থেমে যায়

নজরুল মিন্টো

বিশ্বকাপের ফাইনালে শেষ বাঁশি বাজলে পৃথিবী যেন কয়েক সেকেন্ডের জন্য নিজের শ্বাস আটকে রাখে। মাঠের এক পাশে আনন্দ উছলে পড়ে, অন্য পাশে ছড়িয়ে পড়ে পরাজয়ের বিষাদ। কেউ হাঁটু গেড়ে বসে পড়েন, কেউ আকাশের দিকে তাকিয়ে দুই হাত তুলে কৃতজ্ঞতা জানান। হাজারো ক্যামেরার ফ্ল্যাশ একসঙ্গে জ্বলে ওঠে। কোটি কোটি মানুষের চোখ তখন আর মাঠের সবুজ ঘাসে থাকে না; চলে যায় একটিমাত্র বস্তুর দিকে। ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত সেই ট্রফি।

বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক যখন দুই হাতে সেটি আকাশের দিকে তুলে ধরেন, তখন তিনি শুধু একটি পুরস্কার তোলেন না। তুলে ধরেন একটি দেশের ইতিহাস, কোটি মানুষের উল্লাস, অসংখ্য শিশুর অসমাপ্ত স্বপ্ন আর চার বছরের অপেক্ষার অবসান। সেই একটি ছবিই পরের প্রজন্মকে আবার বল পায়ে দৌড়াতে শেখায়। কেউ পেলের মতো হতে চায়, কেউ ম্যারাডোনার মতো, কেউ মেসির মতো। কিন্তু তারা সবাই শেষ পর্যন্ত একই জিনিসটির দিকেই ছুটে চলে। সেই সোনালি ট্রফির দিকে।

কিন্তু এই ট্রফির নিজের গল্পও কম বিস্ময়কর নয়। তার জন্ম আছে, সংগ্রাম আছে, হারিয়ে যাওয়া আছে, আবার ফিরে আসার গল্পও আছে। এক শতাব্দী ধরে মানুষের স্বপ্নের ভেতর দিয়ে পথ চলতে চলতে ট্রফিটি নিজেই যেন হয়ে উঠেছে এক জীবন্ত চরিত্র।

গল্পের শুরুটা ১৯৩০ সালে নয়, তারও আগে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ক্ষত তখনও পৃথিবীর শরীরে তাজা। ইউরোপের দেশগুলো পরস্পরের প্রতি অবিশ্বাসে ভরা। ঠিক সেই সময় ফরাসি ক্রীড়া সংগঠক জুলে রিমে বিশ্বাস করলেন, মানুষের হাতে অস্ত্রের বদলে যদি ফুটবল তুলে দেওয়া যায়, তবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে, কিন্তু শত্রুতা কমবে। তিনি এমন একটি আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টের স্বপ্ন দেখলেন, যেখানে দেশগুলো যুদ্ধক্ষেত্রে নয়, ফুটবল মাঠে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করবে। সেই স্বপ্ন থেকেই জন্ম নিল বিশ্বকাপ।

প্রথম বিশ্বকাপের জন্য দরকার ছিল এমন একটি প্রতীক, যা শুধু বিজয় নয়, স্বপ্নকেও ধারণ করবে। ফরাসি ভাস্কর আবেল লাফ্ল্যুর তৈরি করলেন ছোট্ট একটি ট্রফি। গ্রিক বিজয়দেবী নাইকির অবয়ব খোদাই করা সেই ট্রফির নাম ছিল ‘ভিক্টরি’। পরে বিশ্বকাপ প্রতিষ্ঠায় জুলে রিমের অবদানের সম্মানে তার নাম বদলে রাখা হয় ‘জুলে রিমে ট্রফি’। তখন কেউ ভাবতেও পারেনি, এই ছোট্ট শিল্পকর্ম একদিন পৃথিবীর সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত বস্তু হয়ে উঠবে।

১৯৩০ সালের প্রথম বিশ্বকাপ বসে উরুগুয়েতে। তখন বিমানে দল পাঠানো ছিল বিলাসিতা। ইউরোপের ফুটবলারদের মতো ট্রফিটিও জাহাজে করে আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দেয়। সেই দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার মধ্য দিয়েই শুরু হয় ট্রফিটির ইতিহাসের প্রথম অধ্যায়।

ইতিহাস সত্যিই তাকে ছাড়েনি। ১৯৩৮ সালের বিশ্বকাপের পর শুরু হলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। ইউরোপজুড়ে বোমা, ধ্বংস আর অনিশ্চয়তা। সেই সময় ইতালির ফুটবল কর্মকর্তা অত্তোরিনো বারাসি বুঝতে পারলেন, ট্রফিটি না বাঁচালে হয়তো আর কোনো দিন কেউ তাকে খুঁজে পাবে না। তিনি ব্যাংকের ভল্ট থেকে ট্রফিটি বের করে একটি সাধারণ জুতার বাক্সে লুকিয়ে নিজের বাড়িতে নিয়ে এলেন। দীর্ঘদিন সেটি তাঁর বিছানার নিচে ছিল। বাইরে যুদ্ধ পৃথিবীকে গ্রাস করছে, আর ভেতরে একটি জুতার বাক্সে লুকিয়ে আছে ফুটবলের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন। ইতিহাসের সবচেয়ে মূল্যবান রক্ষাকবচগুলোর একটি ছিল সেই অতি সাধারণ বাক্স।

যুদ্ধ শেষ হলো। মানুষ আবার মাঠে ফিরল। ট্রফিও আলোয় ফিরল। কিন্তু তার জীবনের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা তখনও বাকি।

১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপের আয়োজক ইংল্যান্ড। টুর্নামেন্ট শুরুর আগে লন্ডনের এক প্রদর্শনীতে রাখা হয় জুলে রিমে ট্রফি। হঠাৎ একদিন দেখা গেল, সেটি উধাও। সংবাদটি মুহূর্তের মধ্যে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ল। পুলিশ, গোয়েন্দা, সংবাদমাধ্যম সবাই খুঁজছে বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান ফুটবল ট্রফিকে। কিন্তু যাকে খুঁজে পেল না মানুষ, তাকে খুঁজে পেল একটি কুকুর।

দক্ষিণ লন্ডনের এক ঝোপের পাশে কাগজে মোড়ানো অবস্থায় ট্রফিটি খুঁজে পায় ‘পিকলস’ নামের একটি পোষা কুকুর। পরদিন পৃথিবীর সংবাদপত্রে ফুটবলারদের সঙ্গে জায়গা করে নেয় সেই কুকুরের ছবিও। ফুটবলের ইতিহাসে খুব কম নায়কই আছেন, যাঁরা কোনো গোল না করেও কিংবদন্তি হয়ে গেছেন। পিকলস তাদেরই একজন।

জুলে রিমে ট্রফির শেষ অধ্যায় আরও বেদনাময়। নিয়ম ছিল, যে দেশ তিনবার বিশ্বকাপ জিতবে, ট্রফিটি স্থায়ীভাবে তার হয়ে যাবে। ১৯৭০ সালে পেলের ব্রাজিল সেই সম্মান অর্জন করে। মনে হয়েছিল, এবার ট্রফির জীবন শান্ত হবে। কিন্তু তা হয়নি। ১৯৮৩ সালে ব্রাজিল ফুটবল কনফেডারেশনের সদর দপ্তর থেকে ট্রফিটি আবার চুরি হয়ে যায়। এবার আর সেটি ফিরে আসেনি। ধারণা করা হয়, চোরেরা সেটি গলিয়ে ফেলেছিল। একটি ট্রফি হারিয়ে গেল, কিন্তু তার কিংবদন্তি হারাল না।

এরপর ফিফা নতুন একটি ট্রফি তৈরির সিদ্ধান্ত নেয়। ইতালীয় ভাস্কর সিলভিও গাজ্জানিগার নকশায় তৈরি হয় বর্তমান ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফি। দুটি মানবমূর্তি দুই হাত তুলে পৃথিবীকে ধারণ করে আছে। যেন ফুটবলের ভাষায় পুরো মানবজাতির বিজয়কে একসঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে। ১৮ ক্যারেট সোনায় নির্মিত এই ট্রফির নিচে বসানো হয়েছে সবুজ মালাকাইট পাথর। এর গায়ে একটির পর একটি বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দেশের নাম খোদাই হয়েছে, কিন্তু বদলায়নি একে জয়ের স্বপ্ন দেখা মানুষের সংখ্যা। উচ্চতায় মাত্র ৩৬ দশমিক ৮ সেন্টিমিটার, ওজন ছয় কেজির একটু বেশি। তবু পৃথিবীর সবচেয়ে ভারী স্বপ্ন যেন লুকিয়ে আছে তার ভেতরে।

আজও বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দল আসল ট্রফি স্থায়ীভাবে নিজেদের কাছে রাখতে পারে না। উৎসব শেষ হলে সেটি ফিরে যায় ফিফার কাছে। বিজয়ী দেশ সংরক্ষণের জন্য পায় পিতলে তৈরি ও সোনার প্রলেপ দেওয়া ট্রফিটির একটি প্রতিরূপ। নিয়মটি যেন সবাইকে মনে করিয়ে দেয়, বিশ্বকাপ কারও ব্যক্তিগত সম্পদ নয়। এটি পৃথিবীর সব ফুটবলপ্রেমীর সম্মিলিত উত্তরাধিকার। পৃথিবীতে এমন কিছু জিনিস আছে, যার মূল্য সোনার ওজনে নয়, মানুষের বিশ্বাসে মাপা হয়। সেই বিশ্বাসের নামই বিশ্বকাপ ট্রফি।

তথ্যসূত্র: ফিফা মিউজিয়াম


Back to top button