সম্পাদকের পাতা

আর্জেন্টিনার জন্য বাংলাদেশের ভালোবাসা

নজরুল মিন্টো

বিশ্বকাপের মাঠে বাংলাদেশ নেই। ফিফার সূচিতে বাংলাদেশের কোনো ম্যাচ নেই, স্টেডিয়ামের টানেলে লাল-সবুজ জার্সি পরে বাংলাদেশের কোনো ফুটবলার দাঁড়ান না। তবু বিশ্বকাপ এলেই পৃথিবীর এক প্রান্তে আকাশি-সাদা এক আবেগ জেগে ওঠে। আর্জেন্টিনা মাঠে নামে উত্তর আমেরিকার কোনো শহরে, আর বাংলাদেশের পাড়া-মহল্লা, ছাদ, বাজার, বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, চায়ের দোকান, গ্রামের মোড় যেন দূর থেকে আরেকটি গ্যালারিতে পরিণত হয়। সেই গ্যালারির আসন ছড়িয়ে থাকে আরও দূরে, টরন্টোর অ্যাপার্টমেন্টে, নিউইয়র্কের বেজমেন্টে, লন্ডনের রেস্টুরেন্টে, সিডনির বসার ঘরে, দুবাই ও দোহার শ্রমিক আবাসে। পৃথিবীর নানা দেশে থাকা বাংলাদেশিরাও তখন কাজ, সময়, ভাষা ও দূরত্ব পেরিয়ে একই আবেগে জড়ো হন। পাসপোর্টে দেশ ভিন্ন হতে পারে, থাকার শহর ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু বিশ্বকাপের রাতে হৃদয়ের এক কোণে নীল-সাদা পতাকাটিই ওড়ে।

এই গ্যালারির টিকিট লাগে না। এখানে আসন নম্বর নেই, নিরাপত্তা তল্লাশি নেই, স্টেডিয়ামের ঘোষকের গলা নেই। কিন্তু আছে পতাকা, জার্সি, বাঁশি, বড় পর্দা, মোবাইল ফোনে লাইভ স্কোর, চায়ের কাপ, আর বুকের ভেতর ঢিপঢিপ করা এক অদ্ভুত উত্তেজনা। আর্জেন্টিনার গোল হলে বাংলাদেশে মানুষ এমনভাবে লাফিয়ে ওঠে, যেন গোলটি ঢাকার কোনো স্টেডিয়ামেই হয়েছে।

২০২৬ বিশ্বকাপ শুরু হতেই সেই পুরোনো দৃশ্য আবার ফিরে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর মাঠে বিশ্বকাপ চলছে, কিন্তু বাংলাদেশে তার প্রতিধ্বনি শোনা যাচ্ছে রাতের পর রাত। আর্জেন্টিনার ম্যাচের দিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে বড় পর্দা, গ্রামের বাজারে টিভির সামনে ভিড়, পাড়া-মহল্লায় জার্সি ও পতাকার উচ্ছ্বাস, সব মিলিয়ে দৃশ্যটি আর শুধু স্থানীয় আবেগের ঘটনা নয়। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমও এখন বাংলাদেশের এই আর্জেন্টিনা প্রেম নিয়ে লিখছে। স্পেনের দৈনিক El País প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে লিখেছে, বাংলাদেশে আর্জেন্টিনা সমর্থকের সংখ্যা আনুমানিক ৭২ মিলিয়ন, অর্থাৎ প্রায় ৭ কোটি ২০ লাখ। মাঠে বাংলাদেশ নেই, কিন্তু আর্জেন্টিনার সমর্থক মানচিত্রে বাংলাদেশ এখন আলাদা রঙে চিহ্নিত।

এই ভালোবাসা অবশ্য ২০২৬ সালের নতুন আবিষ্কার নয়। এর শিকড় অনেক গভীরে। আশির দশকের টেলিভিশন যুগে, যখন স্যাটেলাইট চ্যানেল ছিল না, ইউটিউব ছিল না, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ছিল না, তখন দিয়েগো মারাদোনার বাঁ পায়ের জাদু বাংলার ঘরে ঘরে ঢুকে পড়েছিল। মারাদোনা ছিলেন শুধু ফুটবলার নন, তিনি ছিলেন অসম্ভবকে সম্ভব করার এক রঙিন চরিত্র। ছোট শরীর, বড় সাহস, বাঁ পায়ের তীর, প্রতিপক্ষের দেয়াল ভেঙে একা এগিয়ে যাওয়ার অবিশ্বাস্য ক্ষমতা। বাংলাদেশের মতো সংগ্রামের ইতিহাসবাহী দেশের মানুষের কাছে সেই চরিত্র অচেনা লাগেনি।

১৯৮৬ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে মারাদোনার সেই দৌড় বাংলাদেশের বহু মানুষের মনে এমনভাবে বসে যায় যে, আর্জেন্টিনা হয়ে ওঠে আবেগের দল। কেউ বুঝে সমর্থন করেছে, কেউ না বুঝে বাবার পাশে বসে দেখেছে, কেউ বড় ভাইয়ের উল্লাস দেখে জার্সির রং চিনেছে। ফুটবলে দল বদল করা যায়, কিন্তু শৈশবের দল বদলানো কঠিন। যে শিশু একদিন ঘুম চোখে মারাদোনার গল্প শুনেছে, সে বড় হয়ে মেসির গোল দেখে নিজের ছেলেকে বলে, “এই দলের ইতিহাস আছে।”

তারপর সময় বদলেছে। মারাদোনার যুগ পেরিয়ে একদিন সামনে এলেন লিওনেল মেসি। কিন্তু আবেগের রং বদলায়নি। আকাশি-সাদা জার্সি যেন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে উত্তরাধিকার হয়ে গেছে। বাবা মারাদোনার ভক্ত, ছেলে মেসির। বড় ভাই বাতিস্তুতার নাম জানে, ছোট ভাই চেনে আলভারেস ও এনজো ফার্নান্দেজকে।

২০২৬ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা এসেছে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হিসেবে। গ্রুপ জে-তে তাদের প্রতিপক্ষ আলজেরিয়া, অস্ট্রিয়া ও জর্ডান। প্রথম ম্যাচে আলজেরিয়াকে ৩-০ গোলে হারিয়ে আর্জেন্টিনা দারুণ শুরু করেছে। নিজের ২০০তম আন্তর্জাতিক ম্যাচে লিওনেল মেসি করেছেন হ্যাটট্রিক। বয়স প্রায় ৩৯, কিন্তু তাঁর পায়ে যেন সময়ের হিসাব এখনও পুরোপুরি বসেনি। বিশ্বকাপের মঞ্চে তিনি আবারও প্রমাণ করেছেন, ফুটবলে বয়স কখনও কখনও ক্যালেন্ডারের সংখ্যা, হৃদয়ের নয়।

২২ জুন অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে মেসি আরও এক ইতিহাস লেখেন। আর্জেন্টিনার ২-০ জয়ের ম্যাচে দুটি গোলই আসে তাঁর পা থেকে। প্রথম গোলে তিনি মিরোস্লাভ ক্লোসের ১৬ গোলের দীর্ঘদিনের রেকর্ড পেরিয়ে যান, আর দ্বিতীয় গোলে বিশ্বকাপে নিজের গোলসংখ্যা নিয়ে যান ১৮-তে। মেসি এখন আর শুধু শীর্ষে নন, শীর্ষস্থানটিকে নিজের মতো করে আরও একটু দূরে সরিয়ে দিচ্ছেন। তাঁর এই নতুন উচ্চতায় ওঠার মুহূর্ত শুধু আর্জেন্টিনার ছিল না। বাংলাদেশেও বহু চোখে তখন এক ধরনের ব্যক্তিগত আনন্দ। যেন কোনো আপনজন পরীক্ষায় প্রথম হওয়ার পর আরও একটি সাফল্যের খবর পাঠিয়েছে। এমন আবেগের ব্যাখ্যা ফুটবলের পরিসংখ্যান দিয়ে পুরোপুরি করা যায় না।

২০২২ বিশ্বকাপের সময় বাংলাদেশের আর্জেন্টিনা সমর্থকদের উল্লাস, পতাকা, মিছিল ও বড় পর্দায় খেলা দেখার দৃশ্য বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। আর্জেন্টিনার মানুষও বিস্মিত হয়েছিল। এত দূরের একটি দেশ, ভাষা আলাদা, খাদ্যাভ্যাস আলাদা, ইতিহাস আলাদা, তবু কী বিপুল ভালোবাসা! সেই আবেগ দুই দেশের সম্পর্কে এক ধরনের নতুন উষ্ণতা এনে দেয়। ২০২৩ সালে আর্জেন্টিনা ৪৫ বছর পর ঢাকায় তাদের দূতাবাস পুনরায় চালু করে।

বিশ্বকাপে বাংলাদেশ নেই, কিন্তু বিশ্বকাপ বাংলাদেশের ভেতরে আছে। আর্জেন্টিনা সেই ভেতরের বিশ্বকাপের সবচেয়ে উজ্জ্বল চরিত্রগুলোর একটি। আর্জেন্টিনার জন্য বাংলাদেশের ভালোবাসা তাই শুধু ফুটবল সমর্থনের গল্প নয়; এটি আত্মীয়তার গল্প।


Back to top button
🌐 Read in Your Language