সম্পাদকের পাতা

ক্রোয়েশিয়ার লুকা মদরিচ আজ বিশ্বকাপের কিংবদন্তি

নজরুল মিন্টো

ক্রোয়েশিয়ার জার্সিতে লুকা মদরিচকে দেখলে প্রথমে চোখে পড়ে তাঁর ছোট গড়নের শরীর, তারপর চোখ আটকে যায় তাঁর পায়ের কাজে। তিনি শরীরের জোরে প্রতিপক্ষকে সরিয়ে পথ তৈরি করেন না, বরং বল পায়ে নিয়ে সময়কে যেন নিজের মতো করে নিয়ন্ত্রণ করেন। কখন পাস দেবেন, কখন গতি বাড়াবেন, কখন খেলা থামিয়ে আবার নতুন করে সাজাবেন, সেটি তিনি অন্যদের চেয়ে এক মুহূর্ত আগে বুঝে ফেলেন।

লুকা মদরিচ জন্মগ্রহণ করেন ১৯৮৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর, ক্রোয়েশিয়ার জাদার অঞ্চলে। তখনকার যুগোস্লাভিয়ার ভাঙনের সময় বলকান অঞ্চলে জাতিগত সংঘাত ক্রমে ভয়ংকর রূপ নিচ্ছিল। ১৯৯১ সালে ক্রোয়েশিয়ার স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হলে তাঁর গ্রামের জীবন ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। তাঁর দাদা লুকা মদরিচ সিনিয়রকে হত্যা করা হয়। পরিবারটি ঘর ছাড়তে বাধ্য হয়। ছোট্ট মদরিচকে মা-বাবার সঙ্গে আশ্রয় নিতে হয় জাদারের একটি হোটেলে।

হোটেলের সেই দিনগুলোতে ফুটবল ছিল মদরিচের সবচেয়ে বড় আশ্রয়। করিডর, পার্কিং লট, আশপাশের ছোট্ট খোলা জায়গা, যেখানেই একটু সুযোগ পেতেন, সেখানেই বল নিয়ে ছুটতেন। বাইরে যুদ্ধের আতঙ্ক, ঘরে বাস্তুচ্যুত পরিবারের অনিশ্চয়তা। কিন্তু বল পায়ে পেলেই শিশুটি যেন নিজের জন্য আলাদা একটি পৃথিবী বানিয়ে নিত।

ছোট গড়নের কারণে শুরুতে অনেকেই তাঁকে গুরুত্ব দেননি। ফুটবলের দুনিয়ায় তখন শক্তি, উচ্চতা, গতি ও শরীরী ক্ষমতাকে বড় করে দেখা হতো। মদরিচ ছিলেন হালকা গড়নের এক কিশোর। তাঁকে দেখে কেউ কেউ ভেবেছিল, এই ছেলে ফুটবলের মাঠে টিকবে না। কিন্তু ফুটবল শুধু শরীরের খেলা নয়। এটি বুদ্ধি, ছন্দ, দূরদৃষ্টি এবং মুহূর্তের মধ্যে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার শিল্পও। মদরিচ ধীরে ধীরে সেভাবেই নিজেকে গড়ে তুলেছেন।

জাদার থেকে তাঁর ফুটবলযাত্রা শুরু। পরে তিনি যোগ দেন দিনামো জাগরেবের যুব ব্যবস্থায়। কিশোর বয়সেই তাঁকে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করতে হয়েছে। ক্যারিয়ারের শুরুতে তিনি বসনিয়ার জ্রিনস্কি মোস্তার এবং ক্রোয়েশিয়ার ইন্টার জাপ্রেশিচে খেলেন। সেখানেই তিনি বুঝিয়ে দেন, শরীরের মাপ দিয়ে প্রতিভা মাপা যায় না। দিনামো জাগরেবে ফিরে তিনি ক্রোয়েশিয়ান ফুটবলে নিজের অবস্থান মজবুত করেন। তাঁর খেলা তখনই আলাদা করে চোখে পড়তে শুরু করে।

২০০৮ সালে ইংল্যান্ডের টটেনহ্যাম হটস্পারে যোগ দেওয়া ছিল তাঁর ক্যারিয়ারের বড় মোড়। প্রিমিয়ার লিগের শক্তিনির্ভর ফুটবলে প্রথমদিকে তাঁকে নিয়ে প্রশ্ন ছিল। অনেকে বলেছিল, তিনি খুব হালকা, ইংল্যান্ডের ফুটবলে মানিয়ে নিতে পারবেন না। কিন্তু মদরিচ ধীরে ধীরে নিজের জায়গা তৈরি করেন। তাঁর বল কন্ট্রোল এবং খেলার গতি বুঝে নেওয়ার দক্ষতা তাঁকে টটেনহ্যামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়ে পরিণত করে।

২০১২ সালে তিনি যোগ দেন রিয়াল মাদ্রিদে। এখানেও শুরুটা সহজ ছিল না। প্রথম মৌসুমে স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যমের একাংশ মনে করেছিল, তাঁকে দলে নেওয়া রিয়াল মাদ্রিদের ভুল সিদ্ধান্ত। কিন্তু সময়ই শেষ পর্যন্ত তাঁর পক্ষে কথা বলে। রিয়াল মাদ্রিদের মাঝমাঠে টনি ক্রুস, কাসেমিরো এবং মদরিচের ত্রয়ী আধুনিক ক্লাব ফুটবলের অন্যতম সেরা মিডফিল্ড ইউনিট হয়ে ওঠে। এই ত্রয়ীর ভেতরে মদরিচ ছিলেন ছন্দের কারিগর।

রিয়াল মাদ্রিদে ১৩ মৌসুমে তিনি ক্লাব ইতিহাসের অন্যতম বড় কিংবদন্তিতে পরিণত হন। ক্লাবটির হয়ে তিনি ২৮টি শিরোপা জিতেছেন। এর মধ্যে আছে ছয়টি ইউরোপিয়ান কাপ বা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, ছয়টি ক্লাব বিশ্বকাপ, পাঁচটি ইউরোপিয়ান সুপার কাপ, চারটি লা লিগা, দুটি কোপা দেল রে এবং পাঁচটি স্প্যানিশ সুপার কাপ। রিয়াল মাদ্রিদের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি শিরোপাজয়ী খেলোয়াড়দের একজন হিসেবে তাঁর নাম স্থায়ীভাবে লেখা হয়ে গেছে।

তবে মদরিচের জীবনের সবচেয়ে আবেগময় অধ্যায় ক্রোয়েশিয়ার জাতীয় দল। জনসংখ্যায় ছোট একটি দেশ হয়েও ক্রোয়েশিয়া তাঁর নেতৃত্বে বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে অসাধারণ মর্যাদা অর্জন করে। ২০১৮ বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়া ফাইনালে ওঠে। ফ্রান্সের কাছে হারলেও সেই বিশ্বকাপ মদরিচের ব্যক্তিগত স্বীকৃতির শীর্ষ মুহূর্ত হয়ে থাকে। তিনি জেতেন বিশ্বকাপের গোল্ডেন বল। একই বছরে তিনি ব্যালন ডি’অর জিতে মেসি ও রোনালদোর দীর্ঘ আধিপত্য ভেঙে দেন।

২০২২ বিশ্বকাপেও মদরিচ ক্রোয়েশিয়াকে সেমিফাইনালে তুলতে বড় ভূমিকা রাখেন। শেষ পর্যন্ত ক্রোয়েশিয়া তৃতীয় স্থান অর্জন করে। বয়স তখন অনেকের চোখে অবসরের সময়। কিন্তু মদরিচ যেন বয়সকে আলাদা করে তেমন গুরুত্ব দেননি। তাঁর খেলায় গতি কমেছে, কিন্তু বুদ্ধি বেড়েছে। শরীর আগের মতো দ্রুত না চললেও মাথা আরও দ্রুত কাজ করেছে। এটাই মদরিচের সৌন্দর্য। তিনি ফুটবলকে শুধু পায়ে খেলেন না, মাথা দিয়ে পড়েন।

২০২৬ বিশ্বকাপে এসে মদরিচের গল্প আরও বিস্ময়কর। চল্লিশ বছর বয়সে তিনি ক্রোয়েশিয়ার অধিনায়ক। এটি তাঁর পঞ্চম বিশ্বকাপ। এমন বয়সে একজন আউটফিল্ড খেলোয়াড়ের বিশ্বকাপে নেতৃত্ব দেওয়া খুবই বিরল ঘটনা। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের ম্যাচ ঘিরে তাঁর ১৯৯তম আন্তর্জাতিক ম্যাচের প্রসঙ্গও আলোচনায় আসে। কোচ জ্লাতকো দালিচ তাঁকে শুধু অধিনায়ক নয়, মাঠে নিজের সবচেয়ে বড় ভরসা হিসেবে দেখেন।

লুকা মদরিচের গল্প তাই শুধু একজন ফুটবলারের সাফল্যের গল্প নয়। এটি সেই শিশুর গল্প, যে বাস্তুচ্যুত জীবনের অস্থায়ী আশ্রয় থেকে উঠে এসে বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে সম্মানিত মঞ্চে দাঁড়িয়েছে। যাকে একসময় ছোট গড়নের বলে সন্দেহ করা হয়েছিল, তিনিই পরে প্রমাণ করেছেন, ফুটবলে শরীরের মাপের চেয়ে বড় হলো চিন্তার স্বচ্ছতা, খেলার ছন্দ বোঝার ক্ষমতা এবং ঠিক সময়ে ঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা।

তথ্যসূত্র:
Reuters, ১৭ জুন ২০২৬
The Guardian, ১৬ জুন ২০২৬


Back to top button
🌐 Read in Your Language