সম্পাদকের পাতা

স্কারবোরো সাউথওয়েস্টে পিসি পার্টির প্রার্থীরা কোন ডিভিশনের প্লেয়ার?

নজরুল মিন্টো

স্কারবোরো সাউথওয়েস্টের রাজনীতিতে এখন এক ধরনের অস্বস্তিকর স্থবিরতা। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয়, মাঠ প্রস্তুত, দর্শকরাও আস্তে আস্তে গ্যালারিতে বসছে; কিন্তু একটি দলের ড্রেসিংরুমে এখনো জার্সি আসেনি। এনডিপি তাদের প্রার্থী নিয়ে মাঠে নেমে গেছে। লিবারেলরাও নিজেদের প্রার্থীকে সামনে রেখে প্রচারের ছন্দ ধরার চেষ্টা করছে। অথচ অন্টারিওর ক্ষমতাসীন প্রগ্রেসিভ কনজারভেটিভ পার্টি, যারা প্রদেশজুড়ে তিনবার বড় ম্যান্ডেট নিয়ে সরকার গঠন করেছে, তারা স্কারবোরো সাউথওয়েস্টে এসে যেন প্রার্থী বাছাইয়ের গোলকধাঁধায় আটকে এক দীর্ঘ অপেক্ষার মধ্যে পড়ে আছে।

এই অপেক্ষা শুধু প্রার্থী ঘোষণার অপেক্ষা নয়। এর ভেতরে আছে ক্ষমতার রাজনীতি, দলীয় কৌশল, ভোটারদের প্রত্যাশা, আর আছে এক ধরনের অদৃশ্য শ্রেণিবিভাগ। কে বড় খেলোয়াড়, কে মাঝারি, কে শুধু নিজের পাড়ার মাঠে জনপ্রিয়, আর কে সত্যিই মূলধারার রাজনীতিতে দাঁড়ানোর মতো প্রস্তুত, সে প্রশ্ন এখন রাইডিংয়ের চায়ের টেবিল থেকে কমিউনিটি আড্ডা পর্যন্ত ঘুরে বেড়াচ্ছে।

প্রশ্নটি খুবই সরল, কিন্তু অস্বস্তিকর: স্কারবোরো সাউথওয়েস্টে পিসি পার্টির প্রার্থীরা আসলে কোন ডিভিশনের প্লেয়ার?

ফুটবলের ভাষায় বললে, সাবেক কাউন্সিলর গ্যারি ক্রফোর্ড ছিলেন সেই পরিচিত নাম, যাকে দেখে সংবাদমাধ্যমের ক্যামেরা ছুটে আসে। সিটির সাবেক বাজেট প্রধান, টরন্টোর রাজনৈতিক অঙ্গনে পরিচিত মুখ। তাঁর সম্ভাব্য প্রার্থিতা নিয়ে টরন্টো স্টার সংবাদ করেছে, বিশ্লেষণ করেছে, ডাগ ফোর্ডের আগ্রহের কথাও লিখেছে। কিন্তু তিনি সরে দাঁড়াতেই যেন পুরো ছবিটা ঝাপসা হয়ে গেল। এরপর মাঠে যাঁরা রইলেন, তাঁদের নাম কমিউনিটির ভেতরে ঘুরছে, সমর্থকরা ফেসবুকে সক্রিয়, কিন্তু মূলধারার গণমাধ্যম যেন খাতা বন্ধ করে বসে আছে।

ডা. নুরুল্লাহ তরুণ, মোরশেদ নিজাম, গাজী সিজান ও আয়েশা সরদার, এই চারজনের নাম এখন পিসি মনোনয়নের দৌড়ে শোনা যাচ্ছে। শেষ মুহূর্তে অন্য কোনো মুখ আসতে পারে বলেও গুঞ্জন আছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, টরন্টো স্টার, টরন্টো সান বা স্থানীয় টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে তাঁদের নিয়ে দৃশ্যমান কোনো আলোচনা নেই। যেন নাম আছে, দৌড় আছে, কিন্তু রাজনৈতিক মানচিত্রে তাঁরা এখনো পিন ফোটানোর মতো জায়গা পাননি।

রাইডিংয়ের অনেক ভোটারের ভাষায়, যদি গ্যারি ক্রফোর্ড প্রিমিয়ার লিগের খেলোয়াড় হন, তাহলে বাকি প্রার্থীরা কোন লিগে খেলছেন? সেকেন্ড ডিভিশনের খবরও তো সংবাদ হয়। কমিউনিটি লিগের খেলোয়াড়রাও কখনো কখনো বড় টুর্নামেন্টে উঠে আসে। নাকি সমস্যা খেলোয়াড়ে নয়, সমস্যা সেই খেলার প্রচারে? নাকি তাঁরা এখনো এমনভাবে নিজেদের উপস্থাপন করতে পারেননি, যাতে মূলধারার সাংবাদিকরা তাঁদের রাজনৈতিক গল্প হিসেবে দেখতে বাধ্য হন?

স্কারবোরো সাউথওয়েস্ট কোনো সাধারণ রাইডিং নয়। এটি অভিবাসী জীবনের ঘন মানচিত্র, বহুসাংস্কৃতিক বাস্তবতার পরীক্ষাগার। ডলি বেগম এই আসন থেকে উঠে এসে অন্টারিও রাজনীতিতে পরিচিত মুখ হয়েছিলেন। পরে তিনি প্রাদেশিক আসন ছেড়ে ফেডারেল রাজনীতিতে লিবারেল প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং জয়ী হন। তাঁর প্রস্থানই এই উপনির্বাচনের পথ তৈরি করেছে। ফলে আসনটি শুধু শূন্য হয়নি, রাজনৈতিকভাবে আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।

এনডিপি জানে, এটি তাদের পুরোনো দুর্গ। ফাতিমা শাবানকে সামনে রেখে তারা আসন ধরে রাখার প্রস্তুতি নিচ্ছে। অন্যদিকে লিবারেল প্রার্থী আহসানুল হাফিজকে ঘিরেও নতুন হিসাব তৈরি হয়েছে। ডলি বেগমের ফেডারেল সাফল্যের পর এখানে লিবারেলদের নতুন সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। আর পিসি জানে, প্রদেশজুড়ে ক্ষমতায় থাকলেও স্কারবোরো সাউথওয়েস্ট তাদের জন্য সহজ মাঠ নয়। ২০১৮, ২০২২ ও ২০২৫ সালের নির্বাচনে এই আসন তারা জিততে পারেনি। তাই এবার প্রার্থী বাছাই শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি দলের রাজনৈতিক মর্যাদার প্রশ্নও।

কিন্তু সেই মর্যাদার লড়াইয়ে যদি প্রার্থীরাই সংবাদমাধ্যমের চোখে দৃশ্যমান না হন, তাহলে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। বাইরে থেকে দেখলে অনেক সময় মনে হয়, তাঁরা যেন বাংলাদেশি কমিউনিটির কোনো সংগঠনের প্রার্থী হতে যাচ্ছেন। তাঁদের আশপাশে যারা আছেন, তারা কি শুধু করতালি দেওয়ার জন্য, নাকি প্রার্থীর গ্রহণযোগ্যতার পরিসর বাড়ানোরও কোনো দায়িত্ব তাদের আছে? রাজনীতি তো শুধু নিজের লোকের সভায় হাততালি পাওয়ার নাম নয়। রাজনীতি হলো অপরিচিত মানুষের দরজায় গিয়ে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করা।

৯ জুলাইয়ের মনোনয়ন সভা তাই শুধু পিসি পার্টির একটি অভ্যন্তরীণ ভোট নয়। এটি হবে এক ধরনের রাজনৈতিক পরীক্ষা। কে কমিউনিটির প্রার্থী, আর কে সত্যিই স্কারবোরো সাউথওয়েস্টের প্রার্থী হয়ে উঠতে পারেন, তার প্রথম উত্তর মিলতে পারে সেদিন। সময় কম। উপনির্বাচন ডাকতে হবে ৫ আগস্টের মধ্যে। অথচ পিসির মাঠ এখনো কুয়াশাচ্ছন্ন, ছবিটা ঝাপসা।

এখন দেখার বিষয়, পিসি সদস্যরা কাকে বেছে নেবেন। রহস্য এখনও রয়ে গেল। শেষ পর্যন্ত হিসাব একটাই, রাজনীতির মাঠে নামতে হলে শুধু জার্সি পরলেই হয় না, খেলাও দেখাতে হয়।


Back to top button
🌐 Read in Your Language