
মারুফ ছোটবেলা থেকেই বাবার কাছে একটি সাইকেল চাইত। তার বন্ধুদের প্রায় সবারই সাইকেল ছিল। বিকেল হলেই তারা পাড়ার গলিতে ঘণ্টি বাজিয়ে ছুটে বেড়াত। কেউ হাত ছেড়ে চালাত, কেউ মোড় নিত, কেউ স্কুলের মাঠ ঘুরে এসে গল্প করত। মারুফ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখত। বুকের ভেতর তখন ছোট্ট একটা কষ্ট ধীরে ধীরে জমে উঠত।
প্রাথমিকের শেষ পরীক্ষার আগে একদিন সাহস করে বাবাকে বলেছিল, “আব্বা, আমাকে একটা সাইকেল কিনে দাও।”
আনিসুর রহমান ছেলের মাথায় হাত রেখে বলেছিলেন, “আগে মন দিয়ে লেখাপড়া করো, তারপর দেখা যাবে।”
মারুফ সেই কথাটুকু বুকের ভেতর সযতনে রেখে দিল। সে মন দিয়ে পড়তে লাগল। রাতে মা মমতা বেগম যখন দুধের গ্লাস নিয়ে আসতেন, সে প্রশ্ন করত, “আম্মা, আব্বা কি সত্যি সত্যি আমাকে সাইকেল কিনে দেবে?”
মা হাসতেন। মাথায় হাত বুলিয়ে বলতেন, “পরীক্ষাটা ভালোভাবে আগে দে, তোর আব্বা খুশি হলে অবশ্যই পেয়ে যেতে পারিস।”
ফল বের হলো। মারুফ ভালো ফল করল। বাড়িতে মিষ্টি এল, আত্মীয়স্বজন ফোন করল, মা বারবার ছেলের কপালে চুমু খেলেন। মারুফ সারাদিন বাবার অপেক্ষায় রইল।
সন্ধ্যায় আনিসুর রহমান বাড়ি ফিরলেন। মারুফ দৌড়ে গেল। বাবা পুরস্কার হিসেবে তার হাতে তুলে দিলেন সুন্দর মলাটের একটি বই।
বাবা বললেন, “এ বই তোমার পথ চিনতে সাহায্য করবে। সাইকেল পরে হবে।”
মারুফ বইটি নিল, কিন্তু তার মুখ শুকিয়ে গেল। সে কিছু বলল না। ছোটদের অভিমান অনেক সময় শব্দ খুঁজে পায় না। শুধু বুকের ভেতর চুপচাপ বসে থাকে।
সময় কেটে যায়। বছর ঘুরে পরীক্ষা আসে, ফল ভালো হয়, আর পুরস্কার হিসেবে বাবার হাতে বই ছাড়া আর কিছু ওঠে না। তিনি প্রতিবারই বই নিয়ে আসেন। মারুফের বন্ধুদের প্রায় সবাই তখন সাইকেলে চড়ে স্কুলে যায়। তাদের দেখে মারুফেরও খুব ইচ্ছে হয়। কিন্তু সে কাউকে কিছু বলে না। মনে মনে শুধু ভাবে, একদিন তারও একটা সাইকেল হবে।
হাইস্কুলের শেষ পরীক্ষার আগে সে আবার বাবার কাছে গেল। “আব্বা, এবার পরীক্ষা শেষে আমাকে সাইকেল কিনে দিতে হবে।”
আনিসুর রহমান ছেলের দিকে তাকিয়ে একটু হাসলেন। মাথায় হাত দিয়ে বললেন, “হবে, আগে ভালো করে পরীক্ষা দাও। নিজেকে আরও একটু গড়ে তোলো।”
মারুফ মন দিয়ে পড়ে, আর ভেতরে ভেতরে সাইকেলের স্বপ্ন দেখে। ফল বের হলো। সে মেধাতালিকায় প্রথম হয়েছে। বাড়িতে আনন্দ আর আনন্দ। মা মমতা বেগম বারবার আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলেন। সন্ধ্যায় বাবা কাজ থেকে ফিরলেন। তাঁর হাতে মিষ্টির প্যাকেট, সঙ্গে কয়েকটি বই।
মারুফের মুখের রং পাল্টে গেল। সে বইগুলো হাতে নিল, কিন্তু ভেতরে ভেতরে যেন আগুন ধরে গেল। তার মনে হলো, বাবা তাকে বোঝেন না। তার ইচ্ছা, তার লজ্জা, বন্ধুদের সামনে তার অস্বস্তি, কিছুই তিনি বোঝেন না। বাবা শুধু বই আর বই বোঝেন।
কলেজে ওঠার পর মারুফ আর সাইকেলের কথা ভাবত না। সে বড় হয়েছে। তার স্বপ্নও বদলে গেছে। এখন তার স্বপ্ন শুধু ভালো ফল করে নিজের জীবনটা নিজের মতো করে গুছিয়ে নেওয়া। তবু বুকের এক কোণে বাবার প্রতি পুরোনো অভিমানটা রয়ে যায়।
কলেজ শেষ হলো। তারপর বিশ্ববিদ্যালয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মারুফ নিজের পড়াশোনায় আরও মন দিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিন বাড়িতে উৎসবের মতো পরিবেশ। আত্মীয়স্বজন এলেন। মা মমতা বেগম রান্নাঘর আর বসার ঘরের মাঝখানে বারবার ছুটছেন। আনিসুর রহমানের চোখে গর্বের আলো। তিনি চুপচাপ ছেলের দিকে তাকিয়ে আছেন। যেন অনেক বছরের কোনো অপেক্ষা আজ পূর্ণ হয়েছে।
রাতের খাবারের পর বাবা তাকে নিজের ঘরে ডাকলেন। ব্যাগ থেকে একটি মোটা বই বের করলেন। বইটি সুন্দর করে বাঁধানো। মলাটে সোনালি অক্ষর। তিনি বইটি ছেলের হাতে দিতে চাইলেন।
“এটি তোমার জন্য,” বাবা বললেন।
বই দেখে মারুফের চোখে যেন আগুন জ্বলে উঠল। সে বইটি হাতে নিল না। ঠান্ডা গলায় বলল, ”আমার কিছু লাগবে না” তারপর আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
আনিসুর রহমান কিছু বলতে চাইলেন। কিন্তু মারুফ তাঁকে আর সুযোগ দিল না। সেই রাতেই সে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে গেল।
মা দরজায় দাঁড়িয়ে কাঁদলেন। বাবা দরজার কাছে এসে দাঁড়িয়েছিলেন, কিন্তু ছেলেকে ডাকলেন না। হয়তো ভেবেছিলেন, কোনো বন্ধুর বাসায় গেছে, রাগ কমলে ফিরবে। কিন্তু সে রাতে মারুফ আর ফিরল না। পরদিনও না। যে জায়গাগুলোতে তার যাওয়ার কথা, সবখানে খোঁজ নেওয়া হলো। কেউ কোনো খবর দিতে পারল না।
মারুফ প্রথমে নিজের শহর ছেড়ে দূরের এক শহরে চলে যায়। সেখানে গিয়ে নিজের পরিচয় নিজেই গড়তে থাকে। কয়েক বছর পর বিদেশি একটি কোম্পানিতে সুযোগ পেয়ে জাপানে পাড়ি জমায়। তারপর শুরু হয় আরেক জীবন। কাজ, ব্যস্ততা, সাফল্য, সবই ধীরে ধীরে তার জীবনে জায়গা করে নেয়। একসময় সে প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু দেশ ও পরিবারের সঙ্গে তার যে দূরত্ব তৈরি হয়, তা আর ঘোচে না। আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব কেউ তার কোনো সন্ধান জানে না। মারুফ কোথায় আছে, কেমন আছে, কেউ ঠিক বলতে পারে না।
অভিমান মানুষের বুকের ভেতর কখনও কখনও পাথরের মতো জমে যায়। বাইরে থেকে মানুষ বড় হয়, কিন্তু ভেতরে আটকে থাকে সেই ছোট ছেলেটি, যে একদিন সাইকেলের অপেক্ষায় ছিল।
বহু বছর পর একদিন মারুফ জানতে পারল, তার পুরোনো স্কুলে পুনর্মিলনী অনুষ্ঠান হচ্ছে। খবরটি দেখে তার বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা টান লাগল। সে কাউকে না জানিয়ে দেশে ফিরল। ভেবেছিল, সবাইকে চমকে দেবে।
স্কুলের মাঠে সেদিন উৎসব। পুরোনো বন্ধুরা কেউ ব্যবসায়ী, কেউ শিক্ষক, কেউ ডাক্তার, কেউ প্রবাসী। সবাই তাকে দেখে অবাক। হাসি, গল্প, ছবি, স্মৃতি, কত কথা। কেউ বলল, “তুই তো হারিয়ে গিয়েছিলি।” মারুফ সবার কথা শুধু হেসে হেসে এড়িয়ে গেল।
কিন্তু সন্ধ্যার পর আর নিজেকে সামলাতে পারল না। তার পা নিজেই তাকে নিয়ে গেল পুরোনো বাড়ির সামনে। উঠোনের একপাশে যে আমগাছটার নিচে সে ছোটবেলায় খেলত, সেটি এখন অনেক বড়। কিন্তু বাড়িটা যেন ছোট হয়ে গেছে। মানুষ বড় হয়ে গেলে শৈশবের বাড়িগুলোকে মনে হয় ছোট লাগে।
বাড়ির ফটকে মরচে পড়েছে। বারান্দার গ্রিলে ধুলো। দরজায় বড় একটি তালা। মারুফ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রইল।
ফটকের শব্দ শুনে পাশের বাড়ি থেকে একজন বৃদ্ধ বেরিয়ে এলেন। হাতে লাঠি। চোখে মোটা চশমা। তিনি কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন। তারপর হঠাৎ কাঁপা গলায় বললেন, “মারুফ?”
মারুফ তাকিয়ে রইল।“ওয়াহেদ আঙ্কেল?”
বৃদ্ধ মানুষটি এগিয়ে এসে তাকে জড়িয়ে ধরলেন। “তোমাকে দেখার জন্যই বোধহয় আল্লাহ আমাকে এতদিন বাঁচিয়ে রেখেছেন।”
মারুফের বুকের ভেতর কেমন যেন হলো।
ওয়াহেদ আঙ্কেল ধীরে ধীরে বলতে লাগলেন, “তোমার আব্বা-আম্মা কেউ আর নেই বাবা। অনেক বছর হলো দুজনেই চলে গেছেন। তুমি চলে যাওয়ার পর তোমার মা আর আগের মতো ছিলেন না। সারাক্ষণ দরজার দিকে তাকিয়ে থাকতেন। শেষ দিকে অসুস্থ হয়ে পড়লেন। হাসপাতালে নেওয়া হলো, কিন্তু আর ফিরলেন না।”
ওয়াহেদ আঙ্কেল পকেট থেকে একটি চাবি বের করলেন। “তোমার আব্বা হজে যাওয়ার আগে আমার হাতে চাবিটা দিয়ে বলেছিলেন, মারুফ যদি কোনোদিন ফিরে আসে, তাকে দিয়ে দিও। তোমার আব্বা আর হজ থেকে ফিরে আসেননি। খবর এসেছিল, তিনি মক্কাতেই ইন্তেকাল করেছেন। সেখানেই তাঁকে দাফন করা হয়েছে।”
দরজা খুলতেই ভেতর থেকে বন্ধ ঘরের গুমোট গন্ধ বেরিয়ে এল। ধুলো, পুরোনো কাঠ, অব্যবহৃত ঘরের নিঃশ্বাস। মারুফ ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকল।
বসার ঘরের সোফায় ধুলো জমেছে। যে টেবিলে বসে সে একসময় পড়ত, তার ওপর এখন মাকড়সার জাল। দেয়ালে বাবার পুরোনো ঘড়িটি বন্ধ হয়ে আছে। সময় যেন একদিন হঠাৎ থেমে গেছে। কোণের আলমারির ওপর মায়ের প্রিয় ফুলদানিটি পড়ে আছে, ফুল নেই, শুধু স্মৃতি আছে। দেয়ালে ঝোলানো একটি পারিবারিক ছবিতে ধুলো জমে মুখগুলো ঝাপসা হয়ে গেছে। তবু মারুফ চিনতে পারল। বাবা, মা, আর মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা সে।
এক ঘর থেকে আরেক ঘরে যেতে যেতে তার বুক ভারী হয়ে উঠল। মায়ের ঘরে ভাঁজ করে রাখা জায়নামাজ। বাবার টেবিলে পুরোনো কলম। সবকিছু যেন অপেক্ষা করতে করতে ক্লান্ত হয়ে গেছে। একসময় তার চোখ গেল বুকশেলফের দিকে। সেই বুকশেলফ।
যেটাকে সে একসময় ঘৃণা করতে শুরু করেছিল। দেখতে পেলো বুকশেলফের মাঝের তাকে সুন্দর করে রাখা আছে সেই মোটা বইটি। বাবার দেওয়া শেষ উপহার। যেটি সে সেদিন হাতে নেয়নি।
মারুফের চোখ আটকে গেল। তার মনে হলো, বইটি এত বছর ধরে যেন তাকিয়েই ছিল দরজার দিকে। অপেক্ষা করছিল, কখন সে ফিরবে। কাঁপা হাতে সে বইটি নামাল। ধুলো মুছল। তারপর মলাট ওল্টাতেই একটি খাম মেঝেতে পড়ে গেল।
মারুফ ঝুঁকে খামটি তুলল। খামের ভেতরে ছিল একটি চেক আর বাবার হাতে লেখা ছোট্ট একটি চিঠি। সে চিঠি খুলল।
“বাবা মারুফ,
আজ তুমি পেরেছ। আমি জানতাম, তুমি পারবে।
তুমি শুধু পরীক্ষায় ভালো করোনি, আমার স্বপ্নও পূরণ করেছ। আমাদের পরিবারের মুখ উজ্জ্বল করেছ।
সারা জীবন তোমার জন্য একটু একটু করে সঞ্চয় করেছি। সেই সঞ্চয়ের সত্তর লাখ টাকার চেকটি তোমার জন্য রাখলাম।
তোমার মুখের আনন্দ দেখার অপেক্ষায় থাকলাম।
ইতি,
তোমার আব্বা”
চিঠির শেষ লাইনটি পড়ার পর মারুফ আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। বুকশেলফের সামনে মেঝেতে বসে পড়ল।
কত বছর ধরে সে ভেবেছে, বাবা তার স্বপ্ন বোঝেননি। বাবার দেওয়া প্রতিটি বইকে সে অভাব, অবহেলা আর না-বোঝার চিহ্ন ভেবেছে। অথচ বাবা ঠিক সময়ের অপেক্ষা করেছিলেন। সন্তানের জন্য জীবনভর একটু একটু করে সঞ্চয় করেছিলেন।
মারুফ কাঁদতে লাগল। বুক ফেটে যাওয়া সেই কান্না শোনার কেউ নেই। মা নেই, বাবা নেই। ঘর আছে, ধুলো আছে, বুকশেলফ আছে, বই আছে। আর আছে এমন এক ভালোবাসা, যার দরজা খুলতে তার এত বছর লেগে গেল।
সেই রাতে প্রথমবার মারুফ বুঝল, সব বাবা মুখে ভালোবাসা বলতে পারেন না। দেখাতেও পারেন না। কেউ কেউ সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য নিজের ইচ্ছা, আরাম, আনন্দ সব গোপনে জমিয়ে রাখেন। কেউ কেউ দরজার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে করতে চলে যান।
মারুফ আরও বুঝল, বাবা তাকে শুধু বই দেননি। প্রতিটি বইয়ের ভেতর তিনি রেখে গিয়েছিলেন পথ চিনে নেওয়ার আলো। যে আলো একদিন মানুষকে নিজের গন্তব্যের দিকে নিয়ে যায়। কিন্তু সেই আলো চিনতে মারুফের অনেক বছর লেগে গেল।
সন্তানেরা বাবাকে অনেক সময় খুব দেরিতে বুঝে।
(গল্পটি ইংরেজিভাষী দুনিয়ায় প্রচলিত একটি অনুপ্রেরণামূলক গল্পের ছায়া অবলম্বনে রচিত। বাংলাভাষী পাঠকের জন্য চরিত্রের নাম, স্থান ও কিছু দৃশ্যবিন্যাস পরিবর্তিত।)
এনএন/ ২১ জুন ২০২৬









