সম্পাদকের পাতা

আয়েশা ও আলস্তানের গল্প

নজরুল মিন্টো

সুলতানা হক

নিউ জার্সির ইরভিংটন শহরটি যেন এক কাচের তৈরি নিঃশব্দ শহর—যেখানে আধুনিকতা আর অভিবাসী বাস্তবতার মিশ্রণে গড়ে উঠেছে এক বৈচিত্র্যময় মানবসমাজ। নিউ ইয়র্ক সিটির কাছাকাছি, মাত্র পনেরো মাইল দূরের এই ছোট্ট শহরটিতে নেই কোনো আকাশচুম্বী বিল্ডিংয়ের দম্ভ, নেই সেলফি-পসার পর্যটকের ভিড়; আছে শুধু ঘাম, প্রতীক্ষা আর পুনর্গঠনের গল্প। এখানে প্রতিটি রাস্তার মোড়ে মোড়ে দেখা মেলে ভিনভাষী উচ্চারণ, প্রতিটি অ্যাপার্টমেন্টের দেয়ালের ওপাশে লুকিয়ে থাকে নানা ভাষায় বলা জীবনসংগ্রামের কাহিনি।

সেই শহরের মধ্যেই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে ম্যাপল গার্ডেনস—ইরভিংটনের সাততলা একটি আবাসিক ভবন, যার নাম শুনলে মনে হয় যেন বসন্তের হাওয়া ছুঁয়ে যাওয়া কোনো সুসজ্জিত বাগান। প্রতিটি বারান্দায় ঝোলানো রয়েছে রঙিন টবের গাছে গাছপালা, প্রতিটি দরজার পাশে পোস্টবক্সের নিচে সযত্নে রাখা থাকে রঙিন চটের জুতো। এখানে রয়েছে নিঃশব্দ সন্ধ্যা, ধোঁয়াটে সকাল, আর কিছু পরিবারের পুনরাগমনের স্বপ্ন।

সকালের আলো তখনো জানালার কাচে মৃদু ধাক্কা দিচ্ছে—পূর্ণদৈর্ঘ্যে ঢুকতে পারেনি ঘরের ভেতর। করিডোরে ধীরে ধীরে ভেসে আসছে কফির গন্ধ, মসৃণ টাইলসে প্রতিফলিত হচ্ছে জুতোর নরম শব্দ। কেউ কেউ কাজে বেরোচ্ছেন, কেউ স্কুলবাসের প্রতীক্ষায়, কেউ নিচের দোকান থেকে দুধ কিনে ফিরছেন। সাততলার বাতাসে হালকা দোল খাচ্ছে টিউলিপের টব—যেন এক বৈশাখী সকাল, শহরটির নিজস্ব ছন্দে বাঁধা।

জেফারুল হক, সংক্ষেপে জেফ হক। তিনি একজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত স্থপতি, যিনি ১৯৮০-এর দশকের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। তিনি এসেছিলেন স্বপ্ন নিয়ে—নকশা করবেন ভবিষ্যৎ, গড়বেন নিজের জীবনটাকে ইট আর কাঁচ দিয়ে নতুন করে। তাঁর জন্ম হয়েছিল বাংলাদেশের ঢাকার মোহাম্মদপুরে, একটি মধ্যবিত্ত পরিবারে। বাবা ছিলেন পিডব্লিউডি-র সাবেক ওভারসিয়ার, মা ছিলেন স্কুলশিক্ষিকা। ছোটবেলা থেকেই ছবি আঁকার প্রতি ছিল তার অদম্য ঝোঁক—যার ধারাবাহিকতায় তিনি বুয়েটের আর্কিটেকচার বিভাগে পড়াশোনা করেন।

১৯৯০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে এসে জেফ প্রথমে নিউ জার্সির প্যাটারসনে একজন ড্রাফটসম্যান হিসেবে কাজ শুরু করেন। সন্ধ্যায় কমিউনিটি কলেজে ভর্তি হন, আর্কিটেকচারাল কোর্স সম্পন্ন করেন, এবং কয়েক বছরের মধ্যেই একটি স্থায়ী চাকরি পান ইরভিংটনের একটি ছোট আর্কিটেকচার ফার্মে।

তাঁর স্ত্রী লুবনা রহমান, যিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ছাত্রী ছিলেন। তিনিও যুক্তরাষ্ট্রে চলে আসেন, এবং তাঁদের সংসারে আসে দুটি সন্তান—ছেলে আলস্তান হক এবং মেয়ে আয়েশা হক।

কিন্তু অভিবাসী জীবনের ব্যস্ততা, সাংস্কৃতিক বিভাজন এবং পারস্পরিক দূরত্ব তাদের বৈবাহিক সম্পর্ককে ধীরে ধীরে ভেঙে ফেলে। ২০০১ সালে তাঁদের বিচ্ছেদ ঘটে। এরপর লুবনা চলে যান নিউ জার্সির টিনেক শহরে, যেখানে তিনি ইংরেজি পড়ানোর চাকরি নেন। সন্তানদ্বয়—আলস্তান (৮) ও আয়েশা (৫)—তার সঙ্গেই থাকতো, তবে প্রতি সপ্তাহান্তে তারা বাবার বাসায় সময় কাটাতে আসত।

এইভাবেই গড়ে উঠেছিল এক ভাঙা-গড়া সম্পর্কের প্রান্তর—যেখানে সন্তানেরা ছিল উভয়ের জীবনের মধ্যবর্তী ধন, আর সেই ধনের ভার বহন করছিল এক নিঃশব্দ উত্তেজনা।

সুলতানা হক। বাংলাদেশের খুলনার এক বেসরকারি হোটেল ম্যানেজমেন্ট ইনস্টিটিউট থেকে প্রশিক্ষণ শেষ করে তিনি চট্টগ্রামের একটি পাঁচতারা হোটেলের রিসিপশন ডেস্কে কাজ করতেন। পরে ঢাকার একটি কফিশপে কাজ নেন।

২০০২ সালের শেষদিকে, এক আত্মীয়ের মাধ্যমেই তাঁর পরিচয় হয় জেফারুল হকের সঙ্গে—ইমেইলে শুরু হয় কথা চালাচালি, পরে টেলিফোনে দীর্ঘ আলাপ। সেই কণ্ঠস্বরকে তাঁর মনে হয়েছিল নিভৃত, আত্মবিশ্বাসী ও আশ্রয়দাতা।

এক বছর পার না হতেই জেফের প্রণয়প্রস্তাবের ভিত্তিতে স্পনসর করা ভিজিট ভিসায় সুলতানা চলে আসেন যুক্তরাষ্ট্রে। ২০০৩ সালের মার্চের শুরুর দিকে তাঁদের বিয়ে হয় ইরভিংটনের স্থানীয় মসজিদে। একটি ছোট নিকাহ্‌ অনুষ্ঠান, যেখানে কেবল কয়েকজন প্রবাসী বন্ধু ও মসজিদের ইমাম উপস্থিত ছিলেন।

বিয়ের পর সুলতানার ভিতর জন্ম নেয় অদৃশ্য এক শঙ্কা। তার কাছে নতুন স্বামী মানে ছিল সম্পূর্ণ ভালোবাসা, তাঁর পক্ষে বুঝা সম্ভব হয়নি যে একজন পুরুষ তার আগের জীবনকে পুরোপুরি মুছে ফেলতে পারে না। জেফের অতীত—তার সন্তান, তার প্রাক্তন স্ত্রী—সবই যেন সুলতানার জন্য হয়ে দাঁড়ালো এক অতল প্রতিদ্বন্দ্বিতা।

সুলতানা অনুভব করেন—যতই তিনি আয়েশার চুলে বেণি বেঁধে দেন, কিংবা আলস্তানের হোমওয়ার্কে সাহায্য করেন, সন্তান দুটি তাঁকে “মা” নয়, “সুলতানা আন্টি” বলেই ডাকে। আর জেফ? তিনি চেষ্টা করেন ভারসাম্য রাখতে—কিন্তু একটি মানুষ যখন দু’টি পরিবারের মাঝখানে পড়ে, তখন তার হৃদয় আর সময় দুই ভাগ হয়ে যায়।

এই বিভাজন সুলতানার মধ্যে দেখা দেয় অসহিষ্ণুতা। কখনো কখনো আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মুখের মধ্যে তিনি খুঁজেন অপূর্ণতা, প্রতিদ্বন্দ্বীর ছায়া। কখনো রাত্রির একাকীত্বে তাঁর মনে হতো—জেফের মন এখনও পুরনো স্ত্রী লুবনার দিকেই ফিরে থাকে। এভাবেই শুরু হয় এক গোপন ভাঙনের অধ্যায়।

সেদিন ছিল মার্চের শেষ শনিবার (২৯ মার্চ, ২০০৩)। সকালটি ছিল ঝকঝকে, ঠাণ্ডা বাতাসে চেরি গাছের কুঁড়ি দুলছিল। জেফ অফিসে ছিলেন—অফিস মানে এক নির্মীয়মাণ ভবনের ছাদে দাঁড়িয়ে স্থাপত্যের ব্লুপ্রিন্টে দাগ টানছিলেন। ঠিক সেই সময়, সকাল দশটার দিকে, সুলতানা ফোন করে তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিল—কখন ফিরবেন?

জেফ বলেছিলেন, “আরও এক ঘণ্টা।” তাঁর কণ্ঠে ক্লান্তি ছিল না, ছিল না উষ্ণতা—একটি সুনির্ধারিত সময়সূচি জানিয়ে দেওয়া মাত্র।

ফোন রেখে দেয় সুলতানা। সেই মুহূর্তে তিনি হয়তো জানতেন, আজ কিছু বদলে যাবে।

সকালের আলো তখন জানালার পর্দা গলে ছড়িয়ে পড়েছে ঘরের মেঝেতে। টোস্টারে আটকে থাকা একটি রুটি ধোঁয়া ছাড়ছিল নিঃশব্দে। অ্যাপার্টমেন্টের ভেতরে তখন ছিল এক অস্বাভাবিক স্থিরতা—যে ধরনের নিঃশব্দতা শুধুমাত্র একটি ঘূর্ণিঝড়ের আগে অনুভূত হয়।

সুলতানা একা দাঁড়িয়ে ছিলেন রান্নাঘরের সিঙ্কের পাশে, ধাতব ছুরিটির দিকে তাকিয়ে। সেটা বড় কোনো কিচেন নাইফ নয়, বরং মাঝারি মাপের এক ধারালো ফলাযুক্ত ছুরি—যা সাধারণত আলু বা পেঁয়াজ কাটার কাজে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু আজ তা অন্য উদ্দেশ্যে নির্ধারিত হয়ে গেছে।

তাঁর চোখে ছিল এক নিঃশব্দ স্থিরতা। যেন বহুদিন ধরে জমে থাকা একটি ভয়ংকর সিদ্ধান্ত এখন রূপ নিতে চলেছে। তার আগে রাতভর তিনি ঘুমাননি। একটা চিঠি লিখেছিলেন—“তুমি আমাকে ভালোবাসো না, ভালোবাসো ওদের মা’কে। আমি বুঝে গেছি। কিন্তু আমি সেই মেয়েটি নই, যে মুখ বুঁজে সহ্য করবে।”

তিনি প্রথমে শিশুদের ঘরের দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়ান। কক্ষে তখন নিঃশব্দে ঘুমিয়ে ছিল আলস্তান। আয়েশা জেগে ছিল হয়তো—চোখ মেলে চেয়ে ছিল দরজার ফাঁক দিয়ে।

“তুমার কি খিদে পেয়েছে?”—সুলতানা হয়তো জিজ্ঞেস করেছিলেন, কিংবা নয়। সত্যটা কেউ জানে না।

সুলতানা আলস্তানের ঘাড়ে ছুরি চালান। শিশুটি নিঃশব্দে লুটিয়ে পড়ে। আয়েশা চিৎকার করতে যায়, কিন্তু দ্বিতীয় ঘায়ে তার গলা কেটে দেওয়া হয়। রক্তে ভিজে যায় খেলনা ও দেয়াল।

দুজন শিশু—একজন বিছানায়, একজন মেঝেতে—অবিন্যস্তভাবে পড়ে থাকে। যেন কোনো নিষ্ঠুর খেলায় হেরে গিয়েছে তারা। ঘরটিতে তখন এক ধরনের উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়ে—রক্তের গন্ধ আর নির্বাক মৃত্যুর গুমোট ভার।

সুলতানা ধীরে ধীরে পিছিয়ে আসেন। তাঁর মুখে কোনো বিকার নেই—না কান্না, না রাগ, না ভয়। শুধু এক শীতল দৃষ্টি, যেন এক পরীক্ষা শেষ হয়েছে।

তিনি বাথরুমে যান। হয়তো ধুয়ে ফেলেন হাত, হয়তো নয়। কাপড় বদলান কি না, কেউ জানে না। তবে জানা গেছে, তিনি ফেলে আসেন ছুরিটি, শিশুদের, এবং তাঁর লেখা সেই চিঠি।

তারপর দরজার কড়া ঘুরিয়ে তিনি বেরিয়ে যান—চুল খোলা, মুখ ধোয়া, আর চোখে তখনও ঘূর্ণিঝড়ের পরে আকাশের মতো এক রঙহীন স্থিরতা।

পালানোর পরিকল্পনা ছিল নিশ্চিত। নিউ ইয়র্ক স্টেটের এক বাস টার্মিনাল থেকে গ্রেহাউন্ড বাসে উঠে টরন্টোর উদ্দেশ্যে রওনা দেন তিনি। কেউ তাঁকে থামায়নি। কোনো চোখ সন্দেহ করেনি, কারণ তার শরীরে তখন ছিল না কোনো দৃশ্যমান ক্ষত—শুধু মনেই ছিল রক্তের ছায়া।

জেফ অ্যাপার্টমেন্টে ফিরে আসেন বেলা সাড়ে এগারোটায়। দরজা খোলেন, পা বাড়ান ভিতরে। প্রথমে বিছানায় পড়ে থাকা আয়েশাকে দেখেন—চোখ বন্ধ, নিঃশব্দ। তারপর মেঝেতে—আলস্তান। দু’জনের চারপাশে রক্তের গহ্বর।

তাঁর চিৎকারে কেঁপে ওঠে ভবনের দেয়াল। “আমার সন্তানকে কেটে ফেলেছে! কেউ একজন পুলিশ ডাকো!”

মিনিট দশেকের মাথায় ইরভিংটন পুলিশ বিভাগের দুটি টহলগাড়ি এসে দাঁড়ায় ভবনের সামনে। সঙ্গে ছিলেন দুইজন প্যাট্রোল অফিসার ও একজন গোয়েন্দা। ভেতরে ঢুকেই তারা পায় রক্তাক্ত দৃশ্য—দুটি শিশুর কণ্ঠরোধ করে দেওয়া হয়েছে ছুরির নির্মমতায়। ঘটনাস্থলে পুলিশ কর্ডন টেনে দেয়, ডাকা হয় ফরেনসিক টিম, শিশুবিষয়ক তদন্ত কর্মকর্তা, এবং এসেক্স কাউন্টি হোমিসাইড ইউনিট।

পুলিশ বুঝে যায়—ঘাতক পালিয়ে গেছে। অ্যাপার্টমেন্টে পাওয়া যায় না কোনো জোরপূর্বক প্রবেশের চিহ্ন, ভাঙচুরের দাগ বা বাইরের কেউ প্রবেশের ইঙ্গিত। আর তখনই জেফ অস্ফুট স্বরে বলেন—“সুলতানা ছিল ঘরে। সকালে কথা হয়েছিল। এখন সে নেই।”

পুলিশ দ্রুত সুলতানা হকের নামে সন্দেহভাজন খুনির একটি বুলেটিন তৈরি করে। তাঁর ছবি, বয়স, উচ্চতা, শেষবার দেখা যাওয়ার বিবরণ ও পরিচিতির সমস্ত তথ্য পাঠানো হয় ফেডারেল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন (FBI)-এর জাতীয় ডেটাবেসে। সাথেসাথেই খবর দেয়া হয় যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা সীমান্তে কাস্টমস অ্যান্ড বর্ডার প্রোটেকশন (CBP) এবং ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (ICE)-কে। তাদের নির্দেশ ছিল—“সুলতানা হক (৩০) কোনোভাবেই দেশের বাইরে যেতে পারবেন না।”

এদিকে ইরভিংটন পুলিশের গোয়েন্দারা ছড়িয়ে পড়ে সম্ভাব্য গন্তব্যগুলিতে। নিউ ইয়র্কের পোর্ট অথরিটি বাস টার্মিনাল, গ্র্যান্ড সেন্ট্রাল রেলওয়ে স্টেশন, নিউ জার্জি ট্রানজিট হাব, এমনকি জেএফকে ও নিউয়ার্ক আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও বার্তা পাঠানো হয়। সিসিটিভি ফুটেজ চাওয়া হয়। বাস ও ট্রেন কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করা হয় বিশেষ নজরদারিতে।

কিন্তু ততক্ষণে সুলতানা চলে গিয়েছেন বহুদূর। গ্রেহাউন্ড বাস সার্ভিসের নিউ ইয়র্ক স্টেট রুটে একটি সাধারণ টিকিটে তিনি টরন্টোর উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন।

ইরভিংটন পুলিশ দ্রুত FBI-এর মাধ্যমে কানাডার টরন্টো পুলিশ সার্ভিস (TPS)-এর সাথে যোগাযোগ করে। ইন্টারপোল-এ “পারসন অব ইন্টারেস্ট” হিসেবে নাম পাঠানো হয়। সন্দেহভাজন ঘাতক সুলতানা হক তখন সবার নজরে, কিন্তু কোথায়, কেউ জানে না। সুলতানার শেষ মোবাইল লোকেশন ট্র্যাক করে জানা যায়—তিনি টরন্টো শহরের মধ্যে ঢুকে গেছেন।

যুক্তরাষ্ট্র ও ক্যানাডার সীমান্তে নিচ্ছিদ্র নিরাপত্তা বহাল থাকা সত্ত্বেও সুলতানা হক নির্বিঘ্নে ১৩ ঘন্টার পথ পাড়ি দিয়ে টরন্টো এসে পৌঁছেন। টরন্টোতে পৌঁছেই নিকটবর্তী একটি মসজিদে আশ্রয়ের সন্ধানে গেলে তাকে স্কারবোরোর একটি মুসলিম কল্যাণ প্রতিষ্ঠানের সন্ধান দেয়া হয়। ঐ প্রতিষ্ঠানে গিয়ে কর্মরত মোহাম্মদ রায়হানকে সুলতানা জানান, তিনি একজন হত্যাকারীনি। এ অবস্থায় ঐ কর্মকর্তা ধারণা করেন সম্ভবতঃ মহিলাটির মস্তিষ্ক বিকৃতি ঘটেছে। তাকে বারবার জিজ্ঞাসা করা হলেও একই কথার পুনরাবৃত্তি করেন এবং তার অপরাধের প্রায়শ্চিত্তের জন্য মক্কা-মদিনা যাওয়ার বাসনা ব্যক্ত করেন। এক পর্যায়ে ঐ সংগঠনের লোকজন পুলিশে ফোন করেন।

গোয়েন্দা পুলিশ এসে তার স্বীকারোক্তি নেয় এবং পরে গাড়িতে তুলে নিয়ে যায়। পুলিশ কর্মকর্তা স্কট হুইটেমোর বলেন, “সুলতানা স্বীকার করেন যে তিনি শিশুদের হত্যা করে পালিয়ে এসেছেন।”

অতঃপর যুক্তরাষ্ট্র সরকারের পক্ষ থেকে একটি আনুষ্ঠানিক প্রত্যার্পণ অনুরোধ পাঠানো হয় কানাডার বিচার মন্ত্রণালয়ে। অপরাধের ভয়াবহতা, পলাতক আসামির স্বীকারোক্তি, এবং দুই শিশুর নির্মম হত্যাকাণ্ডের নৃশংস বিবরণ যুক্ত করে এফবিআই ও ইমিগ্রেশন এনফোর্সমেন্ট বিভাগের পক্ষ থেকে তড়িৎ পদক্ষেপ চাওয়া হয়।

দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে, অন্টারিও আদালত যুক্তরাষ্ট্রের অনুরোধ মঞ্জুর করে এবং সুলতানাকে ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেয়। অবশেষে, টরন্টোর পিয়ারসন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থায় সুলতানাকে বিশেষ ফ্লাইটে তুলে দেওয়া হয় নিউ জার্সি পুলিশ ও মার্কিন গোয়েন্দা বিভাগের হাতে—যেখানে তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেফতার দেখানো হয় এবং অপরাধ বিচারের জন্য নিউইয়র্কের এসেক্স কাউন্টি আদালতে হস্তান্তর করা হয়।

২০০৬ সালে সুলতানা আদালতে দোষ স্বীকার করেন (তাঁর মানসিক অবস্থা ও প্রত্যার্পণের আইনি জটিলতার কারণে বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘস্থায়ী হয়)। নিউ জার্সি সুপিরিয়র কোর্ট তাঁকে ৪০ বছরের কারাদণ্ড দেয়।

বিচার শেষে সাংবাদিকরা যখন জেফ হকের প্রতিক্রিয়া জানতে চেয়েছিল, তিনি বলেছিলেন—“আমার পৃথিবী তখনই শেষ হয়ে গিয়েছে, এখন আদালতের রায় আমাকে কিছু ফেরত দিতে পারবে না। আমি শুধু জানি, আমার আয়েশা আর আলস্তান আমার অপেক্ষায় আছে।”

টিনেক মসজিদে আয়োজিত হয়েছিল শিশুদের জানাজা। ছোট দুটি কফিন, পাশে দুই খেলনা, আর বাবার নত মাথা।

জেফ হক পেশাগত জীবন থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন। সপ্তাহান্তে টিনেক মসজিদে গিয়ে বাচ্চাদের ক্লাসের এক কোনায় চুপচাপ বসে থাকেন। কখনো কথা বলেন না, শুধু দেখেন—একটি শিশু কীভাবে পেন্সিলে রঙ করছে, কীভাবে বর্ণমালা লিখছে, কীভাবে একটি লাল বল নিয়ে খেলছে।

এ দৃশ্য দেখে কারও কারও চোখে জল এসে যায়—“তিনি সেই বাবা, যাঁর সন্তানেরা কেবল ঘুমিয়ে পড়েনি, তাদের ঘুম চিরন্তন।”


Back to top button
🌐 Read in Your Language