সম্পাদকের পাতা

শেষ বিকেলের পথিক শরীফ রহমান

নজরুল মিন্টো

টরন্টো থেকে প্রায় ১৯০ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে, জর্জিয়ান বে’র তীরে ছোট্ট শান্ত শহর ওয়েন সাউন্ড। লেক হুরনের জলরেখা, প্রকৃতির স্নিগ্ধতা আর সহজ জীবনযাপনের জন্যই শহরটি সাধারণত পরিচিত। কিন্তু সেই শান্ত শহরের বুকেই এক বিকেলে ঘটে যায় এক মর্মান্তিক ঘটনা। ওয়েন সাউন্ডের জনপ্রিয় ‘দ্য কারি হাউস’ রেস্তোরাঁর মালিক বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত শরীফ রহমানকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। প্রায় তিন বছর পর সেই হত্যাকাণ্ডের বিচারপ্রক্রিয়া এখন নতুন মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে।

২০২৬ সালের ৫ জুন অন্টারিওর আদালতে রবার্ট ইভান্স জুনিয়র শরীফ রহমানের মৃত্যুর দায় স্বীকার করে দোষী সাব্যস্ত হন। তাঁর বাবা রবার্ট বাসবি ইভান্স সিনিয়র এবং চাচা ব্যারি ইভান্স অপরাধের পর সহায়তার দায়ে দোষ স্বীকার করেন।

সর্বশেষ আদালত সংক্রান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রবার্ট ইভান্স জুনিয়রের জন্য ৪২ মাস কারাদণ্ডের যৌথ প্রস্তাব রাখা হয়েছে। তাঁর সাজা ঘোষণার দিন নির্ধারিত হয়েছে ২০২৬ সালের ১০ জুলাই। রবার্ট বাসবি ইভান্স সিনিয়র ও ব্যারি ইভান্সের ক্ষেত্রেও সাজা নির্ধারণের প্রক্রিয়া চলছে। তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, ঘটনার পর রবার্ট ইভান্স জুনিয়রকে পালাতে সহায়তা করা। তাঁরা ইমিগ্রেশন হোল্ডে আছেন এবং কানাডা থেকে যুক্তরাজ্যে ফেরত পাঠানোর সম্ভাবনা রয়েছে।

এই তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল কানাডায় নয়, স্কটল্যান্ডে। ঘটনার পর তাঁরা কানাডা ছেড়ে যুক্তরাজ্যে পালিয়ে যান। দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানার ভিত্তিতে স্কটল্যান্ডে তাঁদের আটক করা হয়। গ্রেপ্তারের পর শুরু হয় প্রত্যর্পণের আইনি লড়াই। ২০২৫ সালের ১১ ডিসেম্বর তাঁদের কানাডায় ফিরিয়ে এনে ১২ ডিসেম্বর ওয়েন সাউন্ডের আদালতে তাঁদের হাজির করা হয়। এরপর থেকে মামলার কার্যক্রম এগোতে থাকে।

এবার ফিরে দেখা যাক সেই মানুষটিকে, যার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে এই মামলার শুরু।

শরীফ রহমান ছিলেন শুধু একজন রেস্তোরাঁ মালিক নন। তিনি ছিলেন এক স্নিগ্ধ স্বভাবের মানুষ, যিনি ব্যবসার হিসাবের বাইরে মানুষকে চিনতেন। কেউ খাবার খেতে আসতেন, কেউ কাজ শেষে একটু কথা বলতে আসতেন, কেউ নতুন শহরে এসে পরামর্শ চাইতেন। শরীফ তাঁদের জন্য শুধু দোকানের মালিক ছিলেন না, ছিলেন একজন ভরসার মানুষ। তাঁর রেস্তোরাঁটি খাবারের জায়গার চেয়ে বেশি হয়ে উঠেছিল মানুষের মিলনস্থল।

সিলেট শহরের বটেশ্বর এলাকার শিক্ষিত পরিবারে জন্ম শরীফের। ছোটবেলা থেকেই তাঁর ভেতরে ছিল পৃথিবীকে জানার আগ্রহ। তিনি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সপ্তম ব্যাচের মেধাবী ছাত্র ছিলেন। এরপর উচ্চশিক্ষার জন্য যান যুক্তরাজ্যে। গ্লাসগো ইউনিভার্সিটি থেকে ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্টে মাস্টার্স করেন। পরে ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটি থেকে এমফিল সম্পন্ন করেন। শিক্ষা তাঁকে বিশ্বদৃষ্টি দিয়েছিল, কিন্তু তাঁর ভেতরের মানুষটি থেকে গিয়েছিল সহজ, পরিশ্রমী এবং মানবিক।

উচ্চশিক্ষার পর শরীফ রহমান জীবনকে শুধু নিজের জন্য সাজাতে চাননি। তিনি পরিবার নিয়ে কানাডায় আসেন। নতুন দেশে নতুন শিকড় গড়ার স্বপ্ন ছিল তাঁর চোখে। ওয়েন সাউন্ডের এক কোণে তিনি গড়ে তোলেন ‘দ্য কারি হাউস’। সেখানে শুধু খাবারের আয়োজন ছিল না, ছিল অভিবাসী জীবনের সাহস, পরিবারকে টিকিয়ে রাখার লড়াই এবং মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের উষ্ণতা।

কমিউনিটির নানা কাজে শরীফ যুক্ত ছিলেন। বাচ্চাদের ফুটবল টুর্নামেন্টে সহায়তা করতেন, দুঃস্থদের জন্য ফান্ড রেইজিংয়ে অংশ নিতেন, নতুন অভিবাসী পরিবার এলে পাশে দাঁড়াতেন। অনেকে তাঁকে বড় ভাইয়ের মতো দেখতেন। তাঁর হাসি ছিল সহজ, তাঁর ব্যবহার ছিল বিনয়ী। খুব অল্পদিনেই তিনি ওয়েন সাউন্ডের মানুষের কাছে পরিচিত এবং প্রিয় হয়ে ওঠেন।

২০২৩ সালের ১৭ আগস্ট। গ্রীষ্মের শেষভাগ। শহরটি তখন দিনের ব্যস্ততা গুটিয়ে সন্ধ্যার দিকে এগোচ্ছিল। সেদিন কয়েকজন ব্যক্তি ‘দ্য কারি হাউস’ রেস্তোরাঁয় আসেন। তাঁরা খাবার ও পানীয় অর্ডার করেন। আদালতে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, বিলের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৪৫ ডলার। খাওয়া শেষে তাঁরা বিল না দিয়ে চলে যাওয়ার চেষ্টা করেন। শরীফ রহমান তাঁদের থামাতে বাইরে যান।

একজন ব্যবসায়ী হিসেবে তিনি নিজের পাওনা চাইতে গিয়েছিলেন। কিন্তু রেস্তোরাঁর বাইরের সেই মুহূর্ত দ্রুত বিপর্যয়ে বদলে যায়। আদালতে রবার্ট ইভান্স জুনিয়র স্বীকার করেছেন, তিনি শরীফ রহমানকে আঘাত করেন। সেই আঘাতে শরীফ মাটিতে পড়ে যান। মাথায় গুরুতর আঘাত লাগে। তাঁকে প্রথমে স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে লন্ডন, অন্টারিওর হাসপাতালে নেওয়া হয়।

এরপর শুরু হয় এক সপ্তাহের অপেক্ষা। শরীফ রহমানের স্ত্রী শায়লা রহমান এবং তাঁদের ছোট মেয়ে হাসপাতালের বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন এক আশ্চর্য প্রত্যাবর্তনের আশায়। কিন্তু ২০২৩ সালের ২৪ আগস্ট শরীফ রহমান আর ফিরলেন না। মাত্র ৪৪ বছর বয়সে থেমে গেল এক শিক্ষিত, পরিশ্রমী, স্বপ্নবান মানুষের জীবন।

শরীফ রহমানের মৃত্যুর খবর ওয়েন সাউন্ডকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দেয়। শহরের মানুষ রেস্তোরাঁর সামনে ফুল রাখেন, হাতে লেখা চিঠি রেখে যান, শিশুরা ছবি আঁকে। যে মানুষটি প্রতিদিন তাঁদের হাসিমুখে স্বাগত জানাতেন, তিনি আর দরজা খুলবেন না, এই সত্য মেনে নিতে অনেকের সময় লেগেছে। শবযাত্রার দিন রাস্তার দুই পাশে মানুষ দাঁড়িয়ে ছিলেন শ্রদ্ধা জানাতে। কানাডার পতাকার পাশে বাংলাদেশের পতাকাও দেখা যায়। সেই দৃশ্য শুধু একজন অভিবাসীর প্রতি শ্রদ্ধা ছিল না, ছিল এক শহরের কৃতজ্ঞতা।

ঘটনার পর পুলিশ তদন্তে নামে। সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য এবং জনসাধারণের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য মিলিয়ে সন্দেহভাজনদের পরিচয় সামনে আসে। তদন্তে দ্রুতই স্পষ্ট হয়, হামলার পর তাঁরা কানাডা ছেড়ে যুক্তরাজ্যে চলে গেছেন। এরপর শুরু হয় আন্তর্জাতিক পর্যায়ের অনুসন্ধান, যা শেষ পর্যন্ত তাঁদের স্কটল্যান্ডে গ্রেপ্তারের পথ তৈরি করে।

আদালতে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, ঘটনার পর ব্যারি ইভান্স রবার্ট ইভান্স জুনিয়রকে পালাতে সহায়তা করেন। রবার্ট বাসবি ইভান্স সিনিয়র ছেলের যুক্তরাজ্যে ফেরার বিমান টিকিটের ব্যবস্থা করেন বলে আদালতে উল্লেখ করা হয়। আরও বলা হয়, ব্যারি ইভান্স পরে তাঁদের অবস্থানের প্রমাণ মুছে ফেলার চেষ্টা করেন। এসব তথ্য মামলাটিকে শুধু একটি আকস্মিক আঘাতের ঘটনায় সীমাবদ্ধ রাখেনি, বরং ঘটনার পর পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা ও সহায়তার বিষয়টিকেও সামনে এনেছে।

আইনের ভাষায় এখন এই মামলার পরবর্তী ধাপ সাজা। রবার্ট ইভান্স জুনিয়রের সাজা ঘোষণার দিন ২০২৬ সালের ১০ জুলাই। তাঁর বাবা ও চাচার ক্ষেত্রেও আদালত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবে। কিন্তু শরীফ রহমানের পরিবারের কাছে এই প্রক্রিয়া কেবল আইনের নয়, গভীর ব্যক্তিগত শোকেরও পথ। কোনো সাজা, কোনো রায়, কোনো আদালত একটি শিশুর জীবনে বাবাকে ফিরিয়ে দিতে পারে না। কোনো বিচার একজন স্ত্রীর অসমাপ্ত সংসারের শূন্যতা পূরণ করতে পারে না। তবু বিচার দরকার, কারণ ন্যায়বিচার অন্তত একটি জীবনের মূল্যকে স্বীকার করে।

শরীফ রহমানের গল্প তাই শুধু একটি অপরাধকাহিনি নয়। এটি অভিবাসী জীবনের সাহস, মানবিকতা এবং ভাঙা স্বপ্নের গল্প। এটি এমন এক মানুষের গল্প, যিনি উচ্চশিক্ষিত হয়েও জীবনকে জটিল করে দেখেননি। নিজের পরিবার, নিজের রেস্তোরাঁ, নিজের কমিউনিটি এবং মানুষের জন্য ছোট ছোট ভালো কাজের ভেতরেই তিনি জীবনের অর্থ খুঁজে নিয়েছিলেন।

শেষ বিকেলের পথিকের মতো শরীফ রহমান চলে গেছেন। ওয়েন সাউন্ডের ‘দ্য কারি হাউস’ এখন আর আগের মতো নেই। কিন্তু সেই দরজা, সেই রাস্তা, সেই শহর এখনও শরীফ রহমানের স্মৃতি বহন করে। তাঁর মৃত্যু মানুষকে কাঁদিয়েছে, তাঁর জীবন মানুষকে ভাবিয়েছে।

তথ্যসূত্র:

The Scottish Sun (৫ জুন ২০২৬)

Owen Sound Current (৮ মে ২০২৬)


Back to top button
🌐 Read in Your Language