
ইদানীং কমিউনিটির বিভিন্ন ঘরোয়া আড্ডা, চায়ের টেবিল, পারিবারিক বসার আসর এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অলিগলিতে একটি বিষয় বেশ আলোচনায় এসেছে। বিষয়টি শুনতে হালকা, দেখতে হাস্যকর, কিন্তু ভেতরে ভেতরে বেশ বিব্রতকর। কেউ মুখ টিপে হাসছেন, কেউ চোখাচোখি এড়িয়ে যাচ্ছেন, কেউ প্রশ্ন রাখছেন, এ আবার কোন ধরনের সংস্কৃতি?
এই সংস্কৃতির কয়েকটি শাখা-প্রশাখা আছে। এক নম্বরে আছেন আমন্ত্রণ ছাড়া অনুষ্ঠানে হাজির হওয়া অতিথিবৃন্দ। দুই নম্বরে আছেন কৌশলে আমন্ত্রণ আদায়কারী আবেগী মহল। তিন নম্বরে আছেন যে কোনো সংগঠনের গ্রুপ ছবিতে মাথা ঢুকিয়ে দেওয়ার বিশেষজ্ঞরা। চার নম্বরে আছেন যে কোনো অনুষ্ঠানে গিয়ে সামনের সারির রিজার্ভড সিটে বসে পড়া আত্মঘোষিত ভিআইপি ব্যক্তিত্বরা। পাঁচ নম্বরে আছেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যের লেখা নিজের নামে চালিয়ে দেওয়া ডিজিটাল বুদ্ধিজীবীরা।
কমিউনিটির সচেতন মহল এখন ভাবছেন, এই নতুন সামাজিক ব্যাধির প্রতিষেধক কী হতে পারে। কারণ, বিষয়টি শুধু হাসির নয়। এটি সৌজন্যবোধ, সামাজিক শৃঙ্খলা, ব্যক্তিগত মর্যাদা এবং অন্যের পরিশ্রমের প্রতি সম্মানের প্রশ্ন।
প্রথম ঘটনাটি হচ্ছে আমন্ত্রণ ছাড়া কোনো অনুষ্ঠানে ঢুকে পড়া। কমিউনিটির বিভিন্ন আয়োজন, সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা, পারিবারিক অনুষ্ঠান কিংবা সামাজিক মিলনমেলায় এমন ব্যক্তিদের দেখা যায়। কেউ কেউ এমন আত্মবিশ্বাস নিয়ে অনুষ্ঠানে হাজির হন, যেন আয়োজকরা তাঁদের আমন্ত্রণ জানাতে ভুলে গেছেন, আর সেই ভুল সংশোধনের দায়িত্ব নিয়ে তাঁরা নিজেরাই চলে এসেছেন। দরজায় ঢোকেন এমন ভাব নিয়ে, যেন পুরো অনুষ্ঠানটি তাঁদের উপস্থিতির অপেক্ষায় ছিল। তারপর যথারীতি পরিচিত অপরিচিত সবার সঙ্গে হাত মেলানো, দুই চারটি উচ্চস্বরে হাসি, কিছু রাজনৈতিক বিশ্লেষণ, কিছু সাংস্কৃতিক মূল্যায়ন, কিছু সামাজিক পরামর্শ, বক্তব্যের সুযোগ খোঁজা এবং শেষে পরিতৃপ্ত ভুরিভোজন। এরপর ঢেকুর তুলতে তুলতে বাড়ি ফেরা। মুখে ভাব, সমাজসেবার বড় দায়িত্ব পালন করে এলাম।
এই সংস্কৃতি বন্ধ হওয়া দরকার। আমন্ত্রণ একটি সামাজিক ভদ্রতা। কারও অনুষ্ঠানে, কারও ঘরে, কারও ব্যক্তিগত আনন্দে প্রবেশের আগে ন্যূনতম সৌজন্যবোধ থাকা জরুরি। যাঁরা দাওয়াত ছাড়া গিয়ে বসে পড়েন, তাঁদের মনে রাখতে হবে, আত্মবিশ্বাস ভালো জিনিস, কিন্তু আত্মসম্মান তার চেয়েও বড় জিনিস। আয়োজকদেরও উচিত ভদ্রভাবে, কিন্তু দৃঢ়তার সঙ্গে বলা, “দুঃখিত, এটি কেবল আমন্ত্রিত অতিথিদের অনুষ্ঠান।”
দ্বিতীয় ঘটনাটি আরও সূক্ষ্ম। কোথাও জন্মদিন, বিবাহবার্ষিকী, পিকনিক, মিলনমেলা বা পারিবারিক আয়োজনের খবর পেলেই কিছু মানুষ আয়োজককে ফোন করেন। ফোনের ভাষা সাধারণত খুব কোমল। “শুনলাম আপনাদের একটা অনুষ্ঠান আছে।” এরপর আসে সামান্য অভিমান। “আমাদের কথা মনে পড়ল না?” তারপর আবেগের দ্বিতীয় কিস্তি। “আপনার ভাবি খুব যেতে চাচ্ছিলেন।” অর্থাৎ নিমন্ত্রণ না পাওয়ার বিষয়টি এমনভাবে সাজানো হয়, যেন আয়োজক একটি মানবিক অপরাধ করে ফেলেছেন। শেষে আয়োজক বিব্রত হয়ে বলেন, “আচ্ছা, চলে আসুন।” এই একটি বাক্যের অপেক্ষাতেই তো পুরো নাট্যরচনা।
এই কৌশলও বন্ধ হওয়া উচিত। আমন্ত্রণ আদায় করে নিজের জনপ্রিয়তা প্রদর্শনের এই প্রবণতা আসলে সামাজিক চাপ প্রয়োগের এক অভিনব রূপ। কারও ব্যক্তিগত বা পারিবারিক অনুষ্ঠানে কে আসবেন, কে আসবেন না, সেটি আয়োজকের সিদ্ধান্ত। সব সম্পর্কেরই ভদ্র দূরত্ব থাকে। সব পরিচয় দাওয়াতের নিশ্চয়তা নয়। আয়োজকদের উচিত আবেগী চাপের কাছে আত্মসমর্পণ না করা। ভদ্রভাবে বলা যায়, “এবার অনুষ্ঠানটি সীমিত পরিসরে করছি। ভবিষ্যতে নিশ্চয়ই একসঙ্গে বসব।” এতে পৃথিবী ভেঙে পড়বে না, বরং সামাজিক শৃঙ্খলা কিছুটা রক্ষা পাবে।
তৃতীয় ঘটনা হলো গ্রুপ ছবিতে অনধিকার প্রবেশ। যে কোনো সংগঠনের অনুষ্ঠান শেষে একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত আসে। মঞ্চে বা ব্যানারের সামনে সংগঠনের সদস্য, শিল্পী, আয়োজক বা অতিথিরা দাঁড়ান অফিসিয়াল ছবির জন্য। ঠিক সেই মুহূর্তে কিছু মানুষ কোথা থেকে যেন আবির্ভূত হন। কেউ পাশে দাঁড়ান, কেউ কাঁধের ফাঁকে মাথা ঢোকান, কেউ আবার এমনভাবে মাঝখানে এসে বসেন, যেন তিনিই অনুষ্ঠানের প্রধান পৃষ্ঠপোষক, প্রধান অতিথি এবং প্রধান আলোকবর্তিকা। অনেক পারিবারিক অনুষ্ঠানেও পরিবারের সদস্য নন, এমন লোক ভিড়ের মধ্যে বসে পড়ে বিব্রতকর অবস্থার সৃষ্টি করেন।
তবে এ ক্ষেত্রে আয়োজকদের দায়িত্বও কম নয়। কিছু সংগঠন আছে, যাদের লোকবল কম, কিংবা যাদের আহ্বানে প্রত্যাশিত সাড়া মেলে না। তারা অনেক সময় কে এলেন, কে বসলেন, কে ছবিতে থাকলেন, কে থাকলেন না, এসব নিয়ে খুব বেশি বাছবিচার করেন না। তাঁদের প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়, অনুষ্ঠানটি যেন ছবিতে বড় দেখায়, লোকসমাগম যেন চোখে পড়ে। কিন্তু এ ধরনের কৃত্রিম ভিড় সাময়িকভাবে আয়োজনকে বড় দেখালেও দীর্ঘমেয়াদে সংগঠনের মর্যাদা বাড়ায় না। বরং প্রশ্ন ওঠে, সংগঠনের নিজস্ব লোক কোথায়, সদস্যদের সম্পৃক্ততা কোথায়, আয়োজনের স্বচ্ছতা কোথায়। লোক বেশি দেখানোর এই তাড়না অনেক সময় শেষ পর্যন্ত সংগঠনের জন্য ছবির সৌন্দর্যের চেয়ে বিব্রতকর ক্যাপশন হয়ে দাঁড়ায়।
সমস্যা হলো, লোকসমাগম দেখানোর তাড়না থেকে শুরু হোক বা ব্যক্তিগত আত্মপ্রদর্শনের ইচ্ছা থেকে, সব ছবি সবার জন্য নয়। কোনো সংগঠনের অফিসিয়াল ছবি মানে সেই সংগঠনের পরিচয়, শ্রম, ইতিহাস এবং দায়িত্বের প্রতীক। সেখানে অনাহূতভাবে প্রবেশ করা যেমন হাস্যকর, তেমনি বিব্রতকর। বিশেষ করে আঞ্চলিক সংগঠন, পেশাজীবী সংগঠন, আবৃত্তি দল, নাট্যদল বা সাংস্কৃতিক সংগঠনের নিজস্ব ছবি তোলার সময় অনধিকার উপস্থিতি আয়োজকদের অস্বস্তিতে ফেলে। অনেক সময় মুখে কেউ কিছু বলেন না, কিন্তু ভেতরে ভেতরে বিরক্তি জমে। পরে নিজেদের মধ্যেই প্রশ্ন ওঠে, কে ডেকেছিলেন? কে বসতে দিয়েছিলেন? কীভাবে এলেন?
সুতরাং গ্রুপ ছবিরও একটি নীতি থাকা দরকার। ছবি তোলার আগে আয়োজকরা স্পষ্ট করে বলতে পারেন, “আমরা কেবল সংগঠনের সদস্যদের নিয়ে গ্রুপ ছবি তুলতে যাচ্ছি।” এতে কাউকে অপমান করতে হয় না, আবার ছবির মর্যাদাও থাকে। আর যাঁরা সব ছবিতে ঢুকে পড়াকে সামাজিক সাফল্য মনে করেন, তাঁদের জন্য বিনীত পরামর্শ, ক্যামেরা যত বড়ই হোক, আত্মসম্মানের ফ্রেম তার চেয়ে বড়।
চতুর্থ আপত্তি সামনের সারির আসন নিয়ে। যে কোনো অনুষ্ঠানে গেলেই দেখা যায়, কিছু মানুষ সরাসরি সামনে এগিয়ে যান। খালি চেয়ার দেখলেই বসে পড়েন। চেয়ারটি কার জন্য রাখা, সেটি বিশেষ কোনো অতিথির জন্য কিনা, তা দেখার প্রয়োজন মনে করেন না। তাঁদের ধারণা, সামনে বসলে গুরুত্ব বাড়ে। আসলে সব সময় তা হয় না। কখনো কখনো সামনে বসা মানুষটির গুরুত্ব নয়, অস্বস্তিই বেশি চোখে পড়ে।
রিজার্ভড সিট মানে রিজার্ভড সিট। এটি সামাজিক অলংকার নয়, আয়োজনের অংশ। কোনো বয়োজ্যেষ্ঠ অতিথি, শিল্পী, বক্তা, বিশেষ আমন্ত্রিত ব্যক্তি বা পরিবারের সদস্যদের জন্য আসন রাখা থাকতেই পারে। সেখানে গিয়ে বসে পড়া ভদ্রতার পরিচয় নয়। আবার আয়োজকরাও অনেক সময় সংকোচে কাউকে উঠতে বলতে পারেন না। ফলে যাঁর বসার কথা, তিনি দাঁড়িয়ে থাকেন, আর যাঁর দাঁড়ানোর কথা ছিল, তিনি রাজকীয় ভঙ্গিতে বসে থাকেন।
এই অভ্যাস বন্ধ করতে হলে আয়োজকদের সচেতন ও আরও সংগঠিত হতে হবে। এ কাজে স্বেচ্ছাসেবকদের দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে। কেউ ভুল করে বসলে ভদ্রভাবে বলা যেতে পারে, “এই আসনটি নির্দিষ্ট অতিথির জন্য রাখা হয়েছে। আপনাকে অন্য আসনে বসতে অনুরোধ করছি।” সমাজে ভদ্রতা যেমন দরকার, তেমনি ভদ্রতার নামে সব অসৌজন্য মেনে নেওয়াও ঠিক নয়। আপনি সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ কেউ হয়ে থাকলে পেছনের সারিতে বসলেও আয়োজকরাই আপনাকে সম্মানের সঙ্গে সামনে নিয়ে আসবেন।
পঞ্চম আপত্তিটি লেখক সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখন আরেক ধরনের বুদ্ধিজীবী জন্ম নিয়েছেন। তাঁরা লেখেন না, কিন্তু পোস্ট দেন। ভাবেন না, কিন্তু ভাবুকের ভঙ্গি ধরেন। কষ্ট করেন না, কিন্তু অন্যের কষ্টের ফসল নিজের নামে তুলে ধরেন। কোথাও কোনো সুন্দর লেখা, বিশ্লেষণ, স্মৃতিচারণ, কৌতুক, তথ্যভিত্তিক পোস্ট বা সংবাদ দেখলেই কপি পেস্ট করে নিজের ওয়ালে বসিয়ে দেন। কেউ কেউ সেই লেখা বিভিন্ন অনলাইন পত্রিকায়ও নিজের নামে প্রকাশের চেষ্টা করেন। কেউ কেউ আবার অন্যের লেখা চুরি করে, নিজের নাম বসিয়ে, সুন্দর মলাটে বই বের করার ঘটনাও ঘটান। অনেকে অন্যের তৈরি পোস্টারও কপি করে নিজের ওয়ালে লাগিয়ে দেন। মূল লেখকের নাম নেই, ডিজাইনারের প্রতি কৃতজ্ঞতা নেই, উৎসের উল্লেখ নেই।
এটি শুধু অসৌজন্য নয়, এটি চৌর্যবৃত্তি। অন্যের লেখা নিজের নামে চালিয়ে দেওয়া কিংবা অন্যের তৈরি পোস্টারের জলছাপ মুছে সেটিকে নিজের বলে প্রচার করা মানে অন্যের মেধা, সময়, চিন্তা ও পরিশ্রমকে অবজ্ঞা করা। যে মানুষ একটি লেখা লিখতে সময় দিয়েছেন, তথ্য সংগ্রহ করেছেন, ভাষা গড়েছেন, বাক্য সাজিয়েছেন, তাঁর নাম মুছে দিয়ে নিজের ভাবমূর্তি নির্মাণ করা কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক কাজ নয়। এটি ডিজিটাল যুগের পকেটমারি। শুধু পার্থক্য হলো, এখানে পকেট থেকে টাকা নয়, মানুষের মেধা চুরি হয়।
যাঁরা সত্যিই কোনো লেখা পছন্দ করেন, তাঁরা শেয়ার করুন। লেখকের নাম দিন। উৎস উল্লেখ করুন। নিজের মতামত লিখে তার সঙ্গে মূল লেখার লিংক যোগ করুন। এতে আপনার মর্যাদা কমবে না, বরং বাড়বে। কারণ, অন্যের প্রাপ্য সম্মান দিতে জানাও এক ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক সততা।
এসব ঘটনার বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি করা জরুরি। তবে কাউকে হেয় করা নয়, আচরণ সংশোধনই লক্ষ্য হওয়া উচিত। কমিউনিটি মানে শুধু অনুষ্ঠান, ছবি, মঞ্চ, মাইক এবং খাবারের টেবিল নয়। এর আসল ভিত্তি হলো পরস্পরের প্রতি সম্মান। কারও ব্যক্তিগত পরিসরকে সম্মান করা, সংগঠনের পরিশ্রমকে সম্মান করা, আয়োজকের সীমাবদ্ধতাকে সম্মান করা, আসনের নিয়মকে সম্মান করা এবং লেখক ও ডিজাইনারের মেধাকে সম্মান করা।
কমিউনিটিতে সবার জায়গা আছে, কিন্তু সব জায়গা সবার জন্য নয়। সব অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকা সামাজিক মর্যাদার প্রমাণ নয়। সব ছবিতে মুখ দেখানো জনপ্রিয়তার মাপকাঠি নয়। সব সামনের চেয়ার নেতৃত্বের প্রতীক নয়। আর অন্যের লেখা নিজের নামে চালিয়ে দেওয়া জ্ঞানচর্চা নয়।
আমন্ত্রণ ছাড়া অনুষ্ঠান বা পারিবারিক আয়োজনে যাওয়া বন্ধ হোক। কৌশলে নিমন্ত্রণ আদায়ের নাটক বন্ধ হোক। অনধিকার ফটোশুট বন্ধ হোক। রিজার্ভড সিট দখলের অভ্যাস দূর হোক। অন্যের লেখা নিজের নামে চালানোর চর্চা বন্ধ হোক।
শেষ কথা খুব সহজ। সামাজিক মর্যাদা চেহারায় নয়, আচরণে প্রকাশ পায়। ছবি, চেয়ার, মঞ্চ, পোস্ট ও পরিচিতির চেয়ে বড় হলো ভদ্রতা। সীমা না জানা মানুষ যতই সামনে বসুক, যতই ছবির মাঝখানে দাঁড়াক, সম্মানের জায়গা কখনো জোর করে দখল করা যায় না।









