সম্পাদকের পাতা

বিশ্বকাপে ইরানের সঙ্গে এমন আচরণ কেন

নজরুল মিন্টো

যে দেশের সঙ্গে যুদ্ধ, সেই দেশের মাটিতেই খেলতে গেল ইরান। এ যেন শুধু ফুটবলের ঘটনা নয়, সময়ের এক গভীর প্রতীক। একদিকে সীমান্ত, ভিসা, সন্দেহ, নিরাপত্তা, রাজনৈতিক বৈরিতা। অন্যদিকে সবুজ মাঠ, সাদা জার্সি, জাতীয় সঙ্গীত, আর কোটি মানুষের বুকের ভেতর জমে থাকা আশা।

ইচ্ছে করলে ইরান এই বিশ্বকাপ বয়কট করার অসংখ্য কারণ তুলে ধরতে পারত। বলতে পারত, যে দেশে আমাদের প্রবেশই অনিশ্চিত, যে দেশে আমাদের কর্মকর্তারা ভিসা পাচ্ছেন না, যে দেশে আমাদের সমর্থকদের উপস্থিতি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, সেই দেশে গিয়ে আমরা কেন খেলব? কিন্তু ইরান সে পথ নেয়নি। কারণ খেলাটা সরকারের জন্য নয়, কূটনীতির জন্য নয়, নিষেধাজ্ঞার জন্য নয়। খেলাটা দেশের মানুষের জন্য।

২০২৬ বিশ্বকাপে ইরানের গল্প শুরু হয়েছে মাঠে নামার আগেই। তাদের মূল প্রস্তুতি শিবির হওয়ার কথা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই পরিকল্পনা বদলে যায়। ভিসা অনিশ্চয়তা ও রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে ইরান দলকে মেক্সিকোর তিহুয়ানায় ঘাঁটি গাড়তে হয়। সেখান থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে তাদের গ্রুপ পর্বের ম্যাচ খেলতে হচ্ছে।

ঘটনার ধারাবাহিকতা শুরু হয় মে মাসের শেষ দিকে। ২৮ মে ইরান ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি মেহদি তাজ বলেন, বিশ্বকাপের ম্যাচ খেলতে হলে ইরানি খেলোয়াড় ও সাপোর্ট স্টাফদের একাধিকবার যুক্তরাষ্ট্রে ঢোকা ও বের হওয়ার প্রয়োজন হবে। তাই তাদের মাল্টিপল-এন্ট্রি ভিসা দরকার। তখনও ইরান দলের যুক্তরাষ্ট্র ভিসা নিশ্চিত হয়নি।

৫ জুন পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। রয়টার্সকে দেওয়া বক্তব্যে মেক্সিকোতে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত আবুল ফজল জানান, প্রথম ম্যাচের মাত্র ১০ দিন আগে পর্যন্ত ইরান দল যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা পায়নি। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র ইরান প্রতিনিধিদলের মধ্যে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রবেশে আপত্তি জানাচ্ছিল।

৭ জুন ইরান দল তুরস্ক থেকে মেক্সিকোর তিহুয়ানায় পৌঁছে। খেলোয়াড়দের ভিসা দেওয়া হলেও ফেডারেশনের কয়েকজন প্রশাসনিক ও ব্যবস্থাপনাগত সদস্য ভিসা পাননি। ইরানের পক্ষ থেকে প্রথমে ১৫ জন কর্মকর্তার ভিসা না পাওয়ার কথা বলা হয়, পরে কিছু ভিসা অনুমোদনের পর সেই সংখ্যা ১১-তে নেমে আসে। আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরান দলকে এমন এক পরিস্থিতিতে বিশ্বকাপ শুরু করতে হয়েছে, যেখানে তারা যুক্তরাষ্ট্রে ম্যাচ খেলবে, কিন্তু থাকবে মেক্সিকোতে।

এরপর আসে আরেক বিতর্ক। ৯ জুন ইরান ফুটবল ফেডারেশন অভিযোগ করে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের সমর্থকদের জন্য বরাদ্দ টিকিট ব্যবস্থাও বাধাগ্রস্ত করেছে। ফিফার নিয়ম অনুযায়ী অংশগ্রহণকারী দেশের ফেডারেশনগুলো তাদের সমর্থকদের জন্য নির্দিষ্ট টিকিট বরাদ্দ পায়। ইরানের অভিযোগ, সেই স্বাভাবিক প্রক্রিয়াও প্রশ্নের মুখে ফেলা হয়েছে।

১৪ জুন ইরান দল তিহুয়ানা থেকে লস অ্যাঞ্জেলেসে যায় নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচ খেলতে। একই দিনে রয়টার্স জানায়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তি চুক্তির ঘোষণা এসেছে। এমন এক পটভূমিতে ইরান কোচ আমির গালেনোয়েই সংবাদ সম্মেলনে বলেন, তাঁরা রাজনৈতিক মানুষ নন, তাঁরা ফুটবল খেলতে এসেছেন এবং ইরানের মানুষের প্রতিনিধিত্ব করতে এসেছেন।

এই একটি কথার মধ্যেই ইরানের বিশ্বকাপ যাত্রার আসল অর্থ লুকিয়ে আছে। তারা জানত, মাঠের বাইরে তাদের ঘিরে থাকবে সন্দেহ, প্রতিবাদ, রাজনৈতিক প্রতীক, রাষ্ট্রীয় বৈরিতা। লস অ্যাঞ্জেলেসে প্রবাসী ইরানিদের মধ্যেও ছিল বিভক্তি। কেউ জাতীয় দলকে সমর্থন করেছে, কেউ ইরান সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছে। কিন্তু মাঠে নামার মুহূর্তে খেলোয়াড়দের সামনে ছিল একটাই দায়িত্ব, ফুটবল খেলা।

১৫ জুন লস অ্যাঞ্জেলেসে সেই চাপ নিয়েই নিউজিল্যান্ডের মুখোমুখি হয় ইরান। শুরুতেই পিছিয়ে পড়ে তারা। নিউজিল্যান্ড এগিয়ে যায় এলাইজা জাস্টের গোলে। কিন্তু ইরান ভেঙে পড়েনি। ৩২ মিনিটে রামিন রেজায়িয়ান সমতা ফেরান। দ্বিতীয়ার্ধে নিউজিল্যান্ড আবার এগিয়ে যায়। এবারও ইরান ফিরে আসে। ৬৪ মিনিটে মোহাম্মদ মোহেবির গোলে ম্যাচ দাঁড়ায় ২-২। শেষ পর্যন্ত সেই ফলেই খেলা শেষ হয়।

ফলটা শুধু এক পয়েন্ট নয়। এটি ছিল এক ধরনের ঘোষণা। যে দল ভিসা জটিলতা, অনিশ্চিত যাত্রা, অস্বাভাবিক প্রস্তুতি, সীমান্ত পেরিয়ে ম্যাচে আসা, ম্যাচ শেষে আবার মেক্সিকোতে ফিরে যাওয়ার চাপ নিয়ে খেলছে, সেই দল বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে দুবার পিছিয়ে পড়েও ফিরে এসেছে। এ জন্যই ইরানের এই ড্র অনেকের কাছে জয়ের মতো মনে হয়েছে।

ম্যাচ শেষে ক্ষোভ আর চেপে রাখতে পারেননি কোচ গালেনোয়েই। তিনি বলেন, ইরান এই বিশ্বকাপের সবচেয়ে অবহেলিত দল। তাঁর অভিযোগ, ম্যাচের পর বিশ্রাম ও পুনরুদ্ধারের সুযোগ না দিয়ে দলকে সঙ্গে সঙ্গে মেক্সিকোতে ফিরে যেতে বলা হয়েছে। অধিনায়ক মেহদি তারেমিও বলেন, এই পরিস্থিতি ফুটবলের জন্য ভালো নয়। বিশ্বকাপের মতো আসরে দলকে পরের ম্যাচের প্রস্তুতির জন্য স্বাভাবিক পরিবেশ দরকার।

১৬ জুন আরেকটি ঘটনা এই জটিলতাকে আরও স্পষ্ট করে। ইরানি উইঙ্গার মেহদি তোরাবির ভিসা প্রথম ম্যাচের পর যুক্তরাষ্ট্র ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে যায়। পরে ইরান ফুটবল ফেডারেশন ও ফিফার সমন্বয়ে তাঁকে নতুন মাল্টিপল-এন্ট্রি ভিসা দেওয়া হয়।

ফিফা সবসময় বলে, ফুটবল মানুষকে এক করে। কিন্তু ইরানের অভিজ্ঞতা প্রশ্ন তুলেছে, বিশ্বকাপ কি সত্যিই সবার জন্য সমান? নিরাপত্তা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রের নিজস্ব আইনও আছে। কিন্তু বিশ্বকাপ যখন একটি বৈশ্বিক আয়োজন, তখন অংশগ্রহণকারী দলের খেলোয়াড়, কোচ, কর্মকর্তা, সাংবাদিক ও সমর্থকদের ন্যায্য সুযোগ নিশ্চিত করার দায়ও আয়োজক ও ফিফার।

ইরানকে পছন্দ করা বা অপছন্দ করার প্রশ্ন এটি নয়। ইরানের সরকার নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে। অভিবাসী ইরানিদের ভেতরেও গভীর রাজনৈতিক বিভক্তি আছে। কিন্তু জাতীয় দলের খেলোয়াড়রা যখন মাঠে নামে, তখন তারা শুধু রাষ্ট্রের প্রতিনিধি নয়, তারা মানুষের স্বপ্নের প্রতিনিধি। তেহরান, মাশহাদ, ইসফাহান, শিরাজ কিংবা বিদেশের কোনো ছোট ঘরে বসে যে শিশু টিভির পর্দায় ইরানের জার্সি দেখে, তার কাছে এই খেলা রাজনীতির ভাষায় অনুবাদ করা যায় না।

তাই প্রশ্নটি থেকে যায়। বিশ্বকাপের মাঠে ইরানের সঙ্গে এমন আচরণ কেন? যদি ইরানকে খেলতেই দেওয়া হয়, তবে তাদের প্রস্তুতির অধিকার কেন অর্ধেক? যদি তাদের মাঠে নামতেই দেওয়া হয়, তবে সমর্থকদের স্বাভাবিক উপস্থিতি কেন অনিশ্চিত? যদি ফুটবল সত্যিই মানুষের খেলা হয়, তবে খেলোয়াড়দের কাঁধে রাষ্ট্রীয় সংঘাতের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া কতটা ন্যায়সঙ্গত?

তথ্যসূত্র:
রয়টার্স: ১৬ জুন ২০২৬
দ্য গার্ডিয়ান: ১৬ জুন ২০২


Back to top button
🌐 Read in Your Language