
বিশ্ব ফুটবলে মোহাম্মদ সালাহর নাম উচ্চারিত হলে চোখের সামনে ভেসে ওঠে দ্রুতগতির এক ফুটবলার, বাঁ পায়ের নিখুঁত শট, গোলের পর পরিচিত সিজদা আর অ্যানফিল্ডের গ্যালারিতে হাজার মানুষের গর্জন। কিন্তু এই ঝলমলে ছবির পেছনে আছে মিশরের এক গ্রামের ধুলোমাখা সকাল, দীর্ঘ পথের ক্লান্তি, কিশোর বয়সের অনিশ্চয়তা এবং নিজের ওপর অটল বিশ্বাসের এক দীর্ঘ পথচলার গল্প।
নাইল ডেল্টার ছোট্ট গ্রাম নাগরিগ। সেখানেই সালাহর শৈশব। বড় শহরের আলো, আধুনিক একাডেমি, উন্নত প্রশিক্ষণ সুবিধা, এসব কিছু তাঁর নাগালের মধ্যে ছিল না। ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন দেখতে হলে তাঁকে প্রথমে জিততে হয়েছে দূরত্বের সঙ্গে। কিশোর সালাহকে প্রশিক্ষণে যেতে হতো ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাসে চেপে। এক জায়গা থেকে আরেক জায়গা, এক বাস থেকে আরেক বাস, গ্রামের পথ পেরিয়ে শহরের দিকে। অনেকের কাছে যে পথ ক্লান্তির, সালাহর কাছে সেটিই ছিল স্বপ্নের দিকে এগিয়ে যাওয়ার রাস্তা।
সেই বয়সে অনেক শিশু স্কুল শেষে খেলতে যায় আনন্দের জন্য। সালাহ খেলতে যেতেন জীবনের জন্য। দিনের বড় অংশ চলে যেত যাতায়াতে, প্রশিক্ষণে, আবার বাড়ি ফেরার পথে। তবু তিনি থামেননি। কারণ তিনি জানতেন, তাঁর পায়ের গতি যদি একদিন তাঁকে গ্রামের মাঠ থেকে বড় মঞ্চে নিয়ে যেতে পারে, তবে এই কষ্ট বৃথা যাবে না।
মোহাম্মদ সালাহ হামেদ মাহরুস ঘালি ১৯৯২ সালের ১৫ জুন মিশরের গারবিয়া প্রদেশের নাগরিগ এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন। ছোটবেলা থেকেই ফুটবল ছিল তাঁর নেশা। গ্রামীণ জীবনের সাধারণ পরিবেশে বড় হওয়া সালাহ টেলিভিশনে বড় তারকাদের খেলা দেখতেন, তাঁদের অনুকরণ করতেন, আবার নিজের মতো করে মাঠে দৌড়াতেন। ব্রাজিলের রোনালদো, জিনেদিন জিদান, এদের খেলা তাঁর কিশোর মনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল।
স্থানীয় পর্যায়ে খেলা দিয়ে শুরু হলেও সালাহর ফুটবল জীবনের ভিত গড়ে ওঠে আরব কন্ট্রাক্টরস ক্লাবে। ক্লাবটির যুবদল পেরিয়ে ২০১০ সালে তিনি মিশরীয় প্রিমিয়ার লিগে মূল দলের হয়ে খেলার সুযোগ পান। তখনও তিনি আন্তর্জাতিক ফুটবলের তারকা নন, ইউরোপের বড় ক্লাবগুলোর পরিচিত মুখ নন। কিন্তু তাঁর গতি, বল নিয়ন্ত্রণ, বাঁ পায়ের তীক্ষ্ণতা এবং গোলের সামনে সাহস ধীরে ধীরে নজর কাড়তে শুরু করে।
২০১২ সালে সালাহ পাড়ি জমান ইউরোপে। সুইজারল্যান্ডের ক্লাব বাসেল তাঁকে দলে নেয়। অনেক ফুটবলারের জন্য ইউরোপে যাওয়া মানেই স্বপ্নপূরণ। কিন্তু সালাহর জন্য সেটি ছিল নতুন লড়াইয়ের শুরু। ভাষা আলাদা, সংস্কৃতি আলাদা, খেলার গতি আলাদা, আবহাওয়া আলাদা। মিশরের গ্রাম থেকে উঠে আসা এক তরুণকে হঠাৎ ইউরোপীয় ফুটবলের শৃঙ্খলা, কৌশল ও চাপের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে হয়। সালাহ সেটিই করেন। বাসেলে তাঁর পারফরম্যান্স তাঁকে ইউরোপের নজরে আনে।
এরপর আসে চেলসি অধ্যায়। ২০১৪ সালে ইংল্যান্ডের বড় ক্লাব চেলসিতে যোগ দেন সালাহ। মিশরের একজন তরুণ ফুটবলারের জন্য এটি ছিল বিশাল ঘটনা। কিন্তু বড় ক্লাবে ঢুকলেই বড় তারকা হয়ে যাওয়া যায় না। চেলসিতে সালাহ পর্যাপ্ত সুযোগ পাননি।
এরপর তিনি ইতালিতে যান। প্রথমে ফিওরেন্টিনা, পরে রোমা। ইতালির ফুটবল তাঁকে নতুন করে গড়ে তোলে। তাঁর দৌড়ের সঙ্গে যুক্ত হয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা, গোলের সামনে ঠান্ডা মাথা এবং সতীর্থকে ব্যবহার করার দক্ষতা।
২০১৭ সালে লিভারপুল তাঁকে দলে নেয়। এরপর শুরু হয় সালাহর জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়। অ্যানফিল্ডে এসে তিনি যেন নিজের পূর্ণ রূপে ফুটে ওঠেন। জার্গেন ক্লপের আক্রমণাত্মক ফুটবলে সালাহর গতি ও গোল করার ক্ষমতা অসাধারণ রূপ নেয়। প্রথম মৌসুমেই তিনি প্রিমিয়ার লিগে ৩২টি গোল করেন, যা ৩৮ ম্যাচের মৌসুমে এক রেকর্ড। তিনি হয়ে ওঠেন লিভারপুলের অন্যতম মুখ, মিশরের গর্ব, আর বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম বড় তারকা।
মিশরের জাতীয় দলের ক্ষেত্রেও সালাহ শুধু একজন খেলোয়াড় নন, এক জাতির আশা। ২০১৮ বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ গোলেই বহু বছরের অপেক্ষার পর মিশর বিশ্বকাপে ফেরার সুযোগ পায়। দেশের মানুষের চোখে তখন সালাহ ছিলেন শুধু তারকা নন, স্বপ্নের বাহক। মিশরের জার্সিতে তিনি যখন মাঠে নামেন, তখন শুধু একজন ফরোয়ার্ড খেলেন না; তাঁর সঙ্গে মাঠে নামে লাখো মানুষের গর্ব, প্রত্যাশা এবং ভালোবাসা।
এই প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত ২০২৬ বিশ্বকাপেও সালাহ মিশরের ভরসার জায়গায় রয়েছেন। বেলজিয়ামের সঙ্গে ড্র দিয়ে শুরু করা মিশর নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে জয়ে নতুন আত্মবিশ্বাস পায়। সেই ম্যাচে সালাহ গোল করেন, সতীর্থের গোলে সহায়তা করেন এবং আবারও দেখান, বড় মঞ্চে তাঁর উপস্থিতি এখনও মিশরের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
সালাহর জনপ্রিয়তা মাঠের পারফরম্যান্সের বাইরেও ছড়িয়ে আছে। তাঁর বিনয়, ধর্মীয় পরিচয়ের স্বাভাবিক প্রকাশ, পরিবারের প্রতি মমতা এবং নিজের গ্রামের প্রতি দায়বদ্ধতা তাঁকে আলাদা মর্যাদা দিয়েছে। নিজের এলাকা ও মানুষের কল্যাণে বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগে তাঁর সহায়তার কথা মিশরে বারবার আলোচিত হয়েছে। বিশ্বতারকা হয়েও নিজের শিকড়ের সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখার এই গুণ তাঁকে সাধারণ মানুষের আরও কাছের মানুষ করে তুলেছে।
তথ্যসূত্র:
দ্য গার্ডিয়ান (১৪ জুন, ২০২৬)
ব্রিটানিকা (১৯ জুন, ২০২৬)









