ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নতুন করে সাজাতে চায় নেপাল: অর্থমন্ত্রী ওয়াগলে

কাঠমান্ডু, ২২ সেপ্টেম্বর- নেপালের অর্থমন্ত্রী স্বর্ণিম ওয়াগলে বলেছেন, পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নতুন করে সাজাতে চায় বালেন্দ্র শাহের নেতৃত্বাধীন সরকার। দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে পুনর্গঠন, যোগাযোগব্যবস্থা, বাণিজ্য, বিমান চলাচল ও জ্বালানি খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
ভারতের অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমনের আমন্ত্রণে তিন দিনের ভারত সফর শেষে শনিবার কাঠমান্ডুতে ফিরে ওয়াগলে এসব কথা বলেন।
ভারতের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সীমান্তবিরোধের মতো স্পর্শকাতর বিষয় এড়িয়ে যাওয়ার কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই বলেও জানান তিনি। তবে এসব ইস্যু ‘গঠনমূলকভাবে’ সমাধানের ওপর জোর দিতে চান তারা।
ভারতের সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দু-এর কূটনৈতিক সম্পাদক সুহাসিনী হায়দারের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে ওয়াগলে বলেন, নেপাল-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি ‘নতুন অধ্যায়’ শুরু করতে চায় শাহ সরকার। পুরোনো জাতীয়তাবাদী বক্তব্য ও ভারতবিরোধী মনোভাবের রাজনীতি থেকে সরে এসে অর্থনৈতিক সুযোগ, যোগাযোগব্যবস্থা সম্প্রসারণ, ভারতের সরবরাহশৃঙ্খলে নেপালের আরও বেশি সম্পৃক্ততা এবং দুই দেশের বাণিজ্য চুক্তি আধুনিকায়নের দিকে মনোযোগ দিতে চায় কাঠমান্ডু।
ওয়াগলের ভাষায়, নেপালি জাতীয়তাবাদকে ভারতবিরোধিতার সঙ্গে এক করে দেখার পুরোনো রাজনৈতিক ধারা এখন শেষ হয়েছে।
তিনি্যতেও উত্থাপন করবে বলে জানিয়েছেন ওয়াগলে। তবে এসব ইস্যুকে দুই দেশের সামগ্রিক সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলতে না দিয়ে কূটনৈতিক ও গঠনমূলক উপায়ে বলেন, “উগ্র জাতীয়তাবাদ এবং নেপালি জাতীয়তাবাদকে ভারতবিরোধিতার সঙ্গে এক করে দেখার পুরোনো যুগ শেষ হয়েছে।”
ভারতের সঙ্গে সীমান্তবিরোধসহ বিতর্কিত বিষয়গুলো নেপাল ভবিষ্যতেও উত্থাপন করবে বলে জানিয়েছেন ওয়াগলে। তবে এসব ইস্যুকে দুই দেশের সামগ্রিক সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলতে না দিয়ে কূটনৈতিক ও গঠনমূলক উপায়ে সমাধানের চেষ্টা করা হবে।
নতুন সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল, অর্থমন্ত্রী স্বর্ণিম ওয়াগলে এবং রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টির (আরএসপি) সভাপতি রবি লামিছানে—সবাই বলেছেন, সীমান্তবিরোধ রাজপথে জনমত সংগঠিত করার মাধ্যমে নয়, বরং কূটনৈতিক আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে সমাধান করা উচিত।
অর্থাৎ, সীমান্ত ইস্যুকে নেপালের জাতীয় স্বার্থের অংশ হিসেবে ধরে রাখলেও তা যেন ভারতবিরোধী রাজনৈতিক আবেগ উসকে দেওয়ার হাতিয়ার না হয়, সরকারের অবস্থান এখন সেদিকেই।
চলতি বছরই ভারত সফরে যেতে পারেন বালেন্দ্র শাহ
নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়েও কথা বলেছেন ওয়াগলে।
তিনি জানান, বালেন্দ্র শাহের প্রথম দ্বিপক্ষীয় বিদেশ সফর হিসেবে ভারত সফরের সম্ভাবনা রয়েছে এবং ২০২৬ সালের শেষ হওয়ার আগেই এই সফর হতে পারে।
কাঠমান্ডুর সূত্রগুলোর বরাতে জানা গেছে, দশাইন ও তিহার উৎসবের মধ্যবর্তী সময়ে বালেন্দ্র শাহের ভারত সফর হতে পারে।
নেপালের নতুন সরকারের জন্য এই সফরকে দুই দেশের সম্পর্ক পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
চীনের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়েও ভারতের উদ্বেগ স্বীকার
নেপালের অর্থমন্ত্রী চীনের সঙ্গে তার দেশের ক্রমবর্ধমান সম্পর্ক নিয়ে ভারতের উদ্বেগের কথাও স্বীকার করেছেন। বিশেষ করে জ্বালানি ও অবকাঠামো খাতে চীনের সম্পৃক্ততা নিয়ে ভারতের কিছু উদ্বেগ রয়েছে বলে জানান তিনি।
তবে ওয়াগলের বক্তব্য, বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যেই নেপালকে নিজের জাতীয় স্বার্থ এগিয়ে নিতে হবে।
চীনের সঙ্গে নেপালের বাড়তে থাকা সম্পৃক্ততা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, “নেপালকে এই নতুন ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যেই কাজ করতে হবে।”
নেপালের জ্বালানি প্রকল্পে চীনা অর্থায়ন থাকলে সেখান থেকে বিদ্যুৎ কিনতে ভারতের অনীহার বিষয়েও কথা বলেন তিনি। ওয়াগলের মতে, এটিই বর্তমানের ‘নতুন ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা’, যা নেপালকে মেনে নিয়ে তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এগোতে হবে।
চীনের অর্থায়ন নিয়ে ‘অতিরঞ্জিত ধারণা’
নেপালে চীনের প্রভাব নিয়ে যে ধারণা তৈরি হয়েছে, তার সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে বলে মনে করেন ওয়াগলে।
তিনি ২০০৯ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে চীনের ব্যাংকঋণের প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলেন, ওই সময় নেপাল বড় ধরনের চীনা ব্যাংকঋণ থেকে কিছুই পায়নি। তার ভাষায়, নেপাল ‘শূন্য’ পরিমাণ ঋণ পেয়েছে।
অথচ নেপালের বড় বড় প্রকল্পে চীন বিপুল অর্থ ঢালছে বা দেশটির অর্থনীতিকে চীন অর্থায়ন করছে—এমন ধারণা অনেকের মধ্যে রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ওয়াগলের দাবি, নেপালে চীনের ছোট আকারের কমিউনিটি উন্নয়ন কর্মসূচির পরিমাণ ভারতের একই ধরনের কর্মসূচির সঙ্গে মোটামুটি তুলনীয়। উভয় ক্ষেত্রেই এর পরিমাণ প্রায় ৮০০ কোটি নেপালি রুপি। তবে চীনের পক্ষ থেকে নেপালের গুরুত্বপূর্ণ বৃহৎ প্রকল্পগুলোতে যে বিপুল অতিরিক্ত অর্থায়ন করা হচ্ছে বলে ধারণা রয়েছে, বাস্তবে তা ততটা নয় বলে দাবি করেন তিনি।
তার মতে, নেপালে চীনের সম্পৃক্ততা মূলত পর্যটন এবং কিছু অবকাঠামো প্রকল্পের অর্থায়নকে কেন্দ্র করে। টেলিযোগাযোগসহ আরও কয়েকটি খাতেও চীনের সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে তিনি স্বীকার করেন।
তবে নেপালকে চীন ‘দখল করে নিচ্ছে’—ভারতে এমন যে ধারণা রয়েছে, সেটিকে অতিরঞ্জিত বলে মনে করেন ওয়াগলে।
পোখারা বিমানবন্দর নিয়েও বিতর্ক
নেপালের পোখারা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর প্রকল্পে চীনের ভূমিকা নিয়েও কথা বলেন ওয়াগলে।
তিনি এই প্রকল্পে চীনের ভূমিকা নিয়ে কিছুটা অস্পষ্টতার কথা উল্লেখ করেন। চীন প্রকল্পটিকে ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ বা বিআরআইয়ের আওতাভুক্ত প্রকল্প হিসেবে উল্লেখ করে। তবে ওয়াগলের দাবি, বিআরআই চালু হওয়ার আগেই প্রকল্পটি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে চুক্তি হয়েছিল।
পোখারা বিমানবন্দরসহ নেপালে চীনের মোট অর্থায়নের পরিমাণ প্রায় ২৬ কোটি ডলার বলে উল্লেখ করেন তিনি।
চীনা কোম্পানিকে পুরোপুরি বাদ দেওয়ার দাবি নেই ভারতের
নেপালের অর্থমন্ত্রী বলেন, ভারত নেপালকে সব খাত থেকে চীনা কোম্পানিকে বাদ দিতে বলেনি। বরং যেসব প্রকল্প থেকে ভারত বিদ্যুৎ কিনবে, সেসব প্রকল্পে চীনের সম্পৃক্ততা নিয়ে ভারতের বিশেষ উদ্বেগ রয়েছে।
ভারতের এই অবস্থান এখন স্পষ্ট হওয়ায় নেপালের জন্যও বিষয়টি ইতিবাচক বলে মনে করেন ওয়াগলে। কারণ, এতে ভারতীয় বাজারের জন্য বিদ্যুৎ উৎপাদন ও অবকাঠামো প্রকল্প পরিকল্পনার সময় কাঠমান্ডু বিষয়টি বিবেচনায় নিতে পারবে।
তিনি বলেন, ভারতের অবস্থান এখন স্পষ্ট হওয়ায় নেপালও সেই বাস্তবতা অনুযায়ী নিজেদের পরিকল্পনা সাজাতে পারবে।
চীনকে ঘিরে আঞ্চলিক সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রেও ‘এক ধরনের আতঙ্ক বা অতিরিক্ত উদ্বেগ’ রয়েছে বলে মনে করেন ওয়াগলে। তার যুক্তি, নেপালে চীনের আধিপত্য নিয়ে যে ধারণা প্রচলিত রয়েছে এবং বাস্তবে চীনের অর্থায়নের যে পরিমাণ—দুটির মধ্যে যথেষ্ট ব্যবধান রয়েছে।
দিল্লির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়াতে চায় কাঠমান্ডু
ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে যোগাযোগব্যবস্থাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন ওয়াগলে।
তিনি নেপালের সঙ্গে ভারতের বিমান যোগাযোগ বাড়ানো, রেলপথ সম্প্রসারণ, সমন্বিত স্থলবন্দর বা ইন্টিগ্রেটেড চেকপোস্ট উন্নয়ন এবং নেপালের সীমান্তবর্তী শহরগুলোর সঙ্গে ভারতের অভ্যন্তরীণ অঞ্চলগুলোর সড়ক যোগাযোগ আরও শক্তিশালী করার আহ্বান জানিয়েছেন।
একই সঙ্গে নেপাল-ভারত বাণিজ্য চুক্তি হালনাগাদ করার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছেন তিনি।
ওয়াগলে জানান, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর এবং অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমনের সঙ্গে বৈঠকেও তিনি বাণিজ্য চুক্তিটি আধুনিকায়নের বিষয়টি তুলেছেন।
নেপালের অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যে স্পষ্ট, কাঠমান্ডু এখন ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে শুধু রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা ইস্যুর মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে অর্থনীতি, বাণিজ্য, জ্বালানি ও আঞ্চলিক যোগাযোগের বৃহত্তর কাঠামোর মধ্যে দেখতে চাইছে।
একই সঙ্গে চীনের সঙ্গে সম্পর্কও পুরোপুরি ছিন্ন না করে বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে এগিয়ে যাওয়ার নীতির কথাই তুলে ধরেছেন ওয়াগলে। ফলে শাহ সরকারের পররাষ্ট্রনীতিতে ভারত ও চীনের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন ভারসাম্যের একটি ইঙ্গিতও পাওয়া যাচ্ছে।
এস এম/ ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬







