দক্ষিণ এশিয়া

ফারাক্কা নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই পলি ব্যবস্থাপনা নীতি অনুমোদন বিহার সরকারের

ফারাক্কা নিয়ে বিতর্ক

পাটনা, ১৬ সেপ্টেম্বর- ফারাক্কা বাঁধ ও পানি বণ্টন চুক্তি নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রতিবাদ এবং পর্যালোচনার দাবির মধ্যে বিহার সরকার বিশেষ পদক্ষেপ হিসেবে পলি ব্যবস্থাপনা নীতি অনুমোদন করেছে। মঙ্গলবার মুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে ‘বিহার জলসম্পদ পুনরুদ্ধার ও পলল ব্যবস্থাপনা নীতি ২০২৪’ শিরোনামের খসড়া প্রস্তাবটি পাস করা হয়। মূলত রাজ্যের প্রধান নদী ও জলাশয়গুলোর স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখা, পানি ধারণক্ষমতা বাড়ানো এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার লক্ষ্যেই এই নীতি নেওয়া হয়েছে।

এই নীতি এমন সময়ে অনুমোদন পেল, যখন ফারাক্কা ব্যারেজের কারণে গঙ্গার উজানে অতিরিক্ত পলি জমে নদী ভরাট হয়ে যাচ্ছে—এমন অভিযোগ তুলে বিহারের একাধিক রাজনৈতিক দল ব্যারেজটি ভেঙে ফেলার দাবি জানাচ্ছে। একই সঙ্গে চলতি বছরের ডিসেম্বরে মেয়াদ শেষ হতে যাওয়া গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি পুনর্মূল্যায়নের দাবিও জোরালো হয়েছে। বিহার সরকারের নতুন সিদ্ধান্তকে ফারাক্কা ব্যারেজের কারণে তৈরি পলি জমার সমস্যা মোকাবিলা এবং নিয়মিত পলি অপসারণ না হওয়ার দীর্ঘদিনের জটিলতা কমানোর একটি প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সিদ্ধান্তের বিস্তারিত ব্যাখ্যায় মন্ত্রিসভা সচিবালয় বিভাগের অতিরিক্ত মুখ্য সচিব অরবিন্দ কুমার চৌধুরী জানিয়েছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ও ধরনে বড় ধরনের অনিয়ম দেখা যাচ্ছে। অন্যদিকে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, কৃষির ওপর বাড়তি চাপ, নগরায়ন ও শিল্পায়নের কারণে পানির চাহিদাও দিন দিন বাড়ছে। তিনি বলেন, অতিরিক্ত পলি জমে নদী, ব্যারেজ ও জলাশয়গুলোর পানি বহন এবং ধারণক্ষমতা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। এর ফলে সেচের সক্ষমতা কমার পাশাপাশি ঘনঘন ও তীব্র বন্যার ঝুঁকিও বাড়ছে। একই সঙ্গে নদীগুলোর নাব্যতা কমে যাওয়ায় ভূগর্ভস্থ ও ভূ-পৃষ্ঠের পানির ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে মানুষের জীবন রক্ষা এবং সার্বিক উন্নয়ন বজায় রাখতে পানি নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব বেড়ে যাওয়ায় সরকার এই নীতি গ্রহণ করেছে।

অরবিন্দ কুমার চৌধুরী জানান, নীতিটির প্রধান লক্ষ্য হলো জলাশয়গুলোতে জমে থাকা পলি অপসারণ করে সেগুলোর স্বাভাবিক ধারণক্ষমতা ফিরিয়ে আনা। নদী ও জলাশয় থেকে তোলা পলি ফেলে না রেখে বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণে ব্যবহার করা হবে। বিশেষ করে জাতীয় সড়ক, রেলপথ, রাজ্য সরকারের অধীন সড়ক, সেচ অবকাঠামো, বন্যা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং ভবন নির্মাণের মতো প্রকল্পে মাটির বিকল্প হিসেবে এই পলি ব্যবহারের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বিহারের পানিসম্পদ বিভাগের মন্ত্রিসভা নোটে বলা হয়েছে, বর্তমানে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্থানীয়ভাবে মাটি সংগ্রহ করতে গিয়ে নানা সমস্যায় পড়তে হয় এবং অনেক সময় উর্বর কৃষিজমির মাটিও ব্যবহার করা হয়। নতুন নীতির আওতায় নদী থেকে উত্তোলন করা পলি দিয়ে সেই চাহিদা পূরণ করা হবে, যা উর্বর জমি রক্ষাতেও সহায়তা করবে।

জলবায়ু ও পানিসম্পদ বিশেষজ্ঞরা সরকারের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানালেও তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বেশ কিছু সতর্কতা মেনে চলার পরামর্শ দিয়েছেন। সোসাইটি ফর ওয়াটারশেড অ্যান্ড রুরাল ডেভেলপমেন্টের পরিচালক ও প্রগতিশীল কৃষি মঞ্চের জাতীয় আহ্বায়ক কিশোর জয়সওয়াল জানান, নদী ও জলাশয় থেকে পলি তুলতে হবে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ও নির্ধারিত পরিমাপ মেনে। কারণ নিয়ম মেনে না নিয়ে এক জায়গা থেকে বেশি এবং অন্য জায়গা থেকে কম পলি তুললে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ ও প্রবাহের ধরন বদলে যেতে পারে। পাশাপাশি অপসারণ করা পলি কোথায় এবং কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটিও কঠোরভাবে নজরদারিতে রাখতে হবে, যাতে মাটি বা পরিবেশের গুণমান নষ্ট না হয়। বিশেষ করে পলি উত্তোলনের কাজে থাকা বেসরকারি সংস্থাগুলোর ওপর নজরদারি বাড়ানোর পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, সময় ও অর্থ বাঁচাতে ঠিকাদাররা অনেক সময় নদী বা জলাশয়ের মাঝখান থেকে পলি না তুলে তীর বা কিনারা থেকে মাটি তুলে থাকেন, যা নদীর জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।

এস এম/ ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

 

Back to top button
🌐 Read in Your Language