
ফেব্রুয়ারির এক সকালে টরন্টোর পিয়ারসন বিমানবন্দরের পাশে একটি হোটেল লবির জানালায় দাঁড়িয়ে আছে এক কিশোর। তার চোখে ভাসছে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের প্রত্যাশা—যা সে শুনেছে ইউটিউবের ভিডিওতে, পড়েছে ফেসবুক পোস্টে। অথচ শহরটিরই আরেক প্রান্তে, স্কারবোরোর এক বেসমেন্টে, ভাঙা বিছানা আর তাপহীন ঘরে, একই বয়সের আরেক কিশোর অন্ধকারে কাঁপছে।
একজন এসেছে সরকারি ব্যবস্থায় বিমান থেকে নেমেই হোটেলের রেজিস্ট্রেশনে, আরেকজন এসেছে নিজের ভিটেমাটি বিক্রি করে কিংবা ত্রিশ হাজার ডলার ঋণ নিয়ে মানবপাচারকারীর হাত ধরে।
কানাডার অভিবাসন বাস্তবতায় আজ এই দুটি মুখই সমানভাবে সত্য। একটি—রাষ্ট্রীয় নথিপত্রে নথিভুক্ত, বিমানবন্দরে অভ্যর্থনা পাওয়া, সরকার-চালিত হোটেলে আশ্রয় পাওয়া এক ‘স্বীকৃত শরণার্থী’; আর অন্যটি—নথি-বিহীন, চোখে আতঙ্ক, শরীরে ক্লান্তি, যে বেঁচে থাকে শহরের প্রান্তে বেসমেন্টের অন্ধকারে চুপচাপ।
২০১৭ সাল থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত, ফেডারেল সরকার শরণার্থীদের হোটেলে রাখার জন্য ব্যয় করেছে ১.১ বিলিয়ন কানাডিয়ান ডলার। সেই সঙ্গে প্রদেশ ও শহরগুলোকে সহায়তা দিতে দিয়েছে আরও ১.৫ বিলিয়ন। সব মিলিয়ে এই “অস্থায়ী ব্যবস্থার” ব্যয় দাঁড়িয়েছে ২.৬ বিলিয়নেরও বেশি।
২০২৪ সালের শুরুতে, কানাডা জুড়ে সাতটি প্রদেশে ৪৬টি হোটেল ভাড়া নিয়েছিল সরকার, প্রতিটি রুমের গড় খরচ ছিল ২০৫ ডলার। বর্তমানে এই সংখ্যা কিছুটা কমে দাঁড়িয়েছে পাঁচটি হোটেলে, যেখানে এখনো ৫০০ জন শরণার্থী রয়েছেন সরকারি খরচে।
প্রতিদিন একেকজন শরণার্থীর জন্য খরচ হচ্ছে গড়ে ১৩২ ডলার, যার মধ্যে তিন বেলা খাবার, হোটেল কক্ষ, স্বাস্থ্য সহায়তা ও কিছু প্রশিক্ষণ অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ, এক শরণার্থীর মাসিক থাকার খরচ দাঁড়ায় প্রায় ৪,০০০ ডলার—যা একটি মধ্যবিত্ত কানাডিয়ান পরিবারের গড় খরচের সমান।
এই হোটেলবাসী শরণার্থীরা এসেছেন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে—ইরিত্রিয়া, সিরিয়া, আফগানিস্তান, নাইজেরিয়া, ইয়েমেন, কঙ্গো, হাইতি ও দক্ষিণ এশিয়ার কিছু অঞ্চল থেকে।
তাঁদের মধ্যে কেউ মধ্যবয়সী—পেশায় ছিলেন স্কুল শিক্ষক বা নার্স। কেউ কনস্ট্রাকশন শ্রমিক, কেউবা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। বয়সের হিসেবে এদের অনেকেই তরুণ; বয়স ১৮ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। তবে শিশু ও গর্ভবতী নারীর সংখ্যাও কম নয়।
কিছু পরিবারের সঙ্গে এসেছেন বৃদ্ধ বাবা-মা, যাঁরা মাতৃভাষা ছাড়া অন্য ভাষা জানেন না। কেউ কেউ যুদ্ধে সন্তানের মৃত্যু দেখে পাড়ি দিয়েছেন এক অজানা ভূখণ্ডে, কেউবা জীবনের মায়ায় নিরুদ্দেশ পথে বেরিয়ে এসেছেন বন্দুকের ছায়া থেকে।
কানাডায় আরও হাজার হাজার শরণার্থী রয়েছেন—যাঁদের অনেকে এসেছেন ভিজিটর ভিসায়, কেউ আবার রাতের আঁধারে যুক্তরাষ্ট্র সীমান্ত অতিক্রম করে এসে আশ্রয়প্রার্থী হয়েছেন।
কানাডার ইমিগ্রেশন, রিফিউজি অ্যান্ড সিটিজেনশিপ (IRCC)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে রিফিউজি আশ্রয়প্রার্থীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১,৭২,০০০—যা ২০২২ সালের তুলনায় দ্বিগুণের কাছাকাছি। এই সংখ্যাটি কানাডার ইতিহাসে সর্বোচ্চ দাবিদার।
আশ্রয়প্রার্থী শরণার্থীদের অনেকেই বাস করছেন শহরের অন্ধকার ও উপেক্ষিত প্রান্তে—বেসমেন্টের একাকী, ক্লান্ত জগতে। যে ঘরে দিনের আলো ঢোকে না, জানালার বদলে থাকে কংক্রিটের দেয়াল; বাতাস ভারি হয়ে থাকে স্যাঁতসেঁতে গন্ধে। কোনো রুমে পাঁচজন, কোথাও সাতজন, আবার কোনো ঘরে দশজন মানুষ পাশাপাশি মাদুর পেতে শুয়ে আছেন। রান্না হয় পালাক্রমে, একটি চুলা ভাগ করে নেন সবাই; বাথরুমে যাওয়ার জন্য দাঁড়াতে হয় লাইনে।
এই জীবনচিত্র এখন টরন্টোর স্কারবোরো, ইটোবিকো, ব্র্যাম্পটন, নর্থ ইয়র্ক এবং কুইবেকের মন্ট্রিয়ল ও লাভালের বহু এলাকায় প্রতিদিনের বাস্তবতা।
এদের জন্য সরকার যে সামান্য ভাতা দেয়, তা দিয়ে জীবন-যাপন চলে না। অনেকেই নাম লেখান স্থানীয় খাদ্যব্যাঙ্কে।
এ শহরগুলোতে একই সঙ্গে গড়ে উঠছে দুটি কানাডা—একটি আলোকোজ্জ্বল, নথিপত্রে সংরক্ষিত; আরেকটি ছায়াময়, অপ্রকাশিত, অথচ সমানভাবে বাস্তব।
সরকারের ভাষ্য মতে, ২০১৭ সালে যখন শরণার্থী সংখ্যা হঠাৎ করে বৃদ্ধি পায়, তখন বিদ্যমান আশ্রয়কেন্দ্রগুলো কার্যত অচল হয়ে পড়ে। সে সময় “অস্থায়ী সমাধান” হিসেবে হোটেল বুকিং করা হয়।
ইমিগ্রেশন, রিফিউজি ও সিটিজেনশিপ কানাডার মুখপাত্র ইসাবেল ডুবোয়া বলেন, “হোটেল ব্যবস্থাপনা কখনোই স্থায়ী সমাধান ছিল না। আমরা স্থানীয় শেল্টার সিস্টেমকে সহায়তা করতেই হোটেলগুলো নিয়েছিলাম।”
অর্থাৎ, সরকারের অবস্থান হল—এই হোটেল একটি ট্রানজিশনাল ব্যবস্থা, যেখানে শরণার্থীরা স্বল্প সময় থাকবেন এবং পরবর্তীতে নিজেরাই সমাজে মিশে যাবেন।
তবে বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, এই অস্থায়ী ব্যবস্থাই অনেকের জন্য দীর্ঘমেয়াদে পরিণত হচ্ছে। তিন মাস, ছয় মাস, কেউ কেউ এক বছরেও হোটেল ছাড়তে পারছেন না। কারণ—বাসাভাড়া বেশি, কাজ পাওয়া কঠিন, ভাষা ও সংস্কৃতির বাধা রয়েছে।
এনডিপি’র জেনি কুয়ান বলেছেন, “হোটেলে মানুষ রাখা কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। এটি আর্থিকভাবে টেকসই না। বরং সরকারকে সাশ্রয়ী আবাসন তৈরি করতে হবে।”
কনজারভেটিভ পার্টির মিশেল রেমপেল গার্নার আরও কড়া ভাষায় বলেন, “গড় কানাডাবাসী যখন জানেন যে একজন শরণার্থী প্রতিদিন ১৩২ ডলারের হোটেলে থাকছেন, তখন এটা তাদের জন্য ন্যায্যতার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।”
বিশেষ করে বর্তমানে যখন কানাডার আবাসন খরচ হু হু করে বাড়ছে, অনেক মধ্যবিত্ত নাগরিক নিজেরাই বাসা ভাড়া দিতে হিমশিম খাচ্ছেন, তখন এই হোটেল ব্যয় নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে জনগণের মধ্যে।
একদিকে পিল রিজিওনে তৈরি হয়েছে কানাডার বৃহত্তম শরণার্থী আশ্রয় কেন্দ্র—যেখানে ২২ মিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয়ে নির্মিত হয়েছে ৬৮০ জনের আবাসনের সুব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছেই। আধুনিক সুযোগ-সুবিধা, নিরাপত্তা আর চিকিৎসা-সহায়তায় এটি যেন এক মডেল শেল্টার।
অন্যদিকে, সেই একই প্রদেশের রাজধানী টরন্টোর রাস্তায় এখনও দেখা যায় কম্বলে মোড়া মানুষ—কেউ ফুটপাতে শুয়ে, কেউ পার্কের বেঞ্চে রাত কাটাচ্ছেন খোলা আকাশের নিচে। গ্লোবাল নিউজ ও সিবিসি’র প্রতিবেদনে উঠে আসে তাদের নিঃশব্দ সংগ্রামের করুণ চিত্র—যারা এখনও আশায় থাকেন, কবে যেন মিলবে একটুকু মাথা গোঁজার ঠাঁই।
এই বৈপরীত্য শুধুই ভৌগোলিক নয়—এটি গভীরতর এক নীতিগত সংকট, সুযোগের অসম বণ্টন এবং নাগরিক মর্যাদার প্রশ্ন।
বর্তমানে IRCC বলছে, তারা অন্য প্রদেশে শরণার্থীদের স্থানান্তরের চেষ্টা করছে—যেখানে ঘরভাড়া তুলনামূলকভাবে কম এবং সরকার IHAP-এর মাধ্যমে সেই শহর বা প্রদেশকে আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে।
২০২৪ সালের বাজেটে সরকার IHAP প্রোগ্রামের মেয়াদ আরও তিন বছর বাড়িয়েছে। উদ্দেশ্য: হোটেল নয়, সাশ্রয়ী আবাসন নিশ্চিত করা। কিন্তু প্রশ্ন হল—এই ব্যবস্থাপনায় কি যথেষ্ট ঘর তৈরি হচ্ছে?
শুধু বাজেট বরাদ্দে কি আবাসনের সংকট মিটবে? নাকি এর জন্য প্রয়োজন নতুন নীতিমালা, সরকারি-বেসরকারি সমন্বয় এবং নাগরিক সহনশীলতার মানসিকতা?
শরণার্থীদের পাশে দাঁড়ানো একটি দেশের মানবিক দায়িত্ব। কিন্তু সেই দায়িত্ব পালনের নামে যদি অসমতা তৈরি হয়, যদি রাষ্ট্রীয় সম্পদ একপাক্ষিকভাবে ব্যবহৃত হয়, তবে সে দায়িত্বই একসময় প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে দাঁড়ায়।
কানাডা এক মানবিক রাষ্ট্র। সেটি যেন বজায় থাকে—সবার জন্য, সমানভাবে।
তথ্যসূত্র:
দ্য গ্লোব এণ্ড মেইল (২৩ জুলাই, ২০২৫)
ইমিগ্রেশন, রিফিউজি অ্যান্ড সিটিজেনশিপ কানাডা (IRCC)









