সম্পাদকের পাতা

ধ্রুবতারার আলোয় টরন্টোতে রবীন্দ্রসন্ধ্যা

নজরুল মিন্টো

মানুষের জীবনে কিছু সন্ধ্যা আসে, যা কেবল সময়ের হিসাব দিয়ে মাপা যায় না। সে সন্ধ্যা মাপা যায় হৃদয়ের স্পন্দনে, স্মৃতির উজ্জ্বলতায়, সুরের গভীর অনুরণনে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান এমনই এক আশ্রয়, যেখানে বাঙালি তার আনন্দ, বেদনা, প্রেম, প্রকৃতি, মানবতা ও আত্মদর্শনের ভাষা খুঁজে পায়। দূর প্রবাসে থেকেও তাই রবীন্দ্রনাথ আমাদের কাছে কেবল একজন কবি নন, তিনি আমাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের এক অনিবার্য আলোকবর্তিকা। তাঁর সৃষ্টির ভেতর দিয়ে আমরা ফিরে যাই শেকড়ে, ফিরে যাই মনের সেই অন্দরমহলে, যেখানে বাংলা ভাষা, বাংলা সুর এবং বাঙালিয়ানার গভীরতম অনুভব একাকার হয়ে থাকে।

এই অনুভবকে সামনে রেখেই বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬৫তম জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী সংস্থা কানাডা আয়োজন করে এক মনোমুগ্ধকর সঙ্গীত সন্ধ্যা। অনুষ্ঠানের শিরোনাম ছিল ‘জ্বলিছে ধ্রুবতারা’। নামের মধ্যেই যেন ছিল রবীন্দ্রচেতনার এক চিরন্তন ইঙ্গিত। সময় বদলায়, প্রজন্ম বদলায়, ভূগোল বদলায়, কিন্তু রবীন্দ্রনাথের সুর বাঙালির জীবনে ধ্রুবতারার মতোই পথ দেখিয়ে যায়।

গত ৯ মে শনিবার সন্ধ্যা ৭টায় টরন্টোর হোপ চার্চ অডিটোরিয়ামে আয়োজিত এই দীর্ঘ সাংস্কৃতিক সন্ধ্যায় হলভর্তি দর্শক গভীর মনোযোগ নিয়ে অনুষ্ঠান উপভোগ করেন। প্রবাসের ব্যস্ত জীবনের ভেতর এমন একটি পরিপাটি, সুশৃঙ্খল ও রুচিশীল আয়োজন দর্শকদের মনে বিশেষ ছাপ ফেলে।

অনুষ্ঠানের শুরু থেকেই অডিটোরিয়ামে ছিল সংযত আবেগের এক সুন্দর আবহ। রবীন্দ্রনাথের গান যখন মঞ্চে ধ্বনিত হচ্ছিল, তখন দর্শকসারিতে ছিল নিবিড় মনোযোগ। শিল্পীদের কণ্ঠে প্রেম, পূজা, প্রকৃতি ও মানবতার গান একে একে জীবন্ত হয়ে ওঠে। প্রতিটি পরিবেশনা যেন মনে করিয়ে দেয়, রবীন্দ্রসঙ্গীত কেবল গান নয়, এটি বাঙালির আত্মিক ইতিহাসের অংশ।

রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী সংস্থা কানাডার শিল্পীরা একক ও সম্মিলিত পরিবেশনার মাধ্যমে অনুষ্ঠানে বৈচিত্র্য আনেন। গানের সঙ্গে নৃত্য পরিবেশনাও সন্ধ্যাটিকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে। নৃত্যের ভাষা, গানের সুর এবং মঞ্চের উপস্থাপনা মিলিয়ে পুরো আয়োজনটি হয়ে ওঠে রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিজগতের এক নান্দনিক প্রকাশ।

প্রবাসে রবীন্দ্রজয়ন্তীর এমন আয়োজন কেবল একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নয়, বরং এটি প্রজন্মের কাছে বাংলা সংস্কৃতি পৌঁছে দেওয়ার এক গুরুত্বপূর্ণ প্রয়াস। টরন্টোতে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের অনেকেই এমন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে জানতে পারে রবীন্দ্রনাথকে, অনুভব করতে শেখে বাংলা ভাষার সুরমাধুর্য। এবারের আয়োজনেও শিশু-কিশোরদের অংশগ্রহণ ছিল বিশেষভাবে লক্ষণীয়। তাদের পরিবেশনা দর্শকদের মুগ্ধ করে এবং প্রমাণ করে, প্রবাসের মাটিতেও বাংলা সংস্কৃতির উত্তরাধিকার নতুন প্রজন্মের হাতে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে। বাংলা গান, বাংলা কবিতা এবং বাংলা সংস্কৃতির প্রতি তাদের আগ্রহ তৈরির ক্ষেত্রেও এ ধরনের আয়োজন বিশেষ ভূমিকা রাখে।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত দর্শকদের অনেকেই মনে করেন, রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী সংস্থা কানাডা প্রবাসে রবীন্দ্রচর্চাকে নিয়মিত ও সংগঠিতভাবে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করছে। ‘জ্বলিছে ধ্রুবতারা’ নামের এই সন্ধ্যা তাই শুধু একটি অনুষ্ঠান হয়ে থাকেনি। এটি হয়ে উঠেছিল স্মরণ, শ্রদ্ধা, সৌন্দর্য ও আত্মপরিচয়ের এক মিলনমেলা।


Back to top button
🌐 Read in Your Language