
কানাডার বাতাসে টাকা ওড়ে। তবে কথা আছে! আপনাকে ঠিক জায়গায় দাঁড়াতে হবে।
যেমন, যদি আপনি বিশেষজ্ঞ ডাক্তার হন তাহলে আপনি প্রতি বছর গড়ে ৩, ২০, ০০০ ডলার আয় করতে পারবেন। ফ্যামিলি ডাক্তার হলে গড়ে ২,৮০,০০০ ডলার। আর দাঁতের ডাক্তার? তাও প্রায় ২,৫০,০০০ ডলার আয় করতে পারবেন।
কানাডায় আইনজীবীরারা গড়ে ১,৫০,০০০ ডলার আয় করেন। তবে কর্পোরেট লিগ্যাল অ্যাডভাইজার বা সিনিয়র কাউন্সেল হলে সেটা ৩ লক্ষ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। বিচারকের বার্ষিক আয় প্রায় ১,৮০,০০০ ডলার, আর সুপ্রিম কোর্ট বা আপার লেভেল ফেডারেল কোর্টের জজ হলে তো কথাই নেই। আইটি ম্যানেজার, সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, ফিনান্স কনসালট্যান্টরা এখনো দাপটের সঙ্গে আছে। অনেকেই বছরে ১,৫০,০০০-২,০০,০০০ ডলার পর্যন্ত আয় করছেন।
মজার ব্যাপার হলো, এই দেশ যারা বাস্তবে গড়ে তোলে, সেই নির্মাণ শ্রমিক, ক্লিনার, হেলথ কেয়ার অ্যাইড, কিংবা যারা ট্যাক্সি বা উবার চালান বা গ্রোসারির দোকানে কাজ করেন- তাদের গড় আয় ৩০,০০০-৪০,০০০ ডলারের মধ্যে ঘোরাফেরা করে।
কানাডায় আজও আয়বৈষম্য একটি চরম বাস্তবতা। ২০২৪ সালের পরিসংখ্যান বলছে, কানাডার প্রায় ৩ লাখ ৪০ হাজার নাগরিক, অর্থাৎ শীর্ষ ৫% কর্মজীবী, গড়ে ১,৬২০০০ ডলার বা তার চেয়ে বেশি আয় করেন। অথচ অধিকাংশ সাধারণ কর্মজীবীর বার্ষিক গড় আয় ৪৬,১৫১ ডলার এবং অনেকেরই আয় ৩০ হাজার ডলারের নিচে।
সবচেয়ে নিচের সারিতে আছেন বেবিসিটার, ফাস্টফুড কর্মী, ক্লিনার, হোটেল ক্লার্ক প্রমুখ। তাদের অনেকের বার্ষিক আয় ২০,০০০-২৫,০০০ ডলারের মধ্যেই ঘোরাফেরা করে। বিশেষ করে বেবিসিটারদের গড় আয় মাত্র ২০,৩৩২ ডলার- যা কানাডার ৫১৪টি স্বীকৃত পেশার মধ্যে অন্যতম সর্বনিম্ন।
অথচ সমাজের যে স্তম্ভগুলো নীরবে দাঁড়িয়ে থাকে, তাদের একটি এই পেশা। একটা শিশুকে সকাল থেকে সন্ধ্যা নয়, আসলে একটা মনুষ্য জাতিকে তারা ধৈর্য, স্নেহ আর শৃঙ্খলার পাঠ দিয়ে তৈরি করে চলেছেন। কিন্তু যে হাতে ভবিষ্যতের ভিত্তি গড়া হয়, সেই হাতেই নিজের জীবনের প্রয়োজনগুলো পূর্ণ হয় না।
নিজের সন্তানকে ভালো খাবার দেওয়া কিংবা একজোড়া নতুন জুতা কিনে দেওয়ার সামর্থ্যও অনেক সময় তাদের থাকে না। সমাজ যাদের হাতে শিশুর নিরাপত্তা তুলে দেয়, সেই সমাজই তাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত করে রেখেছে।
নারীদের অংশগ্রহণ এখন শীর্ষ পেশাগুলোতে বেড়েছে- আইন, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষায় নারীর প্রবেশ দ্বিগুণেরও বেশি। তবে আয় বৈষম্য এখনও রয়ে গেছে। শীর্ষ ২৫টি পেশায় নারীর অংশগ্রহণ এখন ২২-২৫% হলেও, প্রতি ৫ নারীর মধ্যে ৩ জনই এখনও লো ইনকাম ক্যাটাগরিতে, যাদের বার্ষিক আয় ২০ হাজার ডলারের নিচে।
তবে অনেক ছোট ছোট পেশায় থাকা মানুষরাও ভালো রোজগার করেন, বিশেষ করে যারা কাজ করেন নিজেদের মতো করে- ফ্রিল্যান্স ভিত্তিতে। উদাহরণস্বরূপ, একজন অভিজ্ঞ প্লাম্বার বা ইলেকট্রিশিয়ান যদি দিনে ৪-৫টি ছোট জব করে থাকেন, তবে মাসে ৮,০০০-১২,০০০ ডলার পর্যন্ত আয় করতে পারেন। কনস্ট্রাকশন ওয়ার্কারদের কেউ কেউ ঘন্টার ভিত্তিতে ৪০-৭০ ডলার পর্যন্ত পান। তবে তাদের অনেকেই নগদ লেনদেন পছন্দ করেন- যা ট্যাক্স রেকর্ডে ওঠে না। এই ক্যাশ-অনলি সংস্কৃতি অনেক পেশায় এখনো রয়ে গেছে, যা সরকারের ট্যাক্স রাজস্ব থেকে এক ধরনের ফাঁকি হলেও সামাজিক বাস্তবতা হিসেবে টিকে আছে।
কানাডার নাগরিক জীবন মানেই ইনকাম ট্যাক্স। এ দেশে আপনি যতই বুদ্ধিমান হন, যতই গরীব হন- ট্যাক্স আপনাকে ছাড়বে না।
একটা সাধারণ চাকরিজীবীর জন্য ট্যাক্স রিটার্ন জমা দেওয়া তেমন কঠিন কিছু নয়। কিন্তু যেই আপনি ব্যবসায়ী হবেন, ছোট-বড় যাই হোক না কেন, সেই সঙ্গে অ্যাকাউন্ট্যান্টের টেবিল ঘষা শুরু। ফাইল, ইনভয়েস, ব্যালেন্স শিট, ব্যাঙ্ক স্টেটমেন্ট- একেকটা কাগজ যেন একেকটা দুঃস্বপ্ন।
CRA (Canada Revenue Agency) এক অদ্ভুত বাহিনী। আপনি পাওনাদার হলে, টাকা ফেরত তারা দিবেÑতবে একটু দেরিতে। আপনি দেনাদার হলে, ফোন, চিঠি, সুদসহ আদায়-সব একসঙ্গে আসবে। তবে ট্যাক্স মানেই খারাপ কিছু না। অনেক ক্ষেত্রেই ট্যাক্স রিটার্ন ফাইল করলে সরকার থেকে ফেরত পাওয়া যায়- বিশেষ করে যারা শিশু লালনপালনের খরচ, শিক্ষাগত ঋণ, আরআরএসপি, মেডিকেল খরচ ইত্যাদি ক্লেইম করে থাকেন। লো ইনকাম শ্রেণির মানুষদের জন্য রয়েছে GST/HST credit, Canada Child Benefit ইত্যাদি। অর্থাৎ ট্যাক্স একদিকে যেমন বোঝা, অন্যদিকে তা সুযোগেরও দরজা খুলে দেয়।
ইনকাম ট্যাক্স নিয়ে যখন কথা উঠলো, তাই এ বিষয়ে কিছু তথ্য পাঠকদের জানিয়ে রাখি। বিশ্বের প্রথম ইনকাম ট্যাক্স চালু হয় ১৭৯৯ সালের ১ জানুয়ারি, ব্রিটেনে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী উইলিয়াম পিট দ্য ইয়ং এই কর চালু করেন নেপোলিয়নের সঙ্গে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য অর্থ সংগ্রহের লক্ষ্যে। তারপর থেকে ধীরে ধীরে এই কর প্রথা ইউরোপ ও আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে।
কানাডায় ফেডারেল ইনকাম ট্যাক্স চালু হয় ১৯১৭ সালে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়। তখন বলা হয়েছিল- এই কর অস্থায়ী, কিন্তু ইতিহাস দেখিয়েছে, সরকার যেটা একবার নেয়, সেটা ছেড়ে দেয় না সহজে। আজ সেই অস্থায়ী; করই কানাডার বাজেটের সবচেয়ে বড় আয়ের উৎস।
তারপর থেকে বহু দেশে এটা চালু হয়ে যায়। কানাডাতে ট্যাক্স ফাঁকি দেয়া দুরুহ। বড় বড় ব্যবসায়ীরা হয়তো ফাঁকি দিতে পারেন কিন্তু সাধারণ নাগরিকরা ফাঁকি দিতে পারে না। কানাডাতে প্রতি বছর ট্যাক্স রিটার্ন নিয়ে মামলা-মকদ্দমা অহরহ হয়। এটা স্বাভাবিক ঘটনা। তবে এর মাঝে কিছু অস্বাভাবিক ঘটনাও ঘটে। শুনুন তাহলে সেসব অস্বাভাবিক ঘটনার দু-একটি।
১৯৬২ সালে অটোয়ার উইলফ্রিড নামের এক ব্যক্তি তার ট্যাক্স রিটার্নে ৬ হাজার ডলারের বন্ডের উল্লেখ করেননি। কারণ জিজ্ঞেস করলে বলেন- ইঁদুর খেয়ে ফেলেছে! বিচারক বিশ্বাস করেননি, জরিমানা করেন ২,১৫০ ডলার।
১৯৪৬ সালে রাসেল রজার্স নামে সাসকাচুয়ানের এক বাসিন্দা তিন বছর ট্যাক্স রিটার্ন জমা দেননি। আদালতে বলেন, আইনত কানাডা বলে কোনো দেশ আছে, আমি বিশ্বাস করি না। বিচারক ২৫ ডলার জরিমানা করেন। ১৯৪৯ সালে আবার একই কান্ড করে, এইবার ২৫০ ডলার জরিমানা।
১৯৫৭ সালে আর্থার ফাউন্টেন নামে এক ব্যক্তি বলেন, আমি লেখাপড়া জানি না, ফর্ম পূরণ করতে পারিনি। বিচারক তার যুক্তি শুনে হালকা মনোভাব দেখান, তবু জরিমানা ২৫ ডলার।
১৯৫০ সালে রবার্ট ইভানস নামে এক ব্যক্তি ৬ বছরের ট্যাক্স রিটার্ন জমা দেননি। আদালতে বলেন, ব্যস্ত ছিলাম। জরিমানা ১২০ ডলার।
ব্যবসায়ীরা কিভাবে ট্যাক্স ফাঁকি দেন, তার ছোট-বড় অনেক গল্প আছে। ছোট দোকান থেকে বড় কর্পোরেট পর্যন্ত কেউ কেউ চতুর হয়ে ওঠে, কেউ হয়তো চালাক। ছোট ছোট গ্রোসারি দোকানগুলো বেশিরভাগ সময় কাস্টমারদের নগদ টাকায় পণ্য বিক্রি করে। কারণ নগদে বিক্রির তথ্য রেকর্ডে না উঠলে, সেই অংশে ট্যাক্সও দিতে হয় না। বছরে এইভাবে তাদের প্রায় ৩০ হাজার ডলার থেকে ৪০ হাজার ডলার আয় হিসাবের বাইরে থেকে যায়। CRA থেকে বিশেষ টিম হানা দিলে তারা নানা অজুহাত দেখায়। ধরা পড়ে জরিমানা গুনে, কিন্তু থামে না।
লক্ষ্য করলে দেখা যায়, মাঝারিমানের রেস্টুরেন্টগুলো ডেবিট কার্ড/ক্রেডিট কার্ড কোনোটাই নিতে চায় না। কার্ড দিয়ে পেমেন্ট করলে বেশি দাম দিতে হয়, আর নগদ পেমেন্ট করলে কম দাম রাখে। দক্ষিণ এশীয় রেষ্টুরেন্টগুলোতেই এ চলটা বেশি।
আর বড় কর্পোরেট হাউস? সেখানেও নানা কৌশল চলে। একটি বহুজাতিক কোম্পানি তাদের কানাডা শাখাকে লোকসানি দেখায়, অথচ আসলে মুনাফা ট্রান্সফার করে ফেলে অফশোর একাউন্টে।
কিছু ট্যাক্স রিটার্ন ফ্রড এতটাই নিখুঁতভাবে করা হয় যে, তদন্তের পরে বের হয়- মিথ্যা নাম, মিথ্যা আইডি, ভুয়া ডোনেশন রিসিপ্ট! এক ভদ্রলোক ২০২৩ সালে ৮০ হাজার ডলার রিফান্ড ক্লেইম করেছিলেন, পরে জানা যায় তিনি প্রকৃতপক্ষে ছিলেন স্টুডেন্ট, তার আয়ই হয়নি এত!
অন্যদিকে, এক মহিলা ২০২১ সালে ভুলক্রমে ১ লাখ ৫০ হাজার ডলার বেশি রিফান্ড পান, আর ফেরত দেননি। পরে CRA সেটি শনাক্ত করে সুদসহ কেটে নেয়। তিনি নাকি সেই অর্থে ইউরোপ ঘুরে ফেলেছিলেন!
অনেকে অনেক কিছু ভাবেন। কিন্তু মনে রাখা দরকার, এই ট্যাক্স দিয়েই নগরীর রাস্তা তৈরি হয়, স্কুল চলে, হাসপাতাল দাঁড়িয়ে থাকে। কিন্তু এই ট্যাক্স যেন এক ধরণের বিশ্বাস-আশ্রিত সম্পর্ক। সরকার যদি স্বচ্ছ হয়, নাগরিকও তখন উৎসাহ নিয়ে দেয়। আর যদি সেই অর্থ কোথায় যায় না বোঝা যায়- তাহলে প্রশ্ন ওঠে।









