
প্রচলিত একটি প্রবাদ আছে, যেখানে তিনজন বাঙালি, সেখানে কমিটি হবে দুইটা। কথাটি নিছক রসিকতা হিসেবে বলা হলেও উত্তর আমেরিকার বড় বড় নগরীতে বাংলাদেশ কমিউনিটির বাস্তবতা অনেক সময় সেই রসিকতাকেও হার মানায়। বিশেষ করে টরন্টো ও নিউইয়র্কের মতো শহরে, যেখানে হাজার হাজার বাংলাদেশির বসবাস, সেখানে সংগঠন, পাল্টা সংগঠন, ব্যক্তিকেন্দ্রিক বলয় এমনভাবে ছড়িয়ে পড়েছে যে কখনও কখনও মনে হয় মানুষ যত না মিলনের জন্য একত্র হয়, তার চেয়ে বেশি হয় আলাদা হওয়ার জন্য।
এই বাস্তবতা একদিনে তৈরি হয়নি। এর পেছনে আছে দীর্ঘ সামাজিক বিবর্তন, অভিবাসী জীবনের চাপ, পরিচয়ের টানাপোড়েন, নেতৃত্বের আকাঙ্ক্ষা, রাজনৈতিক প্রভাব, আঞ্চলিক মানসিকতা এবং সাম্প্রদায়িক বিভাজনের ধীরে ধীরে জমে ওঠা স্তর। আজকের এই খণ্ডিত কমিউনিটিকে বুঝতে হলে আমাদের একটু পেছনে ফিরতে হয়।
আশির দশকে উত্তর আমেরিকার বাঙালি সমাজের চেহারা ছিল অনেকটাই ভিন্ন। তখনও বিভাজন ছিল, মতভেদও ছিল, কিন্তু সেগুলোর প্রকৃতি আজকের মতো এত তীব্র, এত বিষাক্ত, এত বহুস্তরীয় ছিল না। সে সময় উত্তর আমেরিকায় বাংলাদেশি অভিবাসীর সংখ্যাও আজকের তুলনায় অনেক কম ছিল, ফলে প্রবাসী বাঙালিদের পরিসর ছিল তুলনামূলকভাবে ছোট এবং পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগও ছিল অনেক বেশি ঘনিষ্ঠ। রাজনৈতিক বিভাজন তেমন দৃশ্যমান ছিল না, আঞ্চলিকতাও শক্ত ভিত গেড়ে বসেনি, সাম্প্রদায়িকতার কুয়াশাও তেমন নেমে আসেনি প্রবাসী সমাজে। বরং তখন একটি বড় পরিচয়ই ছিল মুখ্য, আমরা বাঙালি। এই পরিচয়ের ভেতরে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি, বাংলাদেশের বাঙালি, হিন্দু, মুসলমান, শহুরে, মফস্বলী, পুরোনো প্রবাসী কিংবা নতুন অভিবাসী, সবাই এক ধরনের সাংস্কৃতিক আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ বোধ করতেন।
১৯৮১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে কালচারাল অ্যাসোসিয়েশন অব বেঙ্গল (সিএবি)-এর উদ্যোগে উত্তর আমেরিকার বাঙালিদের জন্য বঙ্গ সম্মেলন নামে এক বড় সাংস্কৃতিক উৎসবের সূচনা হয়। অল্প সময়ের মধ্যেই এটি নর্থ আমেরিকান বেঙ্গলি কনফারেন্স, সংক্ষেপে এনএবিসি নামে পরিচিতি পায় এবং দুই বাংলার এক প্রাণবন্ত মিলনমেলায় পরিণত হয়। বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ থেকে শিল্পী, কবি ও সাহিত্যিকরা এসেছেন, প্রবাসী বাঙালিরাও অংশ নিয়েছেন সমান উৎসাহে। সেই সময়ের সৌন্দর্য ছিল এই যে, বিভক্ত ভূগোলকে কেউ সাংস্কৃতিক বিভাজন হিসেবে দেখতেন না। কাঁটাতারের বেড়া দিয়েও বাংলা ভাষা, বাংলা গান, বাংলা সাহিত্য ও বাঙালির আবেগকে আলাদা করা যায়নি। “বাঙালি” পরিচয়ের ভেতরে তখন একধরনের স্বতঃস্ফূর্ত সহাবস্থান গড়ে উঠেছিল।
কিন্তু উত্তর আমেরিকায় বাংলাদেশি অভিবাসীদের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশি পরিচয়ভিত্তিক সংগঠনের প্রয়োজনও সামনে আসে। ১৯৮৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে প্রতিষ্ঠিত হয় ফেডারেশন অব বাংলাদেশি অ্যাসোসিয়েশনস ইন নর্থ আমেরিকা, সংক্ষেপে ফোবানা। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডাজুড়ে ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশি সংগঠনগুলোকে একটি ছাতার নিচে আনা এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য একটি কেন্দ্রীয় প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলাই ছিল এর মূল লক্ষ্য।
ফোবানার জন্মের ভেতরে একটি মহৎ স্বপ্ন ছিল। প্রবাসে জন্ম নেওয়া বা বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলাদেশের ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ, ঐতিহ্য এবং আত্মপরিচয় পৌঁছে দেওয়া ছিল এই উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য। পাশাপাশি আমেরিকা ও কানাডার মূলধারার সমাজের সঙ্গে বাংলাদেশিদের একটি সুসংগঠিত সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও এটি একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম হওয়ার কথা ছিল।
প্রতিষ্ঠার প্রথম এক দশক পর্যন্ত ফোবানা সত্যিই ছিল প্রবাসী বাংলাদেশিদের এক প্রাণের উৎসব। সারা বছর মানুষ অপেক্ষা করতেন সেই মিলনমেলার জন্য। এক শহর থেকে আরেক শহরে মানুষ ছুটে যেতেন। মঞ্চে থাকত গান, নৃত্য, নাটক, আলোচনা, তরুণদের অংশগ্রহণ, শিশুদের পরিবেশনা, কমিউনিটি সম্মাননা, প্রবাসজীবনের গল্প, শেকড়ের স্মরণ। কিন্তু যেসব সংগঠন স্বপ্ন দিয়ে শুরু হয়, সেগুলো অনেক সময় মানুষের দুর্বলতার কাছেই পরাজিত হয়। ফোবানার ক্ষেত্রেও সেটিই ঘটেছে।
ধীরে ধীরে নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব সামনে আসে। পদবির লড়াই, কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন, আর্থিক ব্যবস্থাপনায় অস্বচ্ছতা, ব্যক্তিগত অহম, পুরনো জোট ও নতুন গোষ্ঠীর সংঘাত, সবকিছু মিলে ফাটল বাড়তে থাকে। মতভেদ স্বাভাবিক, কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন মতভেদকে সংগঠনিক পরিপক্বতার ভেতর সামাল না দিয়ে তা ব্যক্তিগত প্রতিহিংসায় পরিণত করা হয়। ফোবানার ক্ষেত্রেও বহুবার সেটিই হয়েছে। ফলাফল, বিভক্তি।
আজ বাস্তবতা হলো, ফোবানা নামটি যেমন আছে, তার ঐক্যবদ্ধ আত্মাটি আর নেই বললেই চলে। প্রতি বছর লেবার ডে উইকেন্ড ঘিরে ৫ থেকে ৬টি গ্রুপ নিজেদের “আসল ফোবানা” দাবি করে আলাদা আলাদা সম্মেলনের আয়োজন করে। কখনও একই শহরে, কখনও একই সময়ের কাছাকাছি, কখনও প্রায় পাশাপাশি ভেন্যুতেও একাধিক ফোবানা অনুষ্ঠিত হতে দেখা যায়। বর্তমানে ফোবানা নামটিই কেবল রয়ে গেছে। পোস্টার, ব্যানার ও বিজ্ঞাপনে একে সম্মেলন বলা হলেও বাস্তবে তা একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানমাত্র। দর্শক বিভক্ত, আয়োজক বিভক্ত, অতিথি বিভক্ত, পৃষ্ঠপোষক বিভক্ত, এমনকি স্মৃতিও বিভক্ত। ফলে যে সংগঠনটি উত্তর আমেরিকার বাংলাদেশিদের সবচেয়ে বড় মিলনমেলা হওয়ার কথা ছিল, সেটিই আজ বিভাজনের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই ভাঙনের শিকড় শুধু ফোবানার ভেতর সীমাবদ্ধ নয়। নব্বই দশকে বাংলাদেশের যে বস্তাপচা রাজনৈতিক সংস্কৃতি ক্রমে সমাজের নানা স্তরে ছড়িয়ে পড়ে, তার ঢেউ এসে লাগে আটলান্টিকের এপারেও। অভিবাসীদের অনেকেই নিজের সঙ্গে নিয়ে আসেন নিজেদের রাজনৈতিক আনুগত্য, দলীয় অভ্যাস, পক্ষপাত এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতা। ফলে উত্তর আমেরিকার বাংলাদেশ কমিউনিটিতেও একে একে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শাখা, উপশাখা, অঙ্গসংগঠন ও সমর্থকগোষ্ঠী গড়ে উঠতে থাকে। একটি গণতান্ত্রিক সমাজে রাজনৈতিক মত থাকা দোষের নয়। বরং সেটি নাগরিক সচেতনতার লক্ষণ হতে পারে। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন রাজনৈতিক পরিচয় সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পেশাভিত্তিক সংগঠনগুলোকেও গ্রাস করে ফেলে।
সামাজিক সংগঠন তখন আর নিছক সামাজিক থাকে না। সাংস্কৃতিক মঞ্চ তখন আর সংস্কৃতির মঞ্চ থাকে না। আঞ্চলিক সংগঠন হয়ে ওঠে রাজনৈতিক বলয়ের সম্প্রসারণ। কে সভাপতি হবে, কে প্রধান অতিথি হবে, কার ছবি ব্যানারে বড় হবে, কে বক্তৃতা দেবে, কার বক্তব্য বাদ পড়বে, কে কোন দলের লোক, কে কার ঘনিষ্ঠ, এসব প্রশ্নই হয়ে ওঠে মুখ্য। ফলে মানুষের কাজ, যোগ্যতা, কমিউনিটির জন্য অবদান এবং সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি অনেক সময় গৌণ হয়ে পড়ে।
একই সময়ে আঞ্চলিকতাও শক্ত হয়ে বসে। জেলা, বিভাগ, উপজেলা, ইউনিয়নভিত্তিক সংগঠনের বিস্তার একদিক থেকে প্রবাসীদের শেকড়ধর্মী আবেগের প্রকাশ হতে পারত। কেউ নিজের এলাকার মানুষদের পাশে দাঁড়াবে, নতুনদের সাহায্য করবে, সাংস্কৃতিক স্মৃতি ধরে রাখবে, এতে আপত্তির কিছু নেই। কিন্তু যখন আঞ্চলিকতা সহযোগিতার জায়গা ছেড়ে প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়, তখন তা বিভাজনকে আরও ঘনীভূত করে। “আমাদের লোক” এবং “ওদের লোক” এই মানসিকতা কমিউনিটির বিস্তৃত স্বার্থকে আঘাত করে। একসময় বাংলাদেশিরা রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত হয়েছে, পরে আঞ্চলিক পরিচয়ে বিভক্ত হয়েছে, আর শেষ পর্যন্ত কখনও কখনও ধর্মীয় পরিচয়ও ঢুকে পড়েছে কমিউনিটির ভেতরে। মুসলমান বাঙালি, হিন্দু বাঙালি, সিলেটি, নোয়াখালি, ঢাকাইয়া, চাটগাঁইয়া, এমন অসংখ্য পরিচয় বড় পরিচয়টিকে বারবার ক্ষতবিক্ষত করেছে। অথচ বহুজাতিক সমাজে মর্যাদার সঙ্গে টিকে থাকতে হলে সবার আগে দরকার একটি বৃহত্তর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক কমিউনিটি পরিচয়।
আজ টরন্টো, নিউইয়র্কসহ উত্তর আমেরিকার বড় বড় নগরীতে শত শত সংগঠন রয়েছে। সংখ্যার বিচারে এটি এক অর্থে প্রবাসী উদ্যমের পরিচায়ক হতে পারত। কিন্তু বাস্তবে এই বিপুল সংখ্যক সংগঠনের একটি বড় অংশের উদ্দেশ্য নিয়েই প্রশ্ন আছে। বছরে একটি পিকনিক আয়োজন করেই অনেকে নিজেকে কমিউনিটির নেতা হিসেবে দাপটের সঙ্গে পরিচয় দেন। ছবি তোলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশংসা বিনিময় করেন, তারপর সারা বছর নিষ্ক্রিয় থাকেন। অথচ এর পরও দলাদলি, পদ-পদবির টানাটানি এবং প্রভাব বিস্তারের লড়াই থামে না।
এই বিভাজনের বিষ এত দূর ছড়িয়ে পড়েছে যে মসজিদে, মন্দিরে পর্যন্ত দলাদলি ঢুকে গেছে। পরিচালনা কমিটিতে প্রভাব বিস্তার নিয়ে চলে মামলা-মোকদ্দমা। যে জায়গাগুলো মানুষের আত্মিক আশ্রয় হওয়ার কথা, সেখানেও গোষ্ঠীস্বার্থের লড়াই জায়গা করে নিয়েছে।
দেখা যায়, যখনই একেকটি নতুন সংগঠনের জন্ম হয়, তখন তার উদ্যোক্তারা প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি ছড়াতে শুরু করেন। প্রায়ই শোনা যায়, আমাদের একটি কমিউনিটি সেন্টার লাগবে, আমরা সেটি করেই ছাড়ব। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নয় মন ঘি-ও জোটে না, কমিউনিটি সেন্টারও আর হয় না। ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, পরপর কয়েকবার দায়িত্ব নিয়ে একই রেকর্ড বাজাতে বাজাতে নিজের পরিচয়টা ফলাও করে জানান দেওয়া ছাড়া দৃশ্যমান কোনো অর্জন তাদের নেই।
সময় সময় তথাকথিত অনেক নেতাই দাবি করেন, তারা নতুন আগত বাংলাদেশিদের নানান সেবা দেবেন। কেউ বিনামূল্যে দোভাষীর ব্যবস্থা করার কথা বলেন, কেউ আইনি সহায়তার আশ্বাস দেন, কেউ আবার রিজ্যুমি লিখে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, কারও কারও নিজের অবস্থাই ছিল এতটাই নড়বড়ে যে অন্যকে সহায়তা দেওয়ার আগেই তারা নিজেরাই নানা প্রতারণা, অনিয়ম কিংবা আইনি জটিলতায় জড়িয়ে পড়েছেন। এমনও অভিযোগ আছে, কেউ কেউ নিজেদের এসব কুকীর্তি আড়াল করতেই সংগঠনের সঙ্গে জড়িত হন এবং কোনো একটি পদবি বাগিয়ে নিতে মরিয়া হয়ে ওঠেন।
গত কয়েক বছর ধরে কমিউনিটিতে নতুন আরেকটি উপসর্গ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সেটি হলো বড় বড় অনুষ্ঠান ঘিরে চেয়ারম্যান, কনভেনর কিংবা আহ্বায়কের পদ নিয়ে অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা। অভিযোগ আছে, অবৈধ উপায়ে অর্থ উপার্জনকারী কিছু ব্যক্তি এবং পর্দার আড়ালে বাংলাদেশের লুটেরা স্বার্থগোষ্ঠীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মহল এসব অনুষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষকতায় যুক্ত হচ্ছে। কমিউনিটিতে তাদের দৃশ্যমান অবদান না থাকলেও, অর্থের জোরে তারা নিজেদের প্রভাবশালী ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা চালাচ্ছে। সামাজিক মর্যাদা কিনে নেওয়ার এক সংস্কৃতি এভাবেই ধীরে ধীরে জায়গা করে নিচ্ছে। এর ফলে প্রকৃত যোগ্য, পরীক্ষিত ও নিবেদিত মানুষদের আমরা যথাযথ মূল্যায়ন করছি না। বরং অনেক সময় অযোগ্য ব্যক্তিদের সম্মানিত করে শেষ পর্যন্ত নিজেরাই নিজেদের মর্যাদাকে খাটো করছি।
এত সব সংকটের ভেতর আরেকটি নতুন মাত্রা দেখা দেয় ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানকে ঘিরে। দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা, মতাদর্শগত মেরুকরণ, অনলাইন প্রচারযুদ্ধ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আগ্রাসী সংস্কৃতি প্রবাসী কমিউনিটিকেও নাড়িয়ে দেয়। কে পক্ষে, কে বিপক্ষে, কে নীরব, কে সুবিধাবাদী, কে বিশ্বাসঘাতক, এসব ভাষা ব্যবহার করে মানুষ একে অন্যকে আক্রমণ করতে শুরু করে। লালবদর, কালাবদর, দালাল, ফ্যাসিস্ট, মৌলবাদী, দেশদ্রোহী, এমনসব তকমা ছুড়ে দেওয়া হয় অবলীলায়। ব্যক্তিগত আক্রমণ, মানহানি, কুৎসা, অপমান, পারিবারিক বিষয়ে কটূক্তি, অশোভন ভাষা, এমনকি প্রকাশ্য বিদ্বেষও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিন্নমতকে প্রতিপক্ষ নয়, শত্রু হিসেবে দেখার যে প্রবণতা বাংলাদেশে ভয়ংকর রূপ নিয়েছে, তারই প্রতিধ্বনি উত্তর আমেরিকার বাংলাদেশ কমিউনিটিতেও শোনা গেছে প্রবলভাবে। সেই ভাঙনের রেশ আজও কাটেনি।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় আঘাত লেগেছে কমিউনিটির ভবিষ্যতের ওপর। নতুন প্রজন্ম বিভ্রান্ত হচ্ছে। তারা দেখছে, বড়রা মঞ্চে ঐক্যের কথা বলেন, কিন্তু বাস্তবে একে অন্যকে সহ্য করতে পারেন না। তরুণরা কমিউনিটির নেতৃত্বে আসতে চায়, কিন্তু দেখে সেখানে মেধার চেয়ে গোষ্ঠী আনুগত্য বেশি মূল্য পায়। ফলে অনেক যোগ্য, শিক্ষিত, পেশাদার তরুণ কমিউনিটি সংগঠন থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। এটি একটি ভয়ংকর ক্ষতি, কারণ প্রবাসী সমাজে প্রজন্মগত নেতৃত্বের সেতু ছিঁড়ে গেলে কমিউনিটি ধীরে ধীরে খোলসে পরিণত হয়।
আরেকটি বড় ক্ষতি হচ্ছে মূলধারার সমাজে বাংলাদেশের ভাবমূর্তির ওপর। বহুজাতিক সমাজে একটি কমিউনিটির শক্তি নির্ভর করে তার ঐক্য, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, নাগরিক অংশগ্রহণ, দৃষ্টিভঙ্গির পরিপক্বতা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার ওপর। উত্তর আমেরিকায় ভারতীয়, পাকিস্তানি, শ্রীলঙ্কান, চাইনিজ, ফিলিপিনো, কোরিয়ান, আরব, আফ্রিকান বহু কমিউনিটি নিজ নিজ অভ্যন্তরীণ মতভেদ সত্ত্বেও বৃহত্তর স্বার্থে সমন্বিত লবিং, সাংস্কৃতিক উপস্থাপনা, অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক এবং রাজনৈতিক উপস্থিতি গড়ে তুলেছে। বাংলাদেশিরাও তা পারত, এখনও পারে। কিন্তু অভ্যন্তরীণ বিভাজন আমাদের শক্তিকে ভেতর থেকেই ক্ষয় করছে। ফলে সম্মিলিত অর্জনের সম্ভাবনা বারবার দুর্বল হয়ে যাচ্ছে।
এ নিয়ে কমিউনিটির বিভিন্ন স্তরের নেতৃবৃন্দ, প্রবীণ সংগঠক, সাংস্কৃতিক কর্মী, ব্যবসায়ী, পেশাজীবী এবং সচেতন নাগরিকদের সঙ্গে কথা বললে একটি বিষয়ে অনেকেই একমত হন। আর তা হলো, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, আঞ্চলিক এবং ধর্মীয় সংগঠনগুলোকে বাংলাদেশের দলীয় রাজনীতির প্রত্যক্ষ প্রভাবমুক্ত করতে হবে। যাঁরা সরাসরি বাংলাদেশি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত, তাঁদের কমিউনিটির অরাজনৈতিক সংগঠনের নেতৃত্বে না রাখাই উত্তম। এতে কাউকে ছোট করা নয়, বরং সংগঠনের চরিত্র রক্ষা করা সম্ভব হবে। দলীয় পরিচয়ের বাইরে গিয়ে যোগ্যতা, সততা, গ্রহণযোগ্যতা এবং কাজের ভিত্তিতে নেতৃত্ব বেছে নিতে পারলে অনেক সংঘাত কমে যাবে।
অনেকে মনে করেন, বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃবৃন্দের উচিত পত্রিকার মাধ্যমে নিজেদের পরিচয় ও ভূমিকা সম্পর্কে কমিউনিটির কাছে স্পষ্ট জবাবদিহি করা। তারা কে, নিজের জীবনে কী অর্জন করেছেন, সমাজে বা কমিউনিটিতে কী অবদান রেখেছেন, এবং কমিউনিটি বিনির্মাণে তাদের বাস্তব ভূমিকা কী, এসব বিষয় খোলামেলাভাবে জানানো দরকার। কারণ শুধু ভিজিটিং কার্ডে পদবি ছাপালেই কেউ নেতা হয়ে যান না; নেতৃত্বের মর্যাদা অর্জন করতে হয় কাজের মাধ্যমে।
একই সঙ্গে আঞ্চলিকতা এবং সাম্প্রদায়িকতার প্রভাবও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। মানুষ নিজের শেকড়কে ভালোবাসবে, নিজের জেলার স্মৃতি ধরে রাখবে, নিজের ধর্ম পালন করবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই ভালোবাসা যেন বৃহত্তর কমিউনিটি পরিচয়ের বিরুদ্ধে না দাঁড়ায়। বাংলাদেশি কমিউনিটি যদি টিকে থাকতে চায় মর্যাদার সঙ্গে, তবে তাকে “আমার অঞ্চল”, “আমার দল”, “আমার গোষ্ঠী”, “আমার লোক” এই সংকীর্ণ মানসিকতা ছাড়িয়ে “আমাদের কমিউনিটি” ভাবনায় উঠতে হবে।
কিছু বাস্তব পদক্ষেপও জরুরি। সংগঠনগুলোর জন্য লিখিত সংবিধান থাকতে হবে। নির্বাচন প্রক্রিয়া স্বচ্ছ হতে হবে। আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করতে হবে। কমিউনিটি সেন্টার, মসজিদ, মন্দির এবং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোতে মেয়াদসীমা নির্ধারণ করা যেতে পারে। একই ব্যক্তির হাতে দীর্ঘদিন নেতৃত্ব কেন্দ্রীভূত হলে বিরোধের আশঙ্কা বাড়ে। তরুণদের অংশগ্রহণের সুযোগ রাখতে হবে। নারী নেতৃত্বকে প্রতীকী নয়, কার্যকর মর্যাদা দিতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আচরণবিধির সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।
উত্তর আমেরিকার বাংলাদেশ কমিউনিটি এখনও সম্ভাবনাহীন নয়। বরং সম্ভাবনা এখনও বিপুল। এই কমিউনিটিতে আছেন চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিক্ষক, সাংবাদিক, শিল্পী, আইনজীবী, ব্যবসায়ী, সমাজকর্মী, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, তরুণ পেশাজীবী, মেধাবী শিক্ষার্থী, সফল উদ্যোক্তা। আছে ভাষার শক্তি, সংস্কৃতির ঐশ্বর্য, মুক্তিযুদ্ধের গৌরব, অভিবাসী সংগ্রামের ইতিহাস, এবং নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার এক অনমনীয় মানসিকতা। প্রয়োজন শুধু একটি পরিণত উপলব্ধি। বিভাজন দিয়ে কেউ বড় হয় না। শত্রুতা দিয়ে কমিউনিটি গড়ে ওঠে না। পদবির ঝলকানি দিয়ে সম্মান স্থায়ী হয় না। সম্মান আসে কাজ থেকে, সংযম থেকে, উদারতা থেকে, এবং বড় স্বার্থে ছোট অহম বিসর্জন দেওয়ার ক্ষমতা থেকে।
আজ সময় এসেছে নতুন করে ভাবার। আমরা কি সংগঠন গড়ছি মানুষের জন্য, নাকি মানুষ জড়ো করছি সংগঠনের নামে ব্যক্তিগত আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য? আমরা কি নতুন প্রজন্মকে উত্তরাধিকার হিসেবে দিচ্ছি একটি গর্বিত বাংলাদেশি পরিচয়, নাকি বিভক্তি, কাদা ছোড়াছুড়ি আর অবিশ্বাসের বিষাক্ত সংস্কৃতি? আমরা কি সত্যিই মূলধারার সমাজে মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান চাই, নাকি নিজেদের ক্ষুদ্র বলয়ের করতালিতেই সন্তুষ্ট?
রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ব্যক্তিগত থাকতে পারে, মতপার্থক্য থাকতেই পারে, অঞ্চলভিত্তিক আবেগও অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু কমিউনিটির বৃহত্তর স্বার্থে আমাদের শিখতে হবে ভিন্নমতের সঙ্গে সহাবস্থান। শিখতে হবে যে বিরোধ মানেই শত্রুতা নয়। শিখতে হবে যে নেতৃত্ব মানে মঞ্চের সামনে দাঁড়ানো নয়, বরং প্রয়োজন হলে সবার পেছনে দাঁড়িয়ে সবার জন্য জায়গা তৈরি করা।
আসুন, আমরা দলাদলি, আঞ্চলিক সংকীর্ণতা, সাম্প্রদায়িক বিভাজন এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঊর্ধ্বে উঠে একটি শক্তিশালী, সুশীল, দায়িত্বশীল এবং পরিচ্ছন্ন বাংলাদেশ কমিউনিটি গড়ে তোলার কথা নতুন করে ভাবি।









