দক্ষিণ এশিয়া

মণিপুরে ফের রক্তের হোলি: নাগা বিদ্রোহীদের গুলিতে ২ নারীসহ ২ দিনে প্রাণ গেল ৬ জনের

ইম্ফল, ১৬ সেপ্টেম্বর – ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মণিপুরে দীর্ঘ দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা জাতিগত সহিংসতার ক্ষত শুকাতে না শুকাতেই নতুন করে জ্বলে উঠেছে যুদ্ধের আগুন। এবার রাজ্যের তামেংলং জেলায় সন্দেহভাজন নাগা বিদ্রোহীদের অতর্কিত হামলায় দুই কুকি নারী নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ হামলাকারীরা বেশ কয়েকটি বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ করায় পুরো অঞ্চলজুড়ে তীব্র আতঙ্ক ও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে।

আজ বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের এক প্রতিবেদনে মণিপুরের তামেংলং ও নোনি জেলার এই সাম্প্রতিকতম নৃশংসতার খবর নিশ্চিত করা হয়েছে। প্রশাসনের কড়া নজরদারি সত্ত্বেও পাহাড়ি জেলাগুলোতে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর এই তাণ্ডব নতুন করে নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে বড়সড় প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

রক্তাক্ত ৪৮ ঘণ্টা: ৪ দিনে ৬ জনের নৃশংস মৃত্যু

গত কয়েকদিনে তামেংলং ও পার্শ্ববর্তী নোনি জেলায় পরপর ঘটা সংঘাতের ফলে মোট ৬ জনের প্রাণহানি ঘটেছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

তামেংলংয়ের সর্বশেষ হামলা: ক্ষেত থেকে ৬০ বছর বয়সী চঙ্গা সিথলো এবং ৩০ বছর বয়সী কিমবোই সিংন নামের দুই নারীর গুলিবিদ্ধ মরদেহ উদ্ধার করা হয়। হত্যার পাশাপাশি একাধিক বাসাবাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে দুষ্কৃতকারীরা এলাকা ত্যাগ করে।

১৩ সেপ্টেম্বরের হামলা (তামেংলং): টোলেন কুকি গ্রামে সশস্ত্র দুর্বৃত্তদের হামলায় এক দম্পতি নিহত হন। এই হামলায় তাদের নিষ্পাপ শিশু সন্তান গুরুতর আহত হয়, যা স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার করেছে।

১৩ সেপ্টেম্বরের হামলা (নোনি জেলা): একই দিনে নোনি জেলার লংপি গ্রামে পৃথক হামলায় এক নারী ও এক পুরুষকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়।

নতুন মোড়ে মণিপুরের পাহাড়ি রাজনীতি ও প্রশাসনের ব্যর্থতা

১. কুকি-মেইতেই সংঘাতের মাঝে নাগা ফ্যাক্টর

মণিপুরের মূল সংঘাতটি ছিল উপত্যকার মেইতেই এবং পাহাড়ি কুকি-জো সম্প্রদায়ের মধ্যে। তবে তামেংলং ও নোনি জেলায় নাগা বিদ্রোহীদের সাম্প্রতিক এই সক্রিয়তা ও হামলা সংঘাতের পরিধিকে আরও বহুমুখী ও বিপজ্জনক করে তুলছে। এটি ইঙ্গিত দেয় যে, পাহাড়ি অঞ্চলের আধিপত্য নিয়ে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে অভ্যন্তরীণ মেরুকরণ তীব্র হচ্ছে।

২. ‘কুকি ইনপি’র কড়া আল্টিমেটাম ও সরকারের নীরবতা

চুড়াচাঁদপুরভিত্তিক প্রভাবশালী কুকি সংগঠন ‘কুকি ইনপি মণিপুর’ এই হত্যাকাণ্ডের পর অত্যন্ত কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে। তারা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, নিহত নারীদের হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত ও আসামিদের গ্রেফতার করে **ন্যায়বিচার নিশ্চিত না পাওয়া পর্যন্ত তারা মরদেহ গ্রহণ করবে না**। সংগঠনটি এক বিবৃতিতে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের নীরবতাকে দায়ী করে জানিয়েছে, সুরক্ষায় প্রশাসনের চরম ব্যর্থতার কারণে পুরো পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণহীন এক মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ মোড়ের দিকে যাচ্ছে।

২০২৩ সালের মে মাস থেকে শুরু হওয়া এই নজিরবিহীন জাতিগত সহিংসতা মণিপুরকে এক মানবিক বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিয়েছে। তামেংলংয়ের এই সাম্প্রতিক হামলা প্রমাণ করে যে, রাজ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা এখনও সুদূরপরাহত। বর্তমানে উপদ্রুত অঞ্চলে অতিরিক্ত নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হলেও স্থানীয় পাহাড়ি জনপদে ক্ষোভ, অবিশ্বাস ও আতঙ্ক বেড়েই চলেছে।

এনএন/ ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

Back to top button
🌐 Read in Your Language