হরমুজ প্রণালিতে পরিস্থিতি বিপজ্জনক পর্যায়ে, ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টাপাল্টি হুমকিতে বাড়ছে উত্তেজনা

তেহরান,২২ অক্টোবর- বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালিতে এখন বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে সতর্ক করেছেন সামুদ্রিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ আলেক্সান্দ্রু হুদিস্তেনু। তার মতে, দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি বক্তব্য ও হুমকি পরিস্থিতি শান্ত করার বদলে উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
সম্প্রতি হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী কয়েকটি বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানের হামলার পর এ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) দাবি করেছে, জাহাজগুলো অনুমতি ছাড়াই প্রণালিটি অতিক্রম করছিল।
আইআরজিসি সতর্ক করে বলেছে, এ ধরনের চলাচল অব্যাহত থাকলে তেহরান হামলার পরিধি আরও বাড়াতে পারে। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোও থাকতে পারে।
সামুদ্রিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ হুদিস্তেনুর মতে, ইরানের এই বক্তব্যের মাধ্যমে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর একটি তালিকার ইঙ্গিত দেওয়া হচ্ছে। আঞ্চলিক মার্কিন সামরিক ঘাঁটির পাশাপাশি মার্কিন কোম্পানিগুলোর স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনাও সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে থাকতে পারে।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রও পাল্টা কৌশলগত বার্তা দিচ্ছে। অর্থাৎ, দুই পক্ষই নিজেদের সামরিক সক্ষমতা ও সম্ভাব্য পদক্ষেপ সম্পর্কে অপর পক্ষকে সতর্ক করার চেষ্টা করছে। তবে এভাবে পাল্টাপাল্টি অবস্থান নেওয়ায় সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বাড়ছে।
হুদিস্তেনু বলেন, “এই মুহূর্তে হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি বিপদের প্রায় সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে।” তার মতে, দুই পক্ষের বক্তব্য ও হুমকির ভাষা উত্তেজনা কমাতে কোনো সহায়তা করছে না।
আলোচনা এগোচ্ছে না
হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে চলমান উত্তেজনা কমানোর প্রচেষ্টাও কঠিন হয়ে উঠেছে বলে মনে করেন এই সামুদ্রিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ। তার মতে, দুই পক্ষের মধ্যে মতপার্থক্য এতটাই গভীর যে আলোচনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
হুদিস্তেনু বলেন, আলোচনাগুলো অত্যন্ত জটিল এবং এগিয়ে নেওয়াও কঠিন। কারণ, এই মুহূর্তে মৌলিক বিষয়গুলোতেও দুই পক্ষের মধ্যে কার্যত কোনো ঐকমত্য নেই।
এ পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়ছে। ইরান যদি হামলার পরিধি বাড়ায় এবং যুক্তরাষ্ট্রও পাল্টা পদক্ষেপ নেয়, তাহলে সামুদ্রিক পরিবহন ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার ওপর গুরুতর প্রভাব পড়তে পারে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি
হরমুজ প্রণালি পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। বিশ্বের জ্বালানি বাণিজ্যের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নৌপথ। বিশ্বে ব্যবহৃত মোট তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশের সমপরিমাণ তেল এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়। তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) আন্তর্জাতিক সরবরাহের ক্ষেত্রেও এই নৌপথের গুরুত্ব অনেক।
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাসের সরবরাহ কমে যেতে পারে। এর ফলে জ্বালানির দাম বাড়া, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন চাপ তৈরির আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল এশীয় দেশগুলো হরমুজ প্রণালিতে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতার কারণে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
সব মিলিয়ে, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের সাম্প্রতিক হামলা, মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলার হুঁশিয়ারি এবং দুই পক্ষের অনড় অবস্থান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। আলোচনায় অগ্রগতি না হলে এই উত্তেজনা আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে। পাশাপাশি বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও বাণিজ্যের ওপরও বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
এস এম/ ২২ অক্টোবর ২০২৬







