দক্ষিণ এশিয়া

জ্বালানি সংকট বাড়লে পাকিস্তানে পেট্রোলের দাম ১ হাজার রুপি হতে পারে

পাকিস্তানে পেট্রোলের দাম ১ হাজার রুপি হতে পারে

ইসলামাবাদ,২৩ সেপ্টেম্বর- মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত ও গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্নের প্রভাব পড়ছে পাকিস্তানের জ্বালানি বাজারে। এরই মধ্যে দেশটিতে পেট্রোলের দাম অনেক বেড়েছে। পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়ে জ্বালানি সংকট দেখা দিলে প্রতি লিটার পেট্রোলের দাম ১ হাজার পাকিস্তানি রুপি পর্যন্ত উঠতে পারে বলে সতর্ক করেছেন দেশটির পেট্রোলিয়ামমন্ত্রী আলী পারভেজ মালিক।

তবে ১ হাজার রুপি বর্তমান দাম নয়; সম্ভাব্য জ্বালানি ঘাটতি হলে কী পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, সে বিষয়ে এটি একটি সতর্কবার্তা। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ১৯ সেপ্টেম্বর থেকে পাকিস্তানে পেট্রোলের দাম ছিল প্রতি লিটার ৩৮৯.১৪ রুপি। পরে ২৩ সেপ্টেম্বরের জন্য সরকার দাম কিছুটা কমিয়ে ৩৯২.০৫ রুপি নির্ধারণ করেছে।

কীভাবে এতটা বাড়ল দাম

মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরুর পর আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দামে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দেয়। পাকিস্তানে ১ মার্চ পেট্রোলের দাম ছিল ২৬৬.১৭ রুপি। ৭ মার্চ তা বেড়ে ৩২১.১৭ রুপিতে ওঠে। এপ্রিলের শুরুতে দাম আরও বেড়ে ৪৫৮.৪১ রুপিতে পৌঁছায়। পরে আন্তর্জাতিক বাজারে কিছুটা স্বস্তি ফিরলে জুনে তা কমে ২৯৯.৫০ রুপিতে নেমে আসে। এরপর আবার দাম বাড়তে শুরু করে এবং সেপ্টেম্বরে তা ৩৮৯ রুপির কাছাকাছি পৌঁছে যায়। আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার কারণে পাকিস্তান জুলাই থেকে জ্বালানির দাম নির্ধারণে দৈনিক পর্যালোচনার ব্যবস্থা চালু করে। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে কয়েক দফায় দাম বাড়ার পর দেশটিতে পেট্রোলের দাম ৩৭০.৮০ রুপিতে উঠেছিল। একই সময়ে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১০০ ডলারের ওপরে চলে যায়।

আমদানিনির্ভর হওয়ায় বেশি ঝুঁকিতে পাকিস্তান

জ্বালানি সংকটের ক্ষেত্রে পাকিস্তানের বড় দুর্বলতা হলো আমদানিনির্ভরতা। এনডিটিভির প্রতিবেদনে দেওয়া সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পাকিস্তান ৫৩.৫ লাখ টন মোটর স্পিরিট বা পেট্রোল আমদানি করেছে। একই সময়ে দেশটির স্থানীয় শোধনাগারগুলো থেকে সরবরাহ হয়েছে প্রায় ২৬.৩ লাখ টন এবং তেল বিপণন কোম্পানিগুলো বিক্রি করেছে প্রায় ৭৬.৮ লাখ টন। আমদানির পরিমাণ বিপণন কোম্পানিগুলোর মোট বিক্রির প্রায় ৬৯.৭ শতাংশের সমান। তবে এসব পরিসংখ্যান সরবরাহ ব্যবস্থার ভিন্ন ভিন্ন পর্যায়ের তথ্য হওয়ায় এগুলোকে সরাসরি আমদানি ও স্থানীয় উৎপাদনের শতকরা ভাগ হিসেবে দেখা ঠিক নয়। তারপরও দেশটির জ্বালানি ব্যবস্থায় আমদানির ওপর বড় ধরনের নির্ভরতা রয়েছে।

হরমুজ সংকটে বাড়ছে চাপ

পাকিস্তানের জ্বালানি সংকট আরও তীব্র হওয়ার অন্যতম কারণ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বড় ধরনের বাধা। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের ২১ তারিখে মাত্র দুটি পণ্যবাহী জাহাজ হরমুজ অতিক্রম করেছে। সংঘাত শুরুর আগে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১২৫টি বড় বাণিজ্যিক জাহাজ এই নৌপথ ব্যবহার করত। হরমুজ দিয়ে বিশ্বের বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস পরিবহন করা হয়। ফলে এই নৌপথে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা তৈরি হলে শুধু অপরিশোধিত তেলের দামই নয়, পরিবহন, বিমা ও জ্বালানি আমদানির সামগ্রিক ব্যয়ও বাড়ে।

পাকিস্তানের ক্ষেত্রে এর প্রভাব এরই মধ্যে দেখা যাচ্ছে। রয়টার্স জানিয়েছে, জ্বালানির দাম বাড়তে থাকায় সরকার সরকারি যানবাহনে জ্বালানি বরাদ্দ কমানো, নতুন সরকারি গাড়ি কেনা বন্ধ এবং কর্মকর্তাদের বিদেশ সফর ও সরকারি নৈশভোজে বিধিনিষেধসহ বিভিন্ন কৃচ্ছ্রসাধনমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে। একই সঙ্গে মোটরসাইকেল, রিকশা ও ছোট গাড়ির মালিকদের জন্য সীমিত পরিমাণ জ্বালানি ভর্তুকিও চালু করা হয়েছে।

সংকট বাড়লে কী হবে

জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিলে পাকিস্তানের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। পেট্রোলের দাম বাড়ার সঙ্গে পরিবহন ব্যয়, পণ্য পরিবহন এবং সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে জ্বালানি আমদানির বাড়তি ব্যয় দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়াবে।

এ কারণেই পাকিস্তানের পেট্রোলিয়ামমন্ত্রী ১ হাজার রুপি লিটারের সম্ভাব্য মূল্যের বিষয়ে সতর্ক করেছেন। তবে এটি কোনো সরকারি মূল্য ঘোষণা নয়; জ্বালানি ঘাটতি তৈরি হলে সম্ভাব্য চরম পরিস্থিতি সম্পর্কে দেওয়া একটি সতর্কবার্তা। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের গতিপথই শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানের বাজারে এর প্রভাব কতটা হবে, তা নির্ধারণ করবে।

এস এম/ ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

 

Back to top button
🌐 Read in Your Language