টুথপেস্টে ভয়াবহ ‘ক্ষতিকর’ মাইক্রোপ্লাস্টিক: উচ্চ আদালতে বিচার বিভাগীয় তদন্ত চেয়ে রিট!

ঢাকা, ২৭ জুলাই – দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অনুসঙ্গ টুথপেস্ট নিয়ে এক চরম আতঙ্কের খবর প্রকাশ্যে এসেছে। দেশের বাজারে বহুল বিক্রীত ৩৪টি ব্র্যান্ডের টুথপেস্ট পরীক্ষা করে ২৬টিতেই মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর ‘মাইক্রোপ্লাস্টিক’ শনাক্ত হয়েছে। এবার এই বিষয়ে বিচার বিভাগীয় তদন্ত এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপের নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট দায়ের করা হয়েছে।
সোমবার (২৭ জুলাই) সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. আবদুল্লাহ আল মামুন জনস্বার্থে এ রিট আবেদনটি দায়ের করেন।
রিটে স্বাস্থ্য সচিব, পরিবেশ সচিব, বাণিজ্য সচিব, বিএসটিআই এবং জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে বিবাদী করা হয়েছে।
বেসরকারি সংস্থা এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ইএসডিও)-র সাম্প্রতিক এক গবেষণায় এই বিষাক্ত তথ্য সামনে এসেছে।
রোববার (২৬ জুলাই) রাজধানীর লালমাটিয়ায় ইএসডিও কার্যালয়ে প্রকাশিত ‘মাইক্রোপ্লাস্টিকস ইন টুথপেস্ট: সায়েন্টিফিক এভিডেন্স ফর পলিসি অ্যান্ড রেগুলেটরি অ্যাকশন ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণায় বলা হয়—
মোট নমুনার ৭৬.৫% দূষিত: পরীক্ষা করা ৩৪টি টুথপেস্টের মধ্যে ২৬টিতেই মাইক্রোপ্লাস্টিক মিলেছে।
স্থানীয় পণ্যে উপস্থিতি বেশি: দেশে উৎপাদিত ২৫টি টুথপেস্টের মধ্যে ২২টিতেই (৮৮%) এই প্লাস্টিক কণা উপস্থিত।
শিশুদের পণ্যেও বিষ: শিশুদের জন্য নির্ধারিত ৬টি টুথপেস্টের ৪টিতেই বিষাক্ত প্লাস্টিক কণা মিলেছে।
বিদেশে উৎপাদিত পণ্যেও মিল: থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম ও ভারতের তৈরি বেশ কিছু টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি দেখা গেছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ল্যাবরেটরি অব এনভায়রনমেন্টাল হেলথ অ্যান্ড ইকোটক্সিকোলজি’-তে এই নমুনা পরীক্ষা করা হয়। গবেষকরা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, “কোনো অবস্থাতেই টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক থাকা গ্রহণযোগ্য নয়।”
কোন টুথপেস্টে কতটা মাইক্রোপ্লাস্টিক?
গবেষণার তথ্যমতে, প্রতি ১০০ গ্রাম টুথপেস্টে বিষাক্ত কণার সংখ্যা ২০ থেকে ৩২০টি পর্যন্ত পাওয়া গেছে।
সর্বোচ্চ মাত্রা: জরিপে সবচেয়ে জনপ্রিয় ‘মেডিপ্লাস ফ্লোরাইড জেলে’ সর্বোচ্চ ৩২০টি কণা মিলেছে।
অন্যান্য পরিচিত ব্র্যান্ড: ‘ক্লোজ আপ রেড হট’ ও ‘ক্লোজআপ মেন্থল ফ্রেশে’ ১৬০টি, ‘সিগন্যাল গ্রিন টিতে’ ১২০টি, এবং ‘পেপসোডেন্ট অ্যাডভান্স সল্ট’ ও ‘হিমালয়া কমপ্লিট কেয়ারে’ ১০০টি করে কণা পাওয়া গেছে।
অন্যান্য ব্র্যান্ড: ‘সেনসোডাইন ফ্রেশ মিন্টে’ ৮০টি, ‘পেপসোডент সেনসিটিভ এক্সপার্ট’, ‘হোয়াইট প্লাস’ ও ‘মেডিপ্লাস টিজিপিতে’ ৬০টি করে এবং ‘মেসওয়াক’, ‘পেপসোডেন্ট জার্মিচেক’ ও ‘ম্যাজিক হারবালে’ ৪০টি করে কণা রয়েছে।
শিশুদের টুথপেস্ট: ‘কোডোমো আল্ট্রা শিল্ড’ (১৪০টি), ‘মেরিল বেবি স্ট্রবেরি ও অরেঞ্জ’ (৬০টি ও ৪০টি) এবং ‘পেপসোডেন্ট কিডস অরেঞ্জে’ (২০টি) কণা মিলেছে।
যে ৮টি টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক মিলেনি (নিরাপদ তালিকা)
ইএসডিও-র পরীক্ষায় আটটি ব্র্যান্ডের টুথপেস্টে কোনো শনাক্তযোগ্য মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যায়নি। এগুলো হলো:
১. প্যারোডন্ট্যাক্স এক্সপার্ট গাম কেয়ার
২. জেনফ্রেশ
৩. প্যারাস্যুট জাস্ট ফর বেবি (ম্যাঙ্গো) — শিশুদের
৪. সেনসোডাইন ফ্রেশ জেল
৫. কোলগেট ম্যাক্সফ্রেশ
৬. ক্লোজআপ রেড হট জিংক ফ্রেশ টেকনোলজি
৭. কোডোমো (অরেঞ্জ) — শিশুদের
৮. কোলগেট অ্যাকটিভ সল্ট
জনস্বাস্থ্য ও জনমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া
দাঁত পরিষ্কার রাখতে গিয়ে প্রতিদিন অসচেতনভাবেই কোটি কোটি মানুষ এসব মাইক্রোপ্লাস্টিক গিলে ফেলছেন। বিশেষ করে কোমলমতি শিশুদের শরীরে এই প্লাস্টিক প্রবেশের ক্ষতি সুদূরপ্রসারী হতে পারে বলে সতর্ক করছেন চিকিৎসকেরা।
নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা বিএসটিআই এবং ভোক্তা অধিকারের নজরদারি নিয়েও এখন চরম প্রশ্ন উঠেছে। আদালতের হস্তক্ষেপের পর এই বিষাক্ত টুথপেস্টগুলোর বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।
এনএন/ ২৭ জুলাই ২০২৬









