জ্বালানি সংকটে পাকিস্তানে সরকারি গাড়ির জ্বালানি বরাদ্দ ৫০ শতাংশ কমছে

ইসলামাবাদ,১৮ সেপ্টেম্বর- মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের সংকট দেখা দিয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন-ইসরায়েল ও ইরানের তীব্র সংঘাতের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের তেল সরবরাহে বিঘ্ন ঘটছে। এর পাশাপাশি ইয়েমেনে সৌদি আরব ও ইরান-সমর্থিত হুতিদের লড়াইয়ের কারণে লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল নিয়ে নতুন করে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। এতে পুরো অঞ্চলের জ্বালানি বাজার চরম অস্থিরতার মধ্যে পড়েছে।
আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল পাকিস্তানের জন্য এই পরিস্থিতি দুই ধরনের সংকট তৈরি করেছে। একদিকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) বৈশ্বিক সরবরাহ স্বাভাবিক না থাকায় দেশে তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ ঘাটতি দেখা দিয়েছে, অন্যদিকে পেট্রোল ও ডিজেলের দাম অনেক বেড়ে গেছে। এই কঠিন জ্বালানি সংকট মোকাবিলা এবং সরকারি ব্যয় কমাতে পাকিস্তান সরকার একাধিক কঠোর কৃচ্ছ্রসাধন নীতি ও বিধিনিষেধ আরোপ করেছে।
দেশের অর্থনীতি ও জ্বালানি খাত রক্ষায় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় (পিএমও) থেকে সম্প্রতি একটি জরুরি সরকারি বিবৃতি দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, আগামী তিন মাসের জন্য সব সরকারি যানবাহনের জ্বালানি বরাদ্দ একবারে ৫০ শতাংশ কমিয়ে দেওয়া হবে। এ ছাড়া পুরো ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য কর্মচারীদের ব্যতীত অন্যান্য সামগ্রিক খরচ বা বাজেটে ৫ শতাংশ কাটছাঁটের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তথ্যপ্রযুক্তি-সংক্রান্ত সরঞ্জাম ছাড়া অন্য যেকোনো ধরনের টেকসই বা স্থায়ী সরকারি পণ্য কেনার ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। এমনকি সরকারি গাড়ি কেনাও পুরোপুরি বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রেও কঠোর প্রশাসনিক নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। আগামী তিন মাস যেকোনো ধরনের সরকারি বিদেশ সফর বা ভ্রমণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কোনো বাধ্যতামূলক বা জরুরি সফর হলেও এই নিয়ম শিথিল করা হবে না। তবে শুধু স্কলারশিপ বা শিক্ষাবৃত্তির ক্ষেত্রে এই বাধ্যবাধকতা থেকে ছাড় দেওয়া হবে।
জ্বালানি অপচয় ও যাতায়াতের খরচ কমাতে কর্মকর্তাদের সরাসরি উপস্থিত না হয়ে অনলাইন বা টেলিকনফারেন্সের মাধ্যমে সব ধরনের মিটিং করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সরকারি আনুষ্ঠানিকতার ক্ষেত্রেও একইভাবে কাটছাঁট করা হয়েছে। সব ধরনের সরকারি নৈশভোজ বা অফিশিয়াল ডিনার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এর বাইরে সাধারণ নাগরিকদের ব্যবহারেও কিছু সামাজিক বিধিনিষেধ আনা হয়েছে। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, দেশজুড়ে যেকোনো ধরনের বিয়ের অনুষ্ঠান বা সামাজিক আয়োজনে অতিথিদের জন্য ‘ওয়ান ডিস’ পরিবেশন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
চলতি বছরে পাকিস্তানে এ ধরনের কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার ঘটনা এটাই প্রথম নয়। এর আগে গত মার্চ মাসেও সরকার জ্বালানি সংরক্ষণের জন্য একই ধরনের কৃচ্ছ্রসাধন নীতি নিয়েছিল। তখন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ে টানা দুই সপ্তাহের জন্য সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়েছিল, সরকারি দপ্তরে তেলের ব্যবহার কমানো হয়েছিল এবং কর্মীদের বাসা থেকে কাজ করা বা ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করা হয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার কারণে জ্বালানি তেলের বিশ্ববাজার আরও বেশি অস্থির হয়ে পড়ায় পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
বিশ্ববাজারের এই অস্থিরতার সরাসরি প্রভাব পড়েছে দেশটির স্থানীয় খুচরা বাজারেও। গত মঙ্গলবার পাকিস্তানে পেট্রোলের দাম লিটারপ্রতি ৪.১০ পাকিস্তানি রুপি এবং হাই-স্পিড ডিজেলের দাম ৬.৪১ রুপি বাড়ানো হয়েছে। এই রেকর্ড মূল্যবৃদ্ধির পর দেশটির বাজারে পেট্রোলের দাম দাঁড়িয়েছে প্রতি লিটার ৩৮৪.৩৪ রুপি এবং ডিজেলের দাম হয়েছে ৪১৫.৮৩ রুপি। এতে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ ও মধ্যবিত্তরা চরম বিপাকে পড়েছেন। মুদ্রাস্ফীতির এই তীব্র চাপ থেকে কম আয়ের মানুষকে সাময়িক স্বস্তি দিতে পাকিস্তান সরকার একটি বিশেষ জ্বালানি ত্রাণ কর্মসূচি চালু করেছে।
জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মন্ত্রী মুসাদ্দিক মালিক সরকারের এই জ্বালানি ত্রাণ নীতি ব্যাখ্যা করে জানান, খুচরা মূল্যের এই অতিরিক্ত বৃদ্ধি থেকে সাধারণ মানুষকে সুরক্ষা দিতে সরকার প্রতি লিটারে ভর্তুকি দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। নতুন এই নীতি অনুযায়ী, মোটরসাইকেল, রিকশা ও ছোট গাড়ির মালিকরা নির্দিষ্ট একটি মাসিক কোটার ভিত্তিতে প্রতি লিটার পেট্রোলে ১০০ রুপি বা প্রায় ৩৬ সেন্ট করে বিশেষ ভর্তুকি সুবিধা পাবেন।
এস এম/ ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬







