সম্পাদকের পাতা

কাউন্সিলর পার্থি কান্দাভেলকে ঘিরে টরন্টো সিটি হলে অস্বস্তি

নজরুল মিন্টো

টরন্টোর রাজনীতিতে অনেক সময় বড় ঝড় শুরু হয় খুব ছোট একটি প্রশ্ন থেকে। একটি চিঠি, একটি অভিযোগ, একটি উন্নয়ন ফাইল, অথবা সিটি হলের কোনো কমিটির টেবিলে রাখা একটি সংশোধনী প্রস্তাব। বাইরে থেকে এগুলো নিছক প্রশাসনিক কাগজপত্রের মতো মনে হয়। কিন্তু সেই কাগজের ভেতরেই কখনো কখনো লুকিয়ে থাকে ক্ষমতার ব্যবহার, প্রভাবের হিসাব, ব্যবসায়িক স্বার্থ এবং রাজনৈতিক ভবিষ্যতের অঙ্ক।

স্কারবোরো সাউথওয়েস্টের কাউন্সিলর পার্থি কান্দাভেলকে ঘিরে এখন টরন্টো সিটি হলে ঠিক এমনই এক অস্বস্তিকর প্রশ্ন ঘুরছে। তিনি কি শুধু তাঁর ওয়ার্ডের মানুষের স্বার্থ রক্ষায় কঠোর অবস্থান নিয়েছিলেন, নাকি উন্নয়ন প্রকল্পের আড়ালে কোনো অদৃশ্য লেনদেনে জড়িত ছিলেন? অন্টারিও প্রাদেশিক পুলিশ, সংক্ষেপে OPP, এখন বিষয়টি তদন্ত করছে। অভিযোগ এখনো প্রমাণিত নয়। কান্দাভেল নিজেও দৃঢ়ভাবে বলেছেন, তাঁর পক্ষ থেকে কোনো অনিয়ম হয়নি। কিন্তু তদন্ত শুরু হওয়াই বড় ঘটনা। কারণ একজন নির্বাচিত কাউন্সিলরের বিরুদ্ধে ডেভেলপারদের কাছ থেকে অর্থ চাওয়ার অভিযোগ উঠলে সেটি আর ব্যক্তিগত বিতর্কে সীমাবদ্ধ থাকে না। সেটি হয়ে ওঠে সিটি হলের নৈতিকতা, নগর পরিকল্পনা এবং জনআস্থার পরীক্ষা।

গণতান্ত্রিক নগর ব্যবস্থায় মেয়র, কাউন্সিলর বা স্কুল বোর্ড ট্রাস্টিরা সাধারণ মানুষের সবচেয়ে কাছের নির্বাচিত প্রতিনিধি। তাঁরা রাস্তা, পার্ক, স্কুল, আবাসন, উন্নয়ন প্রকল্প, আশ্রয়কেন্দ্র, গণপরিবহন, স্থানীয় সেবা এবং নাগরিক অভিযোগ নিয়ে কাজ করেন। তাঁদের সিদ্ধান্তের সঙ্গে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সরাসরি সম্পর্ক থাকে। কিন্তু ইতিহাস দেখিয়েছে, স্থানীয় রাজনীতিও সব সময় স্বচ্ছ থাকে না। ক্ষমতা যেখানে আছে, সেখানে প্রভাব খাটানোর সুযোগও থাকে। উন্নয়ন প্রকল্প, জোনিং, সিটি চুক্তি, নির্বাচনী অনুদান, স্বার্থের সংঘাত এবং লবিংয়ের মতো বিষয়গুলো স্থানীয় রাজনীতিকে অনেক সময় জটিল করে তোলে।

টরন্টোর রাজনীতিতেই অতীতে স্বার্থের সংঘাত নিয়ে বড় বিতর্ক হয়েছে। ২০১২ সালে সাবেক মেয়র রব ফোর্ডকে একটি মামলায় পদ ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছিল আদালত। পরে ২০১৩ সালে ডিভিশনাল কোর্ট সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করে। শেষ পর্যন্ত তিনি মেয়র পদে থাকেন। কিন্তু ঘটনাটি দেখিয়ে দিয়েছিল, একজন মেয়রের ভোট, সিদ্ধান্ত বা ব্যক্তিগত সম্পর্কও কীভাবে আইনি ও নৈতিক প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। শুধু মেয়র নন, কাউন্সিলর কিংবা ট্রাস্টিদের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। জনপদের টাকা, জমি, অনুমোদন এবং নীতির সঙ্গে যাঁরা কাজ করেন, তাঁদের প্রতিটি পদক্ষেপ জনআস্থার সঙ্গে বাঁধা।

অনেকের চোখে কাউন্সিলরের কাজ যেন এলাকার অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকা, ফিতা কাটা, শুভেচ্ছা বক্তব্য দেওয়া কিংবা সিটি হলে কয়েকটি বক্তৃতা করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। বাস্তবে একজন টরন্টো কাউন্সিলরের ভূমিকা এর চেয়ে অনেক গভীর ও প্রভাবশালী। টরন্টো সিটি কাউন্সিল শহরের প্রধান সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী সংস্থা। শহরের বাজেট, কর, আবাসন নীতি, রাস্তা, ট্রানজিট, পার্ক, লাইব্রেরি, কমিউনিটি সেবা, আশ্রয়কেন্দ্র, নগর পরিকল্পনা এবং উন্নয়ন অনুমোদনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কাউন্সিল সিদ্ধান্ত নেয়। টরন্টো সিটি কাউন্সিলে মেয়র এবং ২৫ জন কাউন্সিলর থাকেন।

একজন কাউন্সিলর তাঁর ওয়ার্ডের মানুষের প্রতিনিধি। তিনি স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ শোনেন, সিটির কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন, উন্নয়ন আবেদন নিয়ে মত দেন, কমিটিতে অংশ নেন, বাজেট বিতর্কে ভোট দেন, জোনিং ও পরিকল্পনা বিষয়ে অবস্থান নেন, রাস্তা ও নিরাপত্তা সমস্যা নিয়ে চাপ তৈরি করেন, জনপরামর্শ সভায় ভূমিকা রাখেন এবং সিটি সার্ভিসের জটিলতা থেকে নাগরিকদের পথ দেখান। তাই কোনো কাউন্সিলর একটি উন্নয়ন প্রস্তাব নিয়ে কী অবস্থান নিচ্ছেন, কোন সংশোধনী দিচ্ছেন, কাকে সমর্থন করছেন, কাকে বাধা দিচ্ছেন, এসব বিষয় শুধু দাপ্তরিক ঘটনা নয়। এগুলো জমির মূল্য, ভাড়ার বাজার, আবাসন সরবরাহ, ডেভেলপারের লাভ এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর প্রভাব ফেলে।

পার্থি কান্দাভেলের বিরুদ্ধে অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দু একটি উন্নয়ন প্রকল্প। টরন্টো স্টারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সূত্রগুলোর দাবি অনুযায়ী, কিছু ডেভেলপার অভিযোগ করেছেন যে প্রকল্প এগিয়ে নিতে সাধারণ খরচের বাইরে অতিরিক্ত অর্থ চাওয়া হয়েছিল। কান্দাভেল অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর বক্তব্য, তদন্ত শেষে প্রমাণ হবে তিনি কোনো অনিয়ম করেননি।

এখানে বিষয়টি দুইভাবে দেখা যায়। একদিকে, একজন কাউন্সিলর তাঁর ওয়ার্ডের চরিত্র, যানজট, পার্কিং, ঘনবসতি, স্থানীয় সেবা এবং বাসিন্দাদের উদ্বেগের কথা বিবেচনা করে কোনো উন্নয়ন প্রস্তাব নিয়ে প্রশ্ন তুলতেই পারেন। এটি তাঁর দায়িত্বের অংশ। স্কারবোরোর মতো এলাকায় অনেক বাসিন্দার কাছে অতিরিক্ত ঘনবসতি, পার্কিং সংকট, আশ্রয়কেন্দ্রের অবস্থান বা মাঝারি উচ্চতার ভবন নির্মাণ সত্যিই উদ্বেগের বিষয় হতে পারে।

অন্যদিকে প্রশ্ন হলো, কোনো নির্বাচিত প্রতিনিধি যদি উন্নয়ন অনুমোদন বা সমঝোতা প্রক্রিয়ায় এমন শর্ত চাপান, যা ডেভেলপারের জন্য বড় আর্থিক ক্ষতির কারণ হতে পারে, তাহলে সেই সিদ্ধান্তের পেছনে কি নিছক নীতিগত যুক্তি ছিল, নাকি অন্য কোনো চাপ বা প্রত্যাশা কাজ করেছে? এই প্রশ্নের উত্তরই এখন তদন্তের কেন্দ্রে।

অভিযোগটি এমন এক পর্যায়ে সামনে এসেছে, যখন নির্বাচন ঘনিয়ে আসছে এবং কান্দাভেল পুনর্নির্বাচনে দাঁড়ানোর ইচ্ছা জানিয়েছেন। ফলে প্রশ্ন উঠছে, অভিযোগটি কি কেবল আইনি ও নৈতিক উদ্বেগ থেকে এসেছে, নাকি এর পেছনে রাজনৈতিক হিসাবও আছে? কান্দাভেল নিজেও বলেছেন, অভিযোগগুলো নির্বাচন সামনে রেখেই এসেছে। তাঁর এই বক্তব্যে ইঙ্গিত আছে, এর পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকতে পারে। তবে শুধু সময়কে সন্দেহজনক বললেই অভিযোগ অস্বীকার করা যায় না। আবার অভিযোগ উঠলেই কাউকে দোষীও বলা যায় না। তাই এখানে দুটি প্রশ্ন পাশাপাশি থাকে। অভিযোগের ভিত্তি কী? আর অভিযোগ প্রকাশের মুহূর্তটি রাজনৈতিকভাবে কতটা তাৎপর্যপূর্ণ?

রহস্য কয়েকটি জায়গায়। প্রথমত, অভিযোগকারী পক্ষ কেন এখন সামনে এল? উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে বিরোধ আগেই ছিল। তাহলে অভিযোগটি প্রকাশ্যে আসার পেছনে কী কারণ কাজ করেছে?

দ্বিতীয়ত, ইন্টেগ্রিটি কমিশনারের কাছে অভিযোগ যাওয়ার পর কেন বিষয়টি টরন্টো পুলিশ হয়ে OPP এর কাছে গেল? টরন্টো পুলিশ বলেছে, সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাত এড়াতে অভিযোগটি OPP এর কাছে পাঠানো হয়েছে। কারণ কাউন্সিলররা টরন্টো পুলিশ সার্ভিস বোর্ড এবং পুলিশের বাজেটের সঙ্গে সম্পর্কিত সিদ্ধান্তে ভূমিকা রাখেন। প্রশাসনিকভাবে ব্যাখ্যাটি যুক্তিযুক্ত। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে এটি নতুন প্রশ্ন তৈরি করে। অভিযোগটি কতটা গুরুতর যে স্থানীয় পুলিশ নিজে তদন্ত না করে প্রাদেশিক পুলিশের কাছে পাঠাল?

তৃতীয়ত, Kennedy Road Holdings এর উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে কান্দাভেলের সংশোধনী কি নিছক স্থানীয় পরিকল্পনা নিয়ে উদ্বেগ ছিল, নাকি সেটিই অভিযোগের পটভূমিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে? প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি বাণিজ্যিক বা অনাবাসিক জায়গার পরিমাণ ১,৫০০ বর্গফুট থেকে বাড়িয়ে ৪,০০০ বর্গফুট করার সংশোধনী দিয়েছিলেন। এমন শর্ত ডেভেলপারের খরচ ও লাভের হিসাব বদলে দিতে পারে। পরে ট্রাইব্যুনালে কোম্পানিটি এই শর্তের বিরুদ্ধে সফলভাবে যুক্তি দেখায়।

চতুর্থত, কান্দাভেল দীর্ঘদিন ধরে স্কারবোরোর শহরতলির পরিচয় এবং স্থানীয় স্থিতিশীলতার পক্ষে কথা বলেছেন। তিনি ছয় ইউনিটের আবাসন, এলাকাভিত্তিক দোকান, আশ্রয়কেন্দ্রের অবস্থান এবং মাঝারি উচ্চতার ভবন নিয়ে ডাউনটাউনকেন্দ্রিক নীতির বিরোধিতা করেছেন। তাহলে তাঁর অবস্থান কি নীতিগত, নাকি কোনো নির্দিষ্ট প্রকল্পে তাঁর ভূমিকা সন্দেহ তৈরি করেছে? এই সীমারেখাটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

অভিযোগ প্রমাণিত হলে কান্দাভেলের রাজনৈতিক জীবন বড় সংকটে পড়তে পারে। তদন্তে ফৌজদারি অপরাধের প্রমাণ পাওয়া গেলে বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়াতে পারে। ঘুষ বা দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হলে শুধু আইনি শাস্তি নয়, তাঁর জনসম্মানও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। নির্বাচনী রাজনীতিতে আস্থা সবচেয়ে বড় পুঁজি। একবার সেটি ভেঙে গেলে পদ ধরে রাখলেও নেতৃত্বের নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে যায়।

এছাড়া পৌর নীতি ও আচরণবিধি লঙ্ঘনের প্রশ্নও উঠতে পারে। অন্টারিওতে ইন্টেগ্রিটি কমিশনার নির্বাচিত প্রতিনিধিদের আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্ত করতে পারেন। প্রথাগত ব্যবস্থায় ভর্ত্সনা, পারিশ্রমিক সাময়িক স্থগিত করা বা প্রকাশ্যে নৈতিক চাপ তৈরি হওয়ার মতো শাস্তি থাকতে পারে। গুরুতর ক্ষেত্রে পদত্যাগের দাবি, নির্বাচনী ক্ষতি এবং কাউন্সিলে প্রভাব কমে যাওয়ার মতো রাজনৈতিক পরিণতিও দেখা দিতে পারে।

অন্যদিকে, অভিযোগ প্রমাণিত না হলে কান্দাভেল নিজেকে উদ্দেশ্যমূলক অভিযোগের শিকার হিসেবে তুলে ধরতে পারেন। এতে তাঁর সমর্থকদের মধ্যে সহানুভূতি তৈরি হতে পারে। তিনি বলতে পারেন, স্কারবোরোর স্বার্থে কঠোর অবস্থান নেওয়ার কারণেই তাঁকে টার্গেট করা হয়েছে। কিন্তু অভিযোগ প্রমাণিত না হলেও ক্ষত একেবারে মুছে যায় না। তদন্ত চলাকালে তাঁর নাম, তাঁর ওয়ার্ড এবং তাঁর রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত জনআলোচনায় থাকবে। কেউ বলবেন, আইনি প্রমাণ নেই, তাই তাঁকে সন্দেহ করা ঠিক নয়। আবার কেউ বলবেন, একজন নির্বাচিত প্রতিনিধির বিরুদ্ধে OPP তদন্ত শুরু হওয়াই উদ্বেগের। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে নির্বাচনী বাস্তবতা। কান্দাভেল প্রথম মেয়াদের কাউন্সিলর, অল্প ভোটে নির্বাচিত, সামনে নির্বাচন, তাঁর স্ত্রীও রাজনৈতিকভাবে সক্রিয়। ফলে তদন্ত তাঁকে মুক্ত করলেও জনমতের আদালতে তাঁকে ব্যাখ্যা দিতে হবে।

স্কারবোরো সাউথওয়েস্টের এই ঘটনা তাই কেবল একজন কাউন্সিলরের ব্যক্তিগত সংকট নয়। এটি টরন্টোর নগর রাজনীতির একটি বড় আয়না। এই আয়নায় দেখা যাচ্ছে উন্নয়ন আর বাসযোগ্যতার দ্বন্দ্ব, ডাউনটাউন আর শহরতলির দূরত্ব, ডেভেলপারদের প্রভাব নিয়ে জনসন্দেহ এবং নির্বাচনের আগে অভিযোগের রাজনৈতিক অভিঘাত। তদন্ত শেষ হলে হয়তো আইনি উত্তর পাওয়া যাবে। কিন্তু তার আগেই একটি প্রশ্ন টরন্টোর নাগরিক জীবনে ছড়িয়ে পড়েছে। সিটি হলের সিদ্ধান্তগুলো আসলে কার স্বার্থে নেওয়া হয়? নাগরিকের, নাকি ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা প্রভাবশালী মহলের?

এনএন/ ১৩ মে ২০২৬


Back to top button
🌐 Read in Your Language