সম্পাদকের পাতা

ইউটিউব থেকে যার মাসিক আয় প্রায় ২.২৯ মিলিয়ন ডলার

নজরুল মিন্টো

প্রতিদিন পৃথিবীর নানা প্রান্তে কোটি কোটি মানুষ ইউটিউব খুলে। কেউ গান শোনে, কেউ খবর দেখে, কেউ রান্না শেখে, কেউ ফুটবল, কেউ ভ্রমণ, কেউ আবার নিছক বিনোদনের জন্য স্ক্রিনে চোখ রাখে। সেই বিশাল ডিজিটাল জগতে একজন তরুণ এমন এক সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন, যার আয়, প্রভাব ও দর্শকসংখ্যা এখন অনেক টেলিভিশন নেটওয়ার্ককেও লজ্জায় ফেলে দিতে পারে। তিনি জিমি ডোনাল্ডসন। বিশ্ব তাঁকে চেনে মিস্টার বিস্ট নামে। ২০২৬ সালের ১২ জুন তিনি প্রথম স্বতন্ত্র কনটেন্ট নির্মাতা হিসেবে ৫০ কোটি সাবস্ক্রাইবারের মাইলফলক স্পর্শ করেন। শুধু ইউটিউব বিজ্ঞাপন থেকেই তাঁর মাসিক আয় প্রায় ২.২৯ মিলিয়ন ডলার।

ইউটিউবের ইতিহাসে একসময় ১০ লাখ সাবস্ক্রাইবারই ছিল বড় অর্জন। পরে ১ কোটি, ১০ কোটি, এমনকি ২০ কোটি সাবস্ক্রাইবারের সীমাও বিস্ময় জাগিয়েছে। কিন্তু মিস্টার বিস্ট সেই হিসাবকে আরও দূরে নিয়ে গেলেন। তাঁর ৫০ কোটি সাবস্ক্রাইবারের মাইলফলক শুধু সংখ্যা নয়, সময়েরও একটি ঘটনা। কারণ এই সংখ্যা বলে দেয়, নতুন যুগে তারকা তৈরির মঞ্চ বদলে গেছে। এখন একটি ঘর, একটি ক্যামেরা, একটি অদ্ভুত আইডিয়া এবং দর্শকের মন বোঝার ক্ষমতাই কাউকে বিশ্বজোড়া পরিচিতির শিখরে পৌঁছে দিতে পারে।

এই অর্জনকে স্মরণীয় করে রাখতে ইউটিউব কর্তৃপক্ষও তাঁকে দিয়েছে বিশেষ সম্মান। ইউটিউবের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নীল মোহন মিস্টার বিস্টের হাতে তুলে দেন বিশেষভাবে তৈরি ৫০০ মিলিয়ন প্লে বাটন। প্রচলিত সিলভার, গোল্ড, ডায়মন্ড কিংবা রেড ডায়মন্ড প্লে বাটনের বাইরে এটি ছিল আলাদা নকশার একটি সম্মাননা। এতে মিস্টার বিস্টের পরিচিত Beast Panther লোগো এবং তাঁর ব্র্যান্ডের নীল-লাল রঙের ছাপ রাখা হয়। সংখ্যার সঙ্গে সম্মাননার এই দৃশ্যও যেন বলে দিল, ইউটিউবের ইতিহাসে এই মাইলফলক সাধারণ কোনো অর্জন নয়।

এই বিশালতার আড়ালে মানুষটি কে? মিস্টার বিস্টের আসল নাম জেমস স্টিফেন ডোনাল্ডসন। জন্ম ১৯৯৮ সালের ৭ মে, যুক্তরাষ্ট্রের কানসাসের উইচিটায়। বেড়ে ওঠা নর্থ ক্যারোলাইনার গ্রিনভিল এলাকায়। বয়সে তিনি এখনও তরুণ, কিন্তু তাঁর কাজের পরিধি এখন অনেক প্রতিষ্ঠিত মিডিয়া ব্যক্তিত্বের কল্পনাকেও ছাড়িয়ে গেছে। আজকের এই বিস্ময়কর অবস্থানের শুরু ছিল একেবারে সাধারণ।

২০১২ সালে মাত্র ১৩ বছর বয়সে জিমি ডোনাল্ডসন ইউটিউব চ্যানেল খুলেছিলেন। তখন তাঁর নাম ছিল MrBeast6000। শুরুতে ছিল গেমিং ভিডিও, ইউটিউবারদের আয় নিয়ে বিশ্লেষণ, ছোট ছোট অদ্ভুত পরীক্ষা। শুধু কৌতূহল। মানুষ কী দেখে? কেন দেখে? কোথায় ভিডিও বন্ধ করে দেয়? কোন শিরোনামে চোখ আটকে যায়? কোন দৃশ্যের পর দর্শক আর স্ক্রল করে চলে যেতে পারে না? কিশোর জিমি যেন এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই ইউটিউবকে নিজের পরীক্ষাগার বানিয়ে ফেলেছিলেন।

প্রথম দিকে তাঁর ভিডিও তেমন দেখা হতো না। অনলাইনের বিশাল ভিড়ে অনেক ভিডিওই হারিয়ে যেত। কিন্তু জিমির একটি গুণ ছিল, তিনি থামেননি। ব্যর্থ ভিডিওর পরেও আরেকটি ভিডিও বানিয়েছেন। কম ভিউয়ের পরেও নতুন কৌশল ভেবেছেন। অন্যরা যেখানে দর্শকের অভাবকে হতাশার কারণ ভাবত, তিনি সেটিকে গবেষণার উপাদান বানিয়েছেন।

২০১৭ সালে তাঁর একটি ভিডিও হঠাৎ আলোচনায় আসে। সেখানে তিনি শূন্য থেকে এক লাখ পর্যন্ত গুনেছিলেন। ধারণাটি অদ্ভুত, সময়সাপেক্ষ, কিছুটা পাগলামির মতো। কিন্তু সেই অস্বাভাবিক চেষ্টাই তাঁকে আলাদা করে দিল। দর্শক বুঝল, এই নির্মাতা সাধারণ নিয়মে চলবেন না। তিনি এমন কিছু করবেন, যা বড়, অদ্ভুত এবং শেষ পর্যন্ত দেখার মতো।

মিস্টার বিস্টের প্রথম বড় স্পনসরশিপের গল্পটিও তাঁর চরিত্র বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ২০১৭ সালের দিকে তিনি ১০ হাজার ডলারের একটি স্পনসরশিপ পান। সাধারণত একজন নতুন নির্মাতা এমন টাকা পেলে নিজের যন্ত্রপাতি কিনতেন, ব্যক্তিগত প্রয়োজনে খরচ করতেন, কিংবা ভবিষ্যতের জন্য জমিয়ে রাখতেন। কিন্তু জিমি সেই টাকা একজন গৃহহীন মানুষকে দিয়ে ভিডিও বানালেন। সেখানেই তিনি বুঝলেন, দান, বিস্ময়, আবেগ ও বিনোদন একসঙ্গে মিশলে ডিজিটাল দুনিয়ায় নতুন ভাষা তৈরি হয়।

এরপর মিস্টার বিস্ট তাঁর ভিডিওকে শুধু ভিডিও রাখলেন না; তিনি সেটিকে ঘটনায় পরিণত করলেন। কখনও প্রতিযোগিতা, কখনও বিপুল পুরস্কার, কখনও বাড়ি-গাড়ি দেওয়া, কখনও মানুষকে সাহায্য, কখনও বিশাল সেটে নির্মিত বিনোদন। তাঁর ভিডিওতে শুরু থেকেই থাকে টান। দর্শক ভাবতে থাকে, এবার কী হবে? কে জিতবে? সত্যিই কি এত টাকা দেওয়া হবে? এই কৌতূহলই তাঁর কনটেন্টের ইঞ্জিন।

২০২১ সালে তাঁর “Squid Game” অনুপ্রাণিত বাস্তবধর্মী প্রতিযোগিতার ভিডিওটি বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তোলে। ভিডিওটি বুঝিয়ে দেয়, ইউটিউব আর শুধু ঘরে বসে বানানো ভিডিওর জায়গা নয়; চাইলে এখানেই তৈরি করা যায় বিশ্বমানের বিনোদন। মিস্টার বিস্টের সাফল্যের রহস্যও এখানেই। তিনি ইউটিউবকে টেলিভিশনের অনুকরণে ব্যবহার করেননি; বরং ইউটিউবের নিজস্ব ভাষা বুঝেছেন। প্রথম কয়েক সেকেন্ডে দর্শককে ধরে রাখা, দৃশ্যের পর দৃশ্যে কৌতূহল বাড়ানো এবং শেষ পর্যন্ত চোখ আটকে রাখার কৌশলই তাঁর কনটেন্টকে আলাদা করেছে।

এই অঙ্কের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ব্যবসা। মিস্টার বিস্টের প্রতিষ্ঠান Beast Industries ২০২৪ সালে ৪৭৩ মিলিয়ন ডলার রাজস্ব করেছে। তার আগের বছর রাজস্ব ছিল ২২১ মিলিয়ন ডলার। তাঁর মিডিয়া ব্যবসা, যেখানে ইউটিউব চ্যানেল ও Amazon Prime Video-এর Beast Games যুক্ত, ২০২৪ সালে ২২৬ মিলিয়ন ডলার রাজস্ব এনেছে। তবে এই বিশাল আয়ের পেছনে খরচও বিপুল। তাঁর অনেক ভিডিও এখন ছোটখাটো সিনেমার বাজেট ও প্রস্তুতি নিয়ে তৈরি হয়।

এই বিস্তারের ভেতরেই মিস্টার বিস্টের আসল রূপটি দেখা যায়। তিনি শুধু ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানো একজন মানুষ নন। তিনি একসঙ্গে কনটেন্ট নির্মাতা, ব্র্যান্ড নির্মাতা, উদ্যোক্তা এবং দর্শকের মনোযোগকে অর্থনীতিতে রূপ দেওয়ার এক বিরল কারিগর।

তবে তাঁর আয়ের গল্পে আরেকটি অদ্ভুত দিক আছে। অনেকেই ভাবেন, এত আয় মানে নিশ্চয়ই ব্যক্তিগত বিলাসের জীবন। কিন্তু মিস্টার বিস্ট নিজে বারবার বলেছেন, তিনি আয় করা অর্থের বড় অংশ আবার ভিডিও ও ব্যবসায় ঢেলে দেন। অর্থ আসে, তারপর সেই অর্থ দিয়ে আরও বড় ভিডিও হয়। বড় ভিডিও আরও বেশি দর্শক আনে। বেশি দর্শক আরও বড় স্পনসর আনে। সেই স্পনসর ও দর্শক তাঁর পণ্যের বাজার বাড়ায়। এই চক্রটাই তাঁকে সাধারণ ইউটিউবার থেকে ডিজিটাল যুগের এক বড় ব্যবসায়ী চরিত্রে পরিণত করেছে।

মিস্টার বিস্টকে শুধু বড় পুরস্কারের ইউটিউবার বললে ভুল হবে। তাঁর জনপ্রিয়তার আরেকটি বড় স্তম্ভ হলো দান ও মানবিক উদ্যোগ। তিনি অর্থ বিলিয়েছেন, খাবার দিয়েছেন, বাড়ি বানিয়েছেন, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করেছেন, চোখের চিকিৎসা থেকে শুরু করে নানা ধরনের সহায়তায় যুক্ত হয়েছেন। Beast Philanthropy নামে তাঁর একটি আলাদা দাতব্য উদ্যোগও আছে। সেখানে কনটেন্ট এবং কল্যাণ একসঙ্গে হাঁটে।

মিস্টার বিস্টের সবচেয়ে আলোচিত উদ্যোগগুলোর মধ্যে আছে #TeamTrees, #TeamSeas এবং #TeamWater। #TeamTrees প্রচারণায় আড়াই কোটির বেশি গাছ লাগানোর জন্য অর্থ সংগ্রহ করা হয়। #TeamSeas উদ্যোগে সমুদ্র, নদী ও সৈকত থেকে আবর্জনা সরানোর কাজে বড় অঙ্কের তহবিল ওঠে। পরে #TeamWater প্রচারণায় বিশুদ্ধ পানির জন্য অর্থ সংগ্রহ করা হয়। এসব উদ্যোগে তিনি একা ছিলেন না। তাঁর সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন বিজ্ঞানমনস্ক কনটেন্ট নির্মাতা মার্ক রোবারসহ বিভিন্ন দেশের প্রভাবশালী ইউটিউবাররা। এখানেই মিস্টার বিস্টের আরেকটি শক্তি দেখা যায়। তিনি শুধু নিজের দর্শককে কাজে লাগান না, তিনি পুরো নির্মাতা-সমাজকে একসঙ্গে নড়াচড়া করাতে পারেন।

তাঁর গল্পে তাই শুধু ৫০ কোটি সাবস্ক্রাইবারের বিস্ময় নেই; আছে নতুন অর্থনীতির পাঠও। আগে তারকারা বড় হতেন স্টুডিওর মাধ্যমে, মিডিয়া কোম্পানির মাধ্যমে, টেলিভিশন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে। মিস্টার বিস্ট দেখালেন, এখন একজন তরুণ নিজেই হতে পারেন স্টুডিও, নিজেই হতে পারেন চ্যানেল, নিজেই হতে পারেন ব্র্যান্ড, আবার নিজেই হতে পারেন বাজার।

তবু এই বিশালতার মাঝেও একটি ছোট্ট ছবি মনে থেকে যায়। এক কিশোর, নিজের ঘরে বসে, খুব কম দর্শক নিয়ে ভিডিও আপলোড করছে। হয়তো কেউ দেখছে না। হয়তো বন্ধুরা বুঝতে পারছে না। সেই কিশোরই একদিন ৫০ কোটি মানুষের সাবস্ক্রিপশনের মালিক হবে, কে জানত?

মিস্টার বিস্টের গল্প তাই শুধু একজন ইউটিউবারের গল্প নয়। এটি নতুন সময়ের গল্প। এমন এক সময়, যেখানে বিনোদন, ব্যবসা, দান, প্রযুক্তি ও খ্যাতি একই স্ক্রিনে এসে মিশে যায়। ভবিষ্যতের মিডিয়া কেমন হবে, আগামী দিনের তারকা কোথা থেকে উঠে আসবে, মিস্টার বিস্টের উত্থান সেই প্রশ্নেরই এক জোরালো উত্তর। আজকের পৃথিবীতে পর্দা যত ছোট হচ্ছে, স্বপ্নের মঞ্চ তত বড় হয়ে যাচ্ছে।

তথ্যসূত্র:
YouTube Official Blog, Business Insider এবং The Verge


Back to top button
🌐 Read in Your Language