সম্পাদকের পাতা

শেষ বিকেলের পথিক শরীফ রহমান

নজরুল মিন্টো

শরীফ রহমান

কানাডার নীল আকাশের নিচে ছোট্ট একটি শহর—ওয়েন সাউন্ড। টরন্টো থেকে মাত্র ১৯০ কিলোমিটার দূরে। শান্ত, গম্ভীর, সরু গলি আর ইটের পুরনো বাড়িগুলো যেন প্রতিদিন গল্প বলে। একপাশে অবাধ্য লেক হুরনের হালকা বাতাস, অন্যপাশে ছায়া ফেলে দাঁড়িয়ে থাকা ম্যাপল গাছের সারি। এই শহরের বুকেই গড়ে উঠেছিল এক টুকরো বাংলাদেশ—’দ্য কারি হাউস’। এর মালিক ছিলেন শরীফ রহমান। একজন নিরীহ, হাসিমুখের মানুষ, যার জীবনে ছিল সংগ্রাম, স্বপ্ন আর অদম্য সাহসের গল্প।

সিলেট শহরের বটেশ্বর এলাকার শিক্ষিত এক পরিবারে জন্ম শরীফের। ছোটবেলা থেকেই ভেতর ছিল স্পষ্ট এক আগ্রহ—বিশ্বকে জানার, জীবনের গভীরে প্রবেশ করার। আধুনিক শহুরে পরিবেশে বেড়ে ওঠা শরীফ কখনো সীমাবদ্ধ ছিলেন না। তাঁর চারপাশে ছিল বই, আলো, মুক্তচিন্তার পরিবেশ।

তিনি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সপ্তম ব্যাচের এক মেধাবী ছাত্র ছিলেন। তারপর বিদেশযাত্রা—গ্লাসগো ইউনিভার্সিটি থেকে ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্টে মাস্টার্স, ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটি থেকে এমফিল। তাঁর ভাবনার পরিধি ছিল বৈশ্বিক, কিন্তু হৃদয়ের কেন্দ্র ছিল পরিবার আর মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতায় বাঁধা।

ডিগ্রির পর ডিগ্রি অর্জনের শেষে শরীফ সিদ্ধান্ত নিলেন, উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সব আলো তিনি ব্যয় করবেন অন্যদের জীবনকে উজ্জ্বল করার জন্য। পরিবার নিয়ে পাড়ি জমালেন কানাডায়—একটা দেশের খোলামেলা আকাশের নিচে নিজস্ব ছোট্ট পরিসরে স্বপ্ন বুনতে। আর ওয়েন সাউন্ডের এক কোণায় নিজের ছোট্ট স্বপ্নের দোকান সাজান—’দ্য কারি হাউস’।

ক্রিসমাসের সময় স্ত্রী শায়লা ও তাদের একমাত্র কন্যার সাথে শরীফ রহমান।

শুধু খাবারই নয়, ‘দ্য কারি হাউস’ হয়ে উঠেছিল মানুষে মানুষে সেতুবন্ধনের স্থান। শহরের অনেকেই শরীফকে চিনতেন। কেউ সন্ধ্যায় কাজ শেষে তার রেস্তোরাঁয় এসে এক কাপ চা খেতেন, কেউবা শুধুই একটু হাসি খুঁজতে আসতেন। শরীফ ছিলেন সবার প্রিয়।

শুধু সফল ব্যবসায়ী নন, তিনি ছিলেন সমাজের শান্তির দূত। কমিউনিটির নানা কাজে যুক্ত থেকেছেন। বাচ্চাদের ফুটবল টুর্নামেন্টে স্পন্সর করতেন, দুঃস্থদের সাহায্যে ফান্ড রেইজ করতেন। তার হাসি ছিল খোলা আকাশের মতো—নিঃস্বার্থ, নির্মল। অল্পদিনেই কমিউনিটির একজন প্রিয় মুখ হয়ে ওঠেন তিনি। নতুন কোনো অভিবাসী পরিবার এলেই শরীফ ছিলেন তাদের প্রথম ভরসাস্থল—পরামর্শদাতা, আশ্রয়দাতা, বড় ভাই।

১৭ আগস্ট ২০২৩। গ্রীষ্মের শেষভাগ। শহরটা তখনো সন্ধ্যার আলোয় ঝিমাচ্ছিল। তিনজন অপরিচিত লোক ‘দ্য কারি হাউস’-এ ঢুকলেন। অর্ডার দিলেন। খেলেন। কিন্তু যখন বিল দিতে বলা হলো, তারা চুপচাপ উঠে বাইরে চলে যেতে লাগলেন। শরীফ নিজের সরল বিশ্বাস আর আত্মসম্মানের জায়গা থেকে রেস্তোরাঁর বাইরে বেরিয়ে গিয়ে তাদের থামাতে চেষ্টা করেন। এক নিমেষে বদলে যায় দৃশ্যপট—তিনজন মিলে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। কোনো পূর্বাভাস ছিল না, কোনো আত্মরক্ষার সুযোগও না।

সেই আঘাতের নির্মমতাই ছিনিয়ে নেয় ওয়েন সাউন্ডের পরিচিত হাসিমুখকে। হাসপাতালে নেওয়া হলো। অবস্থা গুরুতর দেখে স্থানান্তর করা হলো লন্ডন, অন্টারিওর একটি উন্নত হাসপাতালে। লাইফ-সাপোর্টের ওপর ভর করে মৃত্যুর সাথে টানা সাতদিনের লড়াই।

রেস্তোরাঁর সামনের ফুটপাতে ফুলের তোড়া, হাতে লেখা চিঠি, শিশুর আঁকা ছবি—মৌন প্রার্থনা, মোমবাতির আলো, এবং অগণিত অশ্রু মিলে শহরটি শরীফের স্মৃতির একটি জীবন্ত স্তম্ভে পরিণত হয়েছিল।

হাসপাতালের কাচের জানালা ধরে তার স্ত্রী শায়লা আর সাত বছরের ছোট্ট মেয়ে তাকিয়ে থাকত বাবার দিকে—প্রতিদিন, প্রতিরাত। এক সপ্তাহের যুদ্ধ শেষে, ২৪ আগস্ট গভীর রাতে, ডাক্তাররা বললেন—শরীফ আর ফিরবেন না। সব শেষ।

ওয়েন সাউন্ডের আকাশ সেদিন নুয়ে পড়েছিল। শহরবাসী, যারা শরীফকে চিনতেন, যারা তাঁর হাসিতে সান্ত্বনা খুঁজতেন, তারা রাস্তায় নেমে এসেছিল তার বিদায়ে প্রণতি জানাতে।

শবযাত্রার দিন, মসজিদ থেকে গোরস্থানের পথে রাস্তার দু’পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষদের হাতে দেখা গেল বাংলাদেশের ছোট ছোট পতাকা। কানাডার লাল-সাদা পতাকার মাঝে সবুজ-লাল বাংলাদেশের পতাকা যেন বলে যাচ্ছিল—’তুমি আমাদেরই একজন। রেস্তোরাঁর সামনের ফুটপাতে ফুলের তোড়া, হাতে লেখা চিঠি, শিশুর আঁকা ছবি—মৌন প্রার্থনা, মোমবাতির আলো, এবং অগণিত অশ্রু মিলে শহরটি শরীফের স্মৃতির একটি জীবন্ত স্তম্ভে পরিণত হয়েছিল।

পুলিশ তদন্ত শুরু করেছিল অত্যন্ত সতর্কভাবে। হাজারের বেশি তথ্য সংগ্রহ হয়। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, হামলার পর তিনজন দ্রুত পালিয়ে যায়। এরপর জানা যায়, হামলাকারীরা কানাডা থেকে পালিয়ে যুক্তরাজ্যে চলে গেছে। কানাডা এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার যৌথ প্রচেষ্টায় কয়েক মাসের জটিল অনুসন্ধান শেষে স্কটল্যান্ডের এডিনবার্গে ধরা পড়ে তারা।

২৪ বছর বয়সী রবার্ট ইভান্স—যার বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ আনা হয়। তার বাবা, ৪৭ বছর বয়সী রবার্ট বাসবি ইভান্স এবং চাচা, ৫৪ বছর বয়সী ব্যারি ইভান্স—যাদের বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধ সংগঠনের পর সহায়তার অভিযোগ আনা হয়।

তাদের প্রত্যার্পণের আইনি প্রক্রিয়া এখনো চলছে। স্কটল্যান্ডের আদালতে তারা যুক্তি দিয়েছে- কানাডার কারাগারে নাকি অতিরিক্ত ভিড় ও সংক্রমণ আছে, তাই তাদের ফেরত পাঠানো অনুচিত।

দ্য কারি হাউস’ বন্ধ হয়নি। শায়েলা প্রতিদিন সেই রেস্তোরাঁর দরজা খোলেন। চোখের জলে, মেয়ের হাত ধরে এই যুদ্ধ তিনি চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, ন্যায়বিচার সময় নিতে পারে, কিন্তু আমি জানি, আমার স্বামীর জন্য ন্যায়বিচার আসবেই।”

ওয়েন সাউন্ড শহর তার স্মরণে একটির পর একটি উদ্যোগ নিয়েছে—ডাউনটাউনে নিরাপত্তা ক্যামেরা বসানো হয়েছে, স্থানীয় ওয়াই-এ শরীফ রহমানের নামে একটি ওক গাছ লাগানো হয়েছে, কমিউনিটি ফাউন্ডেশন তার নামে একটি মেমোরিয়াল স্কলারশিপ ফান্ড চালু করেছে। তার শান্তির কাজের স্বীকৃতি হিসেবে শরীফ রহমানকে মরণোত্তর ২০২৩ সালের YMCA পিস মেডেলিয়ন প্রদান করা হয়েছে।


Back to top button
🌐 Read in Your Language