
কিছু সন্ধ্যা থাকে, যা কেবল ঘড়ির কাঁটায় মাপা যায় না। কিছু গান থাকে, যা শুধু সুর হয়ে কানে আসে না, মনের ভেতর দীর্ঘদিন ধরে আলো জ্বেলে রাখে। টরন্টোর হাঙ্গেরিয়ান কালচারাল সেন্টারের অডিটোরিয়ামে সেই সন্ধ্যাটি ভরে উঠেছিল রবীন্দ্রনাথের গান, বাংলা ভাষার স্নিগ্ধতা, স্মৃতিময় আবহ আর মন ছুঁয়ে যাওয়া এক শিল্পমগ্ন পরিবেশে।
গত শনিবার আনন্দধারা পারফর্মিং আর্টস আয়োজন করেছিল “জীবনের ধ্রুবতারা” শিরোনামে বাংলাদেশের বিশিষ্ট রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী ড. লাইসা আহমদ লিসার একক সঙ্গীত সন্ধ্যা। সন্ধ্যা সাতটায় শুরু হওয়া প্রায় তিন ঘণ্টার এই আয়োজন হলভর্তি শ্রোতা-দর্শক পিনপতন নীরবতায় উপভোগ করেন। সেই নীরবতা ছিল নিছক চুপ থাকা নয়; ছিল মনোযোগ, মুগ্ধতা এবং শিল্পের প্রতি গভীর শ্রদ্ধার প্রকাশ।

রবীন্দ্রনাথের গান বাঙালির জীবনে শুধু সঙ্গীত নয়, এক ধরনের আত্মসংলাপ। আনন্দে, বেদনায়, প্রেমে, বিচ্ছেদে, প্রকৃতিতে, প্রার্থনায়, জীবনের প্রায় প্রতিটি বাঁকে এই গান বাঙালির অন্তরের ভাষা হয়ে থাকে। সেই ভাষাকেই ড. লাইসা আহমদ লিসা তাঁর পরিণত কণ্ঠ, সাধনালব্ধ ভঙ্গি এবং গভীর অনুভব দিয়ে শ্রোতাদের সামনে মেলে ধরেন। তাঁর পরিবেশনায় পরিচিত গানও যেন নতুন আলোয় ধরা দেয়।

বাংলা সঙ্গীতাঙ্গনে ড. লাইসা আহমদ লিসা একটি শ্রদ্ধেয় নাম। তিনি কেবল একজন রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী নন, তিনি শিক্ষক, গবেষক এবং সংস্কৃতিচর্চার নিবেদিত মানুষ। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে তিনি রবীন্দ্রসঙ্গীত চর্চা, শিক্ষা ও পরিবেশনার মাধ্যমে বাংলা সংস্কৃতির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন। তিনি ছায়ানটের একজন বিশিষ্ট শিক্ষক এবং জাতীয় রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মিলন পরিষদের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে সম্পৃক্ত। দেশ-বিদেশের বহু মঞ্চে তাঁর পরিবেশনা রবীন্দ্রসঙ্গীতপ্রেমীদের কাছে তাঁকে আলাদা মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছে।

রবীন্দ্রসঙ্গীত চর্চায় তাঁর দীর্ঘ সাধনা ও নিষ্ঠার মূল্যায়ন হিসেবে ড. লাইসা আহমদ লিসা ২০২৪ সালে বাংলা একাডেমি প্রদত্ত মর্যাদাপূর্ণ ‘রবীন্দ্র পুরস্কার’-এ ভূষিত হন। এই সম্মাননা তাঁর শিল্পজীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রাপ্তি, একই সঙ্গে রবীন্দ্রচেতনা প্রচারে তাঁর নিরলস কাজেরও স্বীকৃতি।

“জীবনের ধ্রুবতারা” শিরোনামটিই যেন পুরো সন্ধ্যার মর্মকে ধারণ করেছিল। জীবনের অনিশ্চয়তা, বিচ্ছেদ, প্রেম, প্রত্যাশা ও আলোর সন্ধান রবীন্দ্রনাথের গানে বারবার ফিরে এসেছে। ড. লাইসা আহমদ লিসার কণ্ঠে সেই গানগুলো শ্রোতাদের নিয়ে যায় অনুভব ও সৌন্দর্যের এক স্নিগ্ধ আবহে। প্রতিটি পরিবেশনায় ছিল শিল্পীর সংযম, সুরের স্বচ্ছতা এবং কথার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা। ফলে গানগুলো কেবল পরিবেশিত হয়নি; শ্রোতাদের মনে দীর্ঘ অনুরণন রেখে গেছে।
অনুষ্ঠানটির সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন আনন্দধারা পারফর্মিং আর্টস-এর কর্ণধার শিপ্রা চৌধুরী। তাঁর পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনায় আয়োজনটি ছিল পরিমিত, সুশৃঙ্খল এবং নান্দনিক।

সেই সন্ধ্যায় হাঙ্গেরিয়ান কালচারাল সেন্টারের মঞ্চে শুধু গান শোনা হয়নি; অনুভব করা হয়েছে বাংলা সংস্কৃতির এক উজ্জ্বল উত্তরাধিকার। ড. লাইসা আহমদ লিসার কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথ যেন আবারও মনে করিয়ে দিলেন, জীবনের পথ যতই দূর হোক, সুরের ভেতরেই থাকে মানুষের ফিরে আসার ঠিকানা। টরন্টোর বাঙালি সমাজে রবীন্দ্রসঙ্গীতের এই সন্ধ্যা তাই শুধু একটি সঙ্গীতানুষ্ঠান ছিল না; বাংলার সুর, ভাষা ও বোধকে আরেকবার গভীরভাবে অনুভব করার উপলক্ষ হয়ে উঠেছিল।









