
অটোয়া, ১৪ সেপ্টেম্বর- কখনো কখনো একটি সন্ধ্যা শেষ হয়ে যায়, কিন্তু তার রেশ থেকে যায় অনেকক্ষণ। মঞ্চ গুটিয়ে যায়, দর্শকেরা ঘরে ফেরেন, তবু কানে লেগে থাকে কোনো আলাপের বিস্তার, কোনো তানের ওঠানামা কিংবা তবলার নিখুঁত কোনো বোল। শনিবার সন্ধ্যায় টরন্টোর হোপ চার্চের অডিটোরিয়ামে তেমনই এক সংগীতসন্ধ্যার সাক্ষী হলেন দর্শক-শ্রোতারা।
আয়োজনটি ছিল সংগীতের আবেশে পরিপূর্ণ। নগরীর প্রখ্যাত আইনজীবী ব্যারিস্টার সূর্য চক্রবর্তী ও তাঁর টিমের আয়োজনে এ সন্ধ্যার মূল আকর্ষণ ছিলেন তরুণ শাস্ত্রীয় কণ্ঠশিল্পী দেবর্ষি ভট্টাচার্য। তবলায় তাঁর সঙ্গে ছিলেন চিরঞ্জিত মুখার্জি।
সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় শুরু হওয়া আসর চলে রাত ১০টা পর্যন্ত। একের পর এক পরিবেশনায় দেবর্ষি ভট্টাচার্য কখনো ধীরলয়ের নিবিড়তায়, কখনো সুরের সূক্ষ্ম অলংকরণে ধরে রাখেন হলভর্তি দর্শক-শ্রোতাকে। প্রায় আড়াই ঘণ্টার সেই পরিবেশনায় কোনো বাহুল্যের প্রয়োজন হয়নি। ছিল কণ্ঠ, সুর আর সাধনার শক্তি।
সেই কণ্ঠের পাশে চিরঞ্জিত মুখার্জির তবলা কখনো সঙ্গী, কখনো যেন কথোপকথনের দ্বিতীয় কণ্ঠ। দেবর্ষি যখন সুরকে ধীরে ধীরে বিস্তার দিয়েছেন, চিরঞ্জিতের তবলা তখন তাকে দিয়েছে চলার ছন্দ। আবার দ্রুত লয়ের মুহূর্তে দুই শিল্পীর বোঝাপড়া তৈরি করেছে অন্যরকম উত্তেজনা। শাস্ত্রীয় সংগীতে কণ্ঠ ও তবলার এই দেওয়া-নেওয়ার মধ্যেই যে সৌন্দর্য, সন্ধ্যায় তার স্বাদ পেয়েছেন শ্রোতারা।
দর্শক-শ্রোতাদের বড় অংশই ছিলেন টরন্টোর সাংস্কৃতিক অঙ্গনের পরিচিত মুখ। ফলে এটি শুধু একটি সংগীতানুষ্ঠান হয়ে থাকেনি, হয়ে উঠেছিল শিল্পী, সংগীতপ্রেমী ও সংস্কৃতিকর্মীদের এক অন্তরঙ্গ মিলনমেলা। অনুষ্ঠানটি ছিল সম্পূর্ণ আমন্ত্রণভিত্তিক, কোনো টিকিটের ব্যবস্থা ছিল না। বড় কোনো বাণিজ্যিক আয়োজনের আনুষ্ঠানিকতার বদলে পুরো সন্ধ্যাতেই ছিল আন্তরিকতার উষ্ণ ছোঁয়া। অনুষ্ঠানের উপস্থাপনায় ছিলেন ফারহানা মোতাহের। তাঁর সাবলীল, স্বচ্ছন্দ ও পরিমিত উপস্থাপনা পুরো আয়োজনকে দিয়েছে সুন্দর গতি।
দেবর্ষি ভট্টাচার্যের সংগীতযাত্রা শুরু খুব ছোটবেলায়। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে মা শ্রীমতী রীনা ভট্টাচার্যের কাছে তাঁর সংগীতে হাতেখড়ি। গোয়ালিয়র ঘরানার শিক্ষায় বেড়ে ওঠা দেবর্ষি পরে কিংবদন্তি সংগীতাচার্য পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তীর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। বর্তমানে তিনি আইটিসি সংগীত রিসার্চ একাডেমির সিনিয়র সংগীত প্রশিক্ষক এবং শ্রুতিনন্দনের সিনিয়র শিক্ষক। তিনি অল ইন্ডিয়া রেডিওর ‘এ-গ্রেড’ শিল্পী এবং ভারত সরকারের ইন্ডিয়ান কাউন্সিল ফর কালচারাল রিলেশনস বা ICCR-এর তালিকাভুক্ত শিল্পী। যুক্তরাষ্ট্রের NABC, ঢাকার Bengal Foundation এবং টরন্টোর RaagMala-সহ দেশ-বিদেশের বহু গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চে তিনি সংগীত পরিবেশন করেছেন। শাস্ত্রীয় সংগীতের বাইরেও বলিউডের ‘Rukh’, বাংলা চলচ্চিত্র ‘বিসমিল্লাহ’ এবং ওয়েব সিরিজ ‘রুদ্রবীণার অভিশাপ’-এ কণ্ঠ দিয়েছেন তিনি।
চিরঞ্জিত মুখার্জিও দীর্ঘ সাধনার শিল্পী। শ্রী শৈলেন কুমার চক্রবর্তীর কাছে তাঁর প্রাথমিক তালিম শুরু। পরে তিনি কিংবদন্তি তবলাশিল্পী পণ্ডিত কুমার বসুর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চতর সংগীতশিক্ষা নেওয়া চিরঞ্জিত দেশে-বিদেশে বহু গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চে তবলা পরিবেশন করেছেন। লন্ডন, সিঙ্গাপুর ও অস্ট্রেলিয়া থেকে শুরু করে কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন আয়োজনে তাঁর অংশগ্রহণ রয়েছে। তীক্ষ্ণ বোল, গভীর তালবোধ ও সংবেদনশীল সঙ্গতের জন্য তিনি বিশেষভাবে পরিচিত।

শাস্ত্রীয় সংগীতের আসরে তাড়াহুড়োর জায়গা কম। সেখানে সুরকে সময় দিতে হয়, শুনতে হয় ধীরে ধীরে। এ সন্ধ্যায় শিল্পী ও শ্রোতার সেই যোগাযোগও ছিল বিশেষভাবে প্রাণবন্ত। গানের ফাঁকে দেবর্ষির কথোপকথন, শ্রোতাদের সাড়া এবং মঞ্চের সঙ্গে হলভর্তি মানুষের সহজ যোগসূত্র অনুষ্ঠানটিকে আরও আন্তরিক করে তুলেছিল।
টরন্টোর মতো ব্যস্ত শহরে প্রায় প্রতিদিনই নানা আয়োজন হয়। কিন্তু কিছু সন্ধ্যার আবেদন থাকে অন্য জায়গায়। সেখানে শিল্পী আর শ্রোতার মাঝখানের দূরত্ব ক্রমেই কমে আসে। মঞ্চ থেকে ভেসে আসা সুর একসময় যেন পুরো হলের মানুষের ব্যক্তিগত অনুভূতির অংশ হয়ে ওঠে।
হোপ চার্চের সেই সন্ধ্যায় এমন অনেক মুহূর্ত তৈরি হয়েছিল, যা অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পরও সঙ্গে নিয়ে ফিরেছেন শ্রোতারা। তাঁদের কথায় ছিল মুগ্ধতার ছাপ, ছিল এমন একটি ব্যতিক্রমী সংগীতসন্ধ্যা উপহার দেওয়ার জন্য ব্যারিস্টার সূর্য চক্রবর্তী ও তাঁর টিমের প্রতি কৃতজ্ঞতা।







