
ডেট্রয়েট নদীর ওপর দাঁড়িয়ে থাকা গর্ডি হাও আন্তর্জাতিক সেতুটি কেবল ইস্পাত, কংক্রিট আর তারের তৈরি একটি স্থাপনা নয়। ২৪ জুলাই শুক্রবার সেতুর কানাডীয় প্রান্তে যখন উদ্বোধন উপলক্ষে প্রতীকী ফিতা কাটা হলো, তখন অনুষ্ঠানটি পেল আলাদা রাজনৈতিক তাৎপর্য। বার্তাটি ছিল পরিষ্কার: কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিবেশী ও গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার, কিন্তু অধীনস্থ রাষ্ট্র নয়।
অনুষ্ঠানে ট্রাম্প প্রশাসনের কোনো প্রতিনিধি ছিলেন না। উদ্বোধনী আয়োজনটি দুই দেশের যৌথ উৎসব হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন শুল্ক-হুমকির পর কানাডা সেই আয়োজন বাতিল করে দেয়। এরপর কানাডীয় নেতারা নিজেরাই প্রতীকী ফিতা কেটে উদ্বোধনের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেন। ট্রাম্প অভিযোগ করেছেন, কানাডা যুক্তরাষ্ট্রকে অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানায়নি। পুরো ঘটনাটি ওয়াশিংটনের প্রতি ছিল একটি শক্ত বার্তা: বন্ধুত্ব সম্মানের ভিত্তিতে টিকে থাকে, হুমকির মুখে নয়।
কানাডা একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তার সম্পর্ক অভিভাবক ও অধীনস্থের সম্পর্ক নয়। দুই দেশের সীমান্ত যত দীর্ঘই হোক এবং অর্থনীতি যত ঘনিষ্ঠভাবেই জড়িত থাকুক, কানাডার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার দেশটির জনগণ ও তাদের নির্বাচিত সরকারের। প্রায় ৬ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে নির্মিত গর্ডি হাও সেতুর অর্থায়নও করেছে কানাডা। ২ দশমিক ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ সেতুটি উইন্ডসর ও ডেট্রয়েটকে যুক্ত করেছে।
কানাডা সরকারের হিসাবে, এ সীমান্তপথ দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ২৭৪ মিলিয়ন কানাডীয় ডলারের বাণিজ্য হয়। নতুন এই সেতু পণ্য পরিবহনকে আরও দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য করবে। ইউনিভার্সিটি অব উইন্ডসরের ক্রস-বর্ডার ইনস্টিটিউটের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, সেতুটি ট্রাকচালকদের বছরে আনুমানিক আট লাখ পঞ্চাশ হাজার ঘণ্টা অপেক্ষার সময় বাঁচাতে পারে। এতে জ্বালানি খরচের পাশাপাশি যানবাহন দাঁড়িয়ে থাকার কারণে সৃষ্ট বায়ুদূষণও কমবে। ফলে সেতুটি উত্তর আমেরিকার অন্যতম ব্যস্ত বাণিজ্যপথে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন।
অথচ সেতুটি চালু হওয়ার আগমুহূর্তেও ট্রাম্প প্রশাসনের চাপ থামেনি। নির্মাণে যুক্তরাষ্ট্র কোনো অর্থ বিনিয়োগ না করলেও সেতুর রাজস্বে অংশ দাবি করে ওয়াশিংটন। অবশেষে সেই দাবি মেনে সমঝোতায় পৌঁছানোর পরই সেতুটি চালুর পথ খোলে। প্রধানমন্ত্রী মার্ক কারনির ভাষ্য অনুযায়ী, সমঝোতায় দেওয়া এই ছাড়ের বর্তমান মূল্য মোট প্রকল্প ব্যয়ের প্রায় পাঁচ শতাংশ। ঘটনাটি বড় একটি প্রশ্ন সামনে এনেছে: কানাডার অর্থে নির্মিত অবকাঠামো চালুর আগে যুক্তরাষ্ট্রকে রাজস্বের অংশ দিতে হবে কেন?
অন্টারিওর প্রিমিয়ার ডাগ ফোর্ড কিংবদন্তি হকি খেলোয়াড় গর্ডি হাওয়ের ৯ নম্বরসংবলিত লাল ‘টিম কানাডা’ জার্সি পরে অনুষ্ঠানে যোগ দেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে শুল্ক আরোপ করলে অন্টারিও জবাব দিতে প্রস্তুত এবং কানাডা পিছু হটবে না। প্রধানমন্ত্রী মার্ক কারনির সঙ্গে ঐক্যবদ্ধভাবে শক্ত অবস্থান থেকে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার কথাও জানান তিনি। তাঁর বক্তব্য ও পোশাক, দুটিতেই সেদিন ফুটে উঠেছিল ‘টিম কানাডা’র দৃঢ় অবস্থান।
উইন্ডসরের মেয়র ড্রু দিলকেন্স আরও সরাসরি বলেছেন, কানাডা অনিশ্চয়তা, হুমকি ও দাদাগিরির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। তবে এই প্রতিবাদ যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের বিরুদ্ধে নয়; এটি ট্রাম্প প্রশাসনের চাপ প্রয়োগের কৌশলের বিরুদ্ধে। ডেট্রয়েট ও উইন্ডসরের মানুষ বহু দশক ধরে কর্মসংস্থান, ব্যবসা, পরিবার ও সংস্কৃতির বন্ধনে যুক্ত। সীমান্তের দুই পাশের বহু শ্রমিকের জীবিকা একই সরবরাহব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। গর্ডি হাও সেতুও শেষ পর্যন্ত দুই দেশের মানুষ ও অর্থনীতিকেই উপকৃত করবে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্রের বাজার ছাড়া কানাডা অচল। বাস্তবতা হলো, দুই দেশের অর্থনীতি পরস্পরনির্ভরশীল। কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্যিক অংশীদার। কানাডার জ্বালানি, খনিজ, অ্যালুমিনিয়াম, কাঠ, কৃষিপণ্য এবং অটো যন্ত্রাংশ মার্কিন শিল্প ও সাধারণ ভোক্তাদের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। কানাডীয় পণ্যের ওপর শুল্ক বসালে তার মূল্য শেষ পর্যন্ত মার্কিন আমদানিকারক এবং ভোক্তাদেরও দিতে হবে। সুতরাং ভয় দেখানোর এই রাজনীতি একমুখী নয়। সীমান্তের এক পাশে আঘাত করলে তার কম্পন অন্য পাশেও পৌঁছায়।
সেতুটির নাম রাখা হয়েছে কানাডায় জন্ম নেওয়া কিংবদন্তি হকি খেলোয়াড় গর্ডি হাওয়ের নামে। জীবনের বড় অংশ ডেট্রয়েট রেড উইংসের হয়ে খেললেও তিনি সীমান্তের দুই পাশের মানুষের ভালোবাসা পেয়েছিলেন। তাঁর নামে নির্মিত সেতুটিও বিভাজনের নয়, সংযোগের প্রতীক। সেতু দুই তীরকে কাছে আনে, একটি তীরকে অন্যটির মালিক বানায় না।
গর্ডি হাও সেতুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অনুপস্থিত মার্কিন অতিথিদের চেয়েও বেশি চোখে পড়েছে কানাডার দৃঢ় অবস্থান। নিজেদের অর্থে নির্মিত সেতুর সামনে দাঁড়িয়ে কানাডীয় নেতারা স্পষ্ট করে দিয়েছেন: কানাডা আলোচনায় আগ্রহী, কিন্তু জাতীয় মর্যাদা বিসর্জন দিতে প্রস্তুত নয়। ট্রাম্প প্রশাসন যদি মনে করে শুল্ক ও রাজনৈতিক চাপ দিয়ে কানাডাকে ইচ্ছেমতো পরিচালনা করা যাবে, তবে সেটি তাদের ভুল ধারণা। কানাডা প্রতিবেশী, কিন্তু অধীনস্থ নয়।
এনএন/ ২৫ জুলাই ২০২৬









