সম্পাদকের পাতা

বজ্রপাতের সংকেতে থেমে গেল বিশ্বকাপের ফ্রান্স-ইরাক ম্যাচ

নজরুল মিন্টো

বিশ্বকাপের মাঠে সাধারণত মানুষ অপেক্ষা করে গোলের জন্য, বাঁশির জন্য, এক মুহূর্তের জাদুর জন্য। কিন্তু কখনো কখনো ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে আরেক অদৃশ্য খেলোয়াড় এসে দাঁড়ায়। তার নাম আবহাওয়া। সে কোনো জার্সি পরে না, কোনো পাস দেয় না, কোনো গোল করে না। তবু তার এক ঝলক বিদ্যুৎ, এক পশলা বৃষ্টি, এক দমকা ঝড় মুহূর্তের মধ্যে থামিয়ে দিতে পারে বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় আয়োজনের ছন্দ।

ফিলাডেলফিয়ায় ফ্রান্স বনাম ইরাক ম্যাচে ঠিক সেই দৃশ্যই দেখা গেল। মাঠে তখন বিশ্বকাপের উত্তাপ, গ্যালারিতে হাজার হাজার মানুষের অপেক্ষা, স্কোরবোর্ডে ফ্রান্স ১-০ গোলে এগিয়ে। কিলিয়ান এমবাপে ১৪ মিনিটেই ফ্রান্সকে এগিয়ে দিয়েছিলেন। ম্যাচ চলছিল, কিন্তু ৩৭ মিনিটের পর থেকে বৃষ্টি ধীরে ধীরে খেলার ভেতরে ঢুকে পড়তে শুরু করে। বিরতিতে গিয়ে পরিস্থিতি আরও বদলে যায়। শুধু বৃষ্টি নয়, আশপাশে বজ্রঝড়ের সতর্কতা। স্টেডিয়ামের বড় পর্দায় দর্শকদের খোলা আসন ছেড়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে বলা হয়। খেলোয়াড়েরা ড্রেসিংরুমে অপেক্ষা করেন। পরে প্রায় দুই ঘণ্টার বেশি বিলম্ব শেষে খেলা আবার শুরু হয়। দ্বিতীয়ার্ধে এমবাপে আরেক গোল করেন, পরে উসমান ডেম্বেলে তৃতীয় গোলটি করে ফ্রান্সের ৩-০ জয় নিশ্চিত করেন।

বিশ্বকাপের ইতিহাসে এমন দৃশ্য অস্বাভাবিক হলেও একেবারে নতুন নয়। ফুটবল বহুবার আবহাওয়ার সঙ্গে লড়েছে। কখনো মাঠ কাদায় ডুবেছে, কখনো বৃষ্টি বলের গতি থামিয়ে দিয়েছে, কখনো প্রচণ্ড গরম খেলোয়াড়দের শরীরের সীমা পরীক্ষা করেছে। তবে ফ্রান্স-ইরাক ম্যাচের ঘটনা আলাদা, কারণ ২০২৬ বিশ্বকাপ হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর বিশাল ভৌগোলিক পরিসরে। এখানে জুন-জুলাই মানেই উত্তর আমেরিকার অনেক অঞ্চলে বজ্রঝড়, ভারী বৃষ্টি এবং আকস্মিক আবহাওয়ার ঝুঁকি।

ম্যাচটি যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে হওয়ায় ফিফাকে স্থানীয় বজ্রপাত-নিরাপত্তা প্রটোকল মানতে হয়। নিয়মটি সহজ, কিন্তু কঠোর। স্টেডিয়ামের ৮ মাইল বা প্রায় ১৩ কিলোমিটারের মধ্যে বজ্রপাত শনাক্ত হলে খেলা থামাতে হয়। এরপর ৩০ মিনিট অপেক্ষা করতে হয়। এই সময়ের মধ্যে আবার বজ্রপাত হলে অপেক্ষার সময় নতুন করে শুরু হয়। অর্থাৎ বৃষ্টি কমলেই খেলা শুরু হয় না; নিরাপত্তার ঘড়ি পূর্ণ হতে হয়।

ফিফার নিয়ম অনুযায়ী, কোনো ম্যাচ অনিবার্য কারণে পরিত্যক্ত হলে সেটি সাধারণত শূন্য থেকে শুরু হয় না। যেখানে খেলা থেমেছে, সেখান থেকেই আবার শুরু করার বিধান থাকে। একই স্কোরলাইন, আগের কার্ড, বদলির হিসাব এবং ম্যাচের পরিস্থিতি বজায় থাকে। ফ্রান্স-ইরাক ম্যাচে শেষ পর্যন্ত সেই পর্যায়ে যেতে হয়নি; নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর দ্বিতীয়ার্ধ শুরু হয় এবং ম্যাচ শেষ পর্যন্ত মাঠেই নিষ্পত্তি হয়।

বিশ্বকাপের মূলপর্বে খারাপ আবহাওয়ার কারণে ম্যাচ পুরোপুরি বাতিল হয়ে যাওয়ার নজির খুব বেশি নেই। বরং আবহাওয়া অনেক ম্যাচের চরিত্র বদলে দিলেও খেলা শেষ পর্যন্ত হয়েছে। সবচেয়ে বিখ্যাত উদাহরণ ১৯৭৪ বিশ্বকাপের পশ্চিম জার্মানি বনাম পোল্যান্ড ম্যাচ। ফ্রাঙ্কফুর্টে প্রবল বৃষ্টিতে মাঠ প্রায় জলাশয়ে পরিণত হয়েছিল। মাঠ থেকে পানি সরানোর চেষ্টা শেষে খেলা আধা ঘণ্টা দেরিতে শুরু হয়। সেই ম্যাচ ইতিহাসে পরিচিত “Water Battle of Frankfurt” নামে। জার্মানি ১-০ গোলে জেতে, গার্ড মুলার গোল করেন।

ফ্রান্স-ইরাক ম্যাচ ২০২৬ বিশ্বকাপের একটি বড় বাস্তবতাও সামনে নিয়ে এসেছে। ৪৮ দল, ১০৪ ম্যাচ, তিন আয়োজক দেশ, বহু শহর এবং ভিন্ন জলবায়ুর এই আসরে আবহাওয়া এখন আয়োজনের গুরুত্বপূর্ণ হিসাব। শুধু স্টেডিয়াম, টিকিট ও সম্প্রচার নয়, বিশ্বকাপকে প্রস্তুত থাকতে হচ্ছে আকাশের অনিশ্চয়তার জন্যও।

এমন বিলম্ব শুধু দুই দলের সমস্যা নয়। ঘন সময়সূচির বিশ্বকাপে একটি ম্যাচ দেরি হলে ভ্রমণসূচি, অনুশীলন, সম্প্রচার, দর্শকের যাতায়াত, নিরাপত্তা ও স্টেডিয়াম ব্যবস্থাপনায় প্রভাব পড়ে। বিশেষ করে গ্রুপ পর্বের শেষদিকে একই গ্রুপের ম্যাচগুলো একই সময়ে আয়োজনের নিয়ম থাকায় আবহাওয়া-বিলম্ব পুরো গ্রুপের হিসাবেও ছায়া ফেলতে পারে।

তবু শেষ কথা একটাই, ফুটবল অপেক্ষা করতে পারে, জীবন নয়। ফিলাডেলফিয়ায় অনুষ্ঠিত এ ম্যাচটি মাঠে থাকা দর্শক থেকে টেলিভিশনের সামনে বসা মানুষ, সবার জন্যই ছিল বিশ্বকাপ দেখার এক নতুন অভিজ্ঞতা। আধুনিক ফুটবল যত প্রযুক্তিনির্ভর হোক, যত পরিকল্পিত হোক, যত কোটি ডলারের আয়োজন হোক, প্রকৃতির সামনে মানুষকে থামতেই হয়। স্টেডিয়ামের আলো, বড় পর্দা, টিভি সম্প্রচার, সবকিছুর মাঝেও আকাশের নিজস্ব বাঁশি আছে। সেই বাঁশি বাজলে রেফারির বাঁশিও থেমে যায়।

তথ্যসূত্র:
Reuters, AP, FIFA World Cup 26 Regulations, FIFA.com


Back to top button
🌐 Read in Your Language