
বাংলাদেশের আর্থিক খাতকে তছনছ করে লুট করা অর্থ যখন কানাডার অভিজাত পাড়ায় বিলাসবহুল বাড়ি, বহুতল অ্যাপার্টমেন্ট এবং বিস্তীর্ণ রিয়েল এস্টেট সাম্রাজ্যে রূপ নেয়, তখন তা আর শুধু সম্পদের গল্প থাকে না। তার ভেতরে জড়িয়ে থাকে নিয়ন্ত্রক সংস্থার ব্যর্থতা, আন্তর্জাতিক অর্থপাচার ব্যবস্থার ফাঁকফোকর এবং অস্বচ্ছ অর্থপ্রবাহের দীর্ঘ ছায়া। আর এমন অর্থের স্রোত একসময় অপরাধজগতের নজরও কাড়ে। সেই প্রেক্ষাপটেই এবার সামনে এসেছে বহুল আলোচিত এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল আলমের ভাই, মন্ট্রিয়লপ্রবাসী আব্দুস সামাদ লাবুর নাম। অভিযোগ উঠেছে, ‘চাঁদার’ দাবিতে তার পিছু নিয়েছে কানাডার কুখ্যাত মাফিয়া চক্রের সদস্যরা।

২০২৫ সালের ২৬ মে আব্দুস সামাদ লাবুর বাসায় হানা দেয় মাফিয়া চক্রের সদস্যরা। অপরাধবিশ্বে এ ধরনের মাফিয়া চক্র সাধারণত কোনো লক্ষ্য, চুক্তি বা চাপ সৃষ্টির উদ্দেশ্য ছাড়া সরাসরি কারও বাড়িতে যায় না। তাই ধারণা করা হচ্ছে, তারা হয়তো অন্য কোনো পক্ষের হয়ে ‘collection agent’ হিসেবে কাজ করছিল। একপর্যায়ে তারা লাবুর বাসার সামনে পার্ক করা একটি Jeep Grand Cherokee-তে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং বাড়িটি লক্ষ্য করে গুলিও ছোড়ে। এর পর থেকেই অর্থ পরিশোধের জন্য হুমকি, ভয়ভীতি ও নানা ধরনের হয়রানি শুরু হয়। ঘটনাস্থল মন্ট্রিয়লের অভিজাত এলাকা বিকনসফিল্ডের 8 Avenue Carrières-এর একটি বিলাসবহুল বাড়ি। ছয় বেডরুম ও তিন গ্যারেজসমৃদ্ধ এই বাড়িটির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৩ মিলিয়ন কানাডীয় ডলার। হামলার পর থেকে লাবু পরিবার আর সেই বাড়িতে বসবাস করছে না।

এ ঘটনার পর আব্দুস সামাদ লাবু মন্ট্রিয়ল পুলিশের কাছে অভিযোগ করেন এবং নিজের জীবনশঙ্কার কথাও জানান। অভিযোগ পাওয়ার পর তদন্তে নামে মন্ট্রিয়ল পুলিশ। ঘটনার প্রায় এক বছর পর এ মামলায় কয়েকজন সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করা হলে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। তখনই বোঝা যেতে থাকে, অভিযুক্তরা কোনো সাধারণ চাঁদাবাজ নয়, আর ভুক্তভোগী আব্দুস সামাদ লাবুও কেবল একজন সাধারণ ব্যবসায়ী নন।

বিষয়টি এতদিন আড়ালেই ছিল। গত ৩০ মার্চ ২০২৬ অভিযুক্ত দুজনকে গ্রেপ্তার করে মন্ট্রিয়ল পুলিশ। পরে মন্ট্রিয়লের ফরাসি ভাষার গণমাধ্যমে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে ঘটনাটি আবার সামনে আসে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, Moreno Gallo Jr. এবং Vladimir Laguerre-কে গ্রেপ্তার করে মন্ট্রিয়ল পুলিশ। গ্রেপ্তারের পর তাদের Palais de justice de Montréal-এ তোলা হয়। মামলার পরবর্তী শুনানির তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে ১৮ মে ২০২৬।

বাংলাদেশের ব্যবসায়ী মহলে আব্দুস সামাদ লাবু পরিচিত নাম। তিনি এস আলম গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান। তার বড় ভাই সাইফুল আলম এস আলম গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান। লাবুর বিরুদ্ধেও ব্যাংক ঋণ জালিয়াতি, ভুয়া প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অর্থ উত্তোলন এবং সেই অর্থ বিদেশে স্থানান্তরের অভিযোগ রয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের নথিতেও তার নাম এসেছে।

কানাডার কোম্পানি রেজিস্ট্রি ও রিয়েল এস্টেট সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, ২০১৪ সালের পর থেকে আব্দুস সামাদ লাবু দেশটির আবাসন খাতে সক্রিয়ভাবে বিনিয়োগ শুরু করেন। কানাডায় তিনি ‘রুনা করপোরেশন’ নামে একটি আবাসন ব্যবসা গড়ে তোলেন। ২০১৪ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত এ প্রতিষ্ঠানের ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন বাংলাদেশের আর্থিক খাতের বিতর্কিত নাম প্রশান্ত কুমার হালদার, যিনি পি কে হালদার নামে বেশি পরিচিত।
দুদকের তথ্য অনুযায়ী, পি কে হালদার এস আলমের অর্থপাচার প্রক্রিয়ার অন্যতম সহযোগী হিসেবে চিহ্নিত। তার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত থেকে ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, সেই অর্থের একটি অংশ কানাডায় পাচার হয়েছে। সেখানে তার ভাই প্রীতীশ কুমার হালদারের নামে ব্যবসায়িক কার্যক্রমও চলমান রয়েছে। পি কে হালদার বর্তমানে ভারতে কারাগারে আছেন এবং বাংলাদেশে তার বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের একাধিক মামলা বিচারাধীন।
লাবুর দুই ছেলে আতিকুল আলম চৌধুরী ও তৌফিকুল আলম চৌধুরী বর্তমানে এই আবাসন ব্যবসার মূল চালিকাশক্তি। কানাডার business registry অনুযায়ী, মন্ট্রিয়লের বিভিন্ন এলাকায়, যেমন Longueuil ও Montreal North, তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে শত শত অ্যাপার্টমেন্ট। বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংকসহ একাধিক ব্যাংক থেকে এস আলম গ্রুপ যে বিপুল অর্থ সরিয়ে নিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে, তার একটি বড় অংশ কানাডায় লাবু পরিবারের এই আবাসন ব্যবসায় বিনিয়োগ করা হয়েছে বলে দুদক ও BFIU সূত্রে জানা গেছে।
কানাডা দীর্ঘদিন ধরেই বিদেশি অবৈধ অর্থের গন্তব্য হিসেবে সমালোচিত। বিশেষ করে রিয়েল এস্টেট খাতে নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতা, শিথিল করব্যবস্থা এবং অর্থপাচার প্রতিরোধে ঘাটতির কারণে দেশটি অনেকের কাছে ‘স্নো-ওয়াশিং সেন্টার’ হিসেবেও পরিচিতি পেয়েছে। সমালোচকদের মতে, এই কাঠামোগত দুর্বলতার সুযোগ নিয়েই এস আলম পরিবার পাচার করা অর্থে সম্পদের পাহাড় গড়েছে কানাডায়।
লাবু কীভাবে মাফিয়াদের টার্গেটে পরিণত হলেন, তা নিয়ে মন্ট্রিয়ল থেকে প্রকাশিত সংবাদপত্র ‘লা প্রেস’-এর অনুসন্ধানী সাংবাদিক ভিনসেন্ট লারুশ ও ড্যানিয়েল রেনো দীর্ঘ অনুসন্ধান চালিয়েছেন। লাবুর বাড়িতে হামলার ঘটনাটি নিয়ে তারা প্রায় এক বছর ধরে তথ্য সংগ্রহ ও অনুসন্ধান করেছেন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, আব্দুস সামাদ লাবু কোনো এলোমেলো টার্গেট ছিলেন না। বরং তার আর্থিক অবস্থান, বিনিয়োগের পরিমাণ এবং রাজনৈতিক যোগাযোগ সম্পর্কে অপরাধচক্রের আগ্রহ আগেই তৈরি হয়ে থাকতে পারে। সংগঠিত অপরাধজগতের পরিচিত ব্যক্তিরা যেভাবে সরাসরি তার বাড়িতে গিয়ে অর্থ দাবি করেছে এবং কয়েক সপ্তাহ ধরে চাপ সৃষ্টি করেছে, তাতে স্পষ্ট হয়, এটি কোনো সাধারণ চাঁদাবাজির ঘটনা ছিল না। অপরাধচক্রটি ধরে নিয়েছিল, লাবুর বিপুল সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন থাকায় তিনি সহজে পুলিশের কাছে যাবেন না। সেই ধারণা থেকেই তারা তার ওপর চড়াও হয়েছিল বলে মনে করা হচ্ছে।
কানাডার স্থানীয় সূত্রগুলোর মতে, গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও আমলাদের কানাডায় বিলাসবহুল সম্পদ অর্জনের খবর আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় গণমাধ্যমে বিভিন্ন সময় প্রকাশিত হয়েছে। তবে তাঁদের কারও ক্ষেত্রে আব্দুস সামাদ লাবুর মতো সংগঠিত অপরাধচক্র বা মাফিয়াদের সরাসরি চাপের মুখে পড়ার খবর এখন পর্যন্ত জানা যায়নি।

এদিকে ‘রুনা করপোরেশন’ প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যে নামটি বিশেষভাবে জড়িয়ে আছে, তিনি মোস্তাক এ সরকার। মন্ট্রিয়লে এস আলম পরিবার এবং পি কে হালদারের ব্যবসায়িক অংশীদার হিসেবেও তার নাম উঠে এসেছে। পেশায় অ্যাকাউন্টেন্ট মোস্তাকের গ্রামের বাড়ি কুমিল্লায়। কানাডার Conservative Party-এর মনোনয়নে তিনি একাধিকবার মন্ট্রিয়ল থেকে পার্লামেন্ট নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। বিতর্কিত ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং রাজনৈতিক অনুদান গ্রহণের অভিযোগে অতীতেও তিনি কানাডার গণমাধ্যমে আলোচনায় এসেছিলেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের Financial Intelligence Unit-এর একটি সূত্র জানিয়েছে, এস আলম পরিবার সম্পর্কে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তথ্য চেয়ে যে অনুরোধ পাঠানো হয়েছিল, তার অধিকাংশেরই উত্তর ইতোমধ্যে পাওয়া গেছে। কানাডার FINTRAC-ও তাদের সম্পদের বিষয়ে গোয়েন্দা তথ্য পাঠিয়েছে। কিন্তু এতসব তথ্য আদানপ্রদানের পরও তদন্ত বা আইনি অগ্রগতিতে দৃশ্যমান কোনো গতি দেখা যাচ্ছে না।
এ বিষয়ে কানাডার আর্থিক খাত পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা FINTRAC-এর মুখপাত্র এরিকা কনস্ট্যান্ট জানান, FINTRAC মূলত ব্যাংক ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সন্দেহজনক লেনদেন বিশ্লেষণ করে সেই তথ্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে পাঠায়। তবে সংস্থাটি নিজে কোনো তদন্ত পরিচালনা করে না।
বাংলাদেশ ও কানাডার মধ্যে সরাসরি দ্বিপাক্ষিক Mutual Legal Assistance Treaty (MLAT) চুক্তি নেই। ফলে এস আলম, আব্দুস সামাদ লাবু বা পি কে হালদারের মতো ব্যক্তিদের বিদেশে পাচার করা অর্থ-সম্পদ শনাক্ত করা, তা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জটিল হয়ে পড়েছে। তাদের বিরুদ্ধে কানাডীয় আদালতে শক্ত অবস্থান নেওয়া বর্তমানে একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
তথ্যসূত্র:
La Presse (৩১ মার্চ ২০২৬)
Montreal Police Press Release (৩০ মার্চ ২০২৬)
Journal de Montréal (২৫ মার্চ ২০২৬)
এশিয়া পোস্ট (১৩ এপ্রিল ২০২৬)
কৃতজ্ঞতা: আবদুল্লাহ আল ইমরান









