আফ্রিকা

অ্যাঙ্গোলায় সোনার খনি ধসে ২৮ শ্রমিকের মৃত্যু, নিহতদের মধ্যে একই পরিবারের ১৩ সদস্য

লুয়ান্ডা, ২৫ মে – আরও একটু ভালো থাকার আসায়, পরিবারের মুখে দুমুঠো অন্ন তুলে দেওয়ার স্বপ্নে মাটির শত ফুট গভীরে নেমেছিলেন তারা। কিন্তু সেই সোনালী স্বপ্নই যে মুহূর্তের মধ্যে অন্ধকার কবরে পরিণত হবে, তা কে জানত! মধ্য-আফ্রিকার দেশ অ্যাঙ্গোলার একটি ঐতিহ্যবাহী সোনার খনিতে ভয়াবহ ধসের ঘটনায় অন্তত ২৮ জন খনি শ্রমিকের নির্মম মৃত্যু হয়েছে। আর এই বুক ফাটানো ট্র্যাজেডির সবচেয়ে বড় আঘাতটি লেগেছে একটি নির্দিষ্ট পরিবারের ওপর—নিহত ২৮ জনের মধ্যে ১৩ জনই আপন ভাই-বেরাদর এবং একই পরিবারের সদস্য!

দেশটির সরকারি কর্মকর্তারা এই তথ্য নিশ্চিত করার পর পুরো এলাকাজুড়ে এখন শোকের মাতম চলছে। রাজধানী লুয়ান্ডার উত্তর-পূর্বে অবস্থিত বেঙ্গো প্রদেশের একটি প্রত্যন্ত ও ছোট খনিতে শনিবার ভোরের দিকে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনাটি ঘটে।

অ্যাঙ্গোলার জাতীয় সম্প্রচারমাধ্যম টিপিএ (TPA)-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্থানীয় পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, প্রতিদিনের মতোই শ্রমিকরা ওই খনি থেকে কৌশলগত মূল্যবান খনিজ, বিশেষ করে সোনা উত্তোলনের কাজ করছিলেন। শনিবার ভোরের দিকে আচমকাই খনির ওপরের একটি বড় অংশ হুড়মুড়িয়ে ভেতরের দিকে ধসে পড়ে। অন্ধকার সুড়ঙ্গের ভেতরে থাকা শ্রমিকরা পালানোর বিন্দুমাত্র সুযোগ পাননি।

খবর পেয়ে দ্রুত উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে একে একে ২৮টি নিথর দেহ উদ্ধার করে। উদ্ধারকারী বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নিহতদের সবার বয়স ১৮ থেকে ৪৫ বছরের মধ্যে। অর্থাৎ প্রাণ হারানো প্রত্যেকেই পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম টগবগে যুবক ছিলেন। খনির ভেতরে আর কোনো লাশ আটকে আছে কি-না, তা নিশ্চিত করতে এখনো উদ্ধার অভিযান ও তল্লাশি চালাচ্ছে পুলিশ।

এই খনি দুর্ঘটনার সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দিক হলো, নিহতদের প্রায় অর্ধেকই একই পরিবারের। উদ্ধারকারী দলের এক কর্মকর্তা স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, নিহতদের মধ্যে ১৩ জনই একই পরিবারের সদস্য ছিলেন। একসঙ্গে ঘরের ১৩টি তাজা প্রাণ হারিয়ে পুরো পরিবারটি এখন সম্পূর্ণ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। তাদের স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে দুর্ঘটনাস্থলের চারপাশ।

হীরাজহরত, সোনা এবং নানা ধরনের দামী খনিজের এক সমৃদ্ধ ভাণ্ডার হলো অ্যাঙ্গোলা। এই খনিজ সম্পদের টানেই ভাগ্য বদলাতে প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ অবৈধভাবে অ্যাঙ্গোলায় পাড়ি জমান। বিশেষ করে প্রতিবেশী দেশ গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র (DRC)-র একটি বিশাল জনগোষ্ঠীর প্রধান গন্তব্য এই অ্যাঙ্গোলাই। কোনো ধরনের নিরাপত্তা সরঞ্জাম বা আধুনিক প্রযুক্তি ছাড়াই সম্পূর্ণ অবৈধ এবং অনিয়ন্ত্রিতভাবে তৈরি এসব মৃত্যুরূপী খনিতে তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেন।

বেঙ্গো প্রদেশের প্রশাসনিক কর্মকর্তারা এই ঘটনার পর এক উদ্বেগজনক তথ্য প্রকাশ করেছেন। তাদের দেওয়া তথ্যমতে, শুধুমাত্র এই একটি প্রদেশেই প্রায় ৭ হাজার অবৈধ খনিকর্মী বুক টানটান করে সোনা উত্তোলনের বিপজ্জনক কাজের সাথে জড়িত রয়েছেন। কোনো ধরনের সরকারি নজরদারি বা প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষাব্যবস্থা না থাকায় এই খনিগুলো একেকটি জীবন্ত ডেথ-ট্র্যাপ বা মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে।

এই ভয়াবহ ট্র্যাজেডি আফ্রিকার অবৈধ খনিগুলোর নিরাপত্তা সংকটকে আবারও বিশ্বমঞ্চে বড় প্রশ্ন চিহ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দিল।

এনএন/ ২৫ মে ২০২৬


Back to top button
🌐 Read in Your Language