
টরন্টো, ২৬ আগস্ট – সকাল থেকে টরন্টোর আকাশের মন ভালো ছিল না। কখনো টিপটিপ, কখনো ঝমঝম বৃষ্টি। গাছের পাতায় পাতায় জমে থাকা জল বাতাসের সামান্য দোলায় টুপটাপ ঝরে পড়ছিল নিচে। চারদিকে ছায়াঘেরা বনাঞ্চল, তার মাঝখানে খোলা মাঠ আর সেই মাঠের বুক চিরে তৈরি করা হয়েছে একটি মঞ্চ। সন্ধ্যায় এখানে নাচ হবে। শিশুরা নাচবে, বড়রা নাচবেন, ঢাক বাজবে, ঝুমুরের তালে দুলবে চারপাশ। কিন্তু আকাশের দিকে তাকিয়ে দুপুর পর্যন্ত কে-ই বা নিশ্চিত করে বলতে পারতেন, শেষ পর্যন্ত সত্যিই মঞ্চে আলো জ্বলবে!


আয়োজকেরা অবশ্য আকাশের সঙ্গে আগেই যেন একরকম বোঝাপড়া করে রেখেছিলেন। গীতাঞ্জলি মিউজিক একাডেমির সীমা বড়ুয়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছিলেন, ‘আজ রোদ হোক কিংবা বৃষ্টি, আমরা কিন্তু নাচবোই!’ কথাটার মধ্যে ছিল আনন্দ, আবার খানিকটা চ্যালেঞ্জও। সকাল থেকে বৃষ্টি যেন সেই চ্যালেঞ্জেরই জবাব দিয়ে যাচ্ছিল। দর্শকদের কেউ কেউ দোটানায় পড়ে গেলেন। যাবেন কি যাবেন না? বৃষ্টি কি থামবে? খোলা মাঠে নাচের অনুষ্ঠান কি শেষ পর্যন্ত সম্ভব হবে?



বিকেল গড়িয়ে পাঁচটা ছুঁতেই দৃশ্যটা বদলে গেল। বৃষ্টি থামল। মেঘ তখনো আকাশজুড়ে, গাছের পাতা তখনো ভেজা, ঘাসের গায়ে জলের আভা। কিন্তু ওপর থেকে আর জল নামছে না। মনে হলো, প্রকৃতি বুঝি শেষ পর্যন্ত নৃত্যশিল্পীদের জন্য পথ ছেড়ে দিল।


তারপর একে একে দর্শক, অতিথি ও অংশগ্রহণকারীরা আসতে শুরু করলেন। কেউ শিশুর হাত ধরে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে, কেউবা নাচের পোশাক আগলে। একটু আগেও যে মাঠে বৃষ্টির শব্দ ছিল, সেখানে ধীরে ধীরে জমতে লাগল মানুষের কোলাহল। শিশুদের ছোটাছুটি, পরিচিত মুখের সঙ্গে দেখা হওয়ার উচ্ছ্বাস, শিল্পীদের শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি, পোশাক ঠিক করা, চুলে ফুল গোঁজা, মঞ্চের পাশে চাপা উত্তেজনা। সন্ধ্যা নামার আগেই নিস্তরঙ্গ সবুজ প্রান্তরটি যেন বদলে গেল রঙ, শব্দ আর প্রত্যাশার এক ছোট্ট জনপদে।


গত রোববার, ২৩ আগস্ট বিকেল ৬টায় প্রদীপ প্রজ্জ্বলনের মধ্য দিয়ে উদ্বোধন হলো গীতাঞ্জলি মিউজিক একাডেমির নৃত্যানুষ্ঠান ‘আজি আনন্দে নাচো’, ইংরেজিতে ‘Dance for Joy’। নামের মধ্যেই যেন আয়োজনের উদ্দেশ্য লেখা ছিল। প্রতিযোগিতা নয়, প্রদর্শনের অহংকারও নয়, নাচের আনন্দকে ভাগ করে নেওয়াই ছিল এই সন্ধ্যার মূল সুর।

গীতাঞ্জলি মিউজিক একাডেমির পক্ষ থেকে সীমা বড়ুয়া ও সুকন্যা নৃত্যাঙ্গনের অরুণা হায়দার মঞ্চে আমন্ত্রণ জানান টরন্টোর নৃত্যাঙ্গনের পরিচিত মুখ ইত্তেলা আলী, মিথুন রেজা, গার্গী লাহিড়ী ও চিত্রা দাসকে। একে একে জ্বলে ওঠে প্রদীপের শিখা। সন্ধ্যার মৃদু আলোয় সেই ছোট ছোট শিখাগুলোই যেন হয়ে ওঠে অনুষ্ঠানের প্রথম নৃত্যভঙ্গি।

ঠিক তখনই বেজে ওঠে ঢাক। ঢাকের তালে গীতাঞ্জলির শিল্পীরা দর্শকদের আসনের চারদিকে প্রদক্ষিণ করেন। কোথাও শিশুর হাসি, কোথাও হাততালি, কোথাও মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকা চোখ। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই দর্শক আর মঞ্চের দূরত্ব যেন খানিকটা কমে আসে।

প্রথম নিবেদন ছিল ‘পুষ্পাঞ্জলি’। শ্রদ্ধা, ভক্তি ও নিবেদনের ভঙ্গিতে গুরু ও ঈশ্বরকে প্রণতি জানিয়ে শিল্পীরা মঞ্চে এলেন। নৃত্যের প্রথম পদক্ষেপ থেকেই যেন সন্ধ্যার একটি ভাষা তৈরি হলো। সেই ভাষায় কথা বলছিল হাতের মুদ্রা, চোখের দৃষ্টি, পায়ের ছন্দ আর শরীরের দোল।


তারপর সন্ধ্যা এগিয়েছে নাচের পর নাচে। কখনো দেশাত্মবোধক সুর, কখনো রবীন্দ্রনাথ, কখনো নজরুল, কখনো বাংলার লোকজ ছন্দ। একেকটি পরিবেশনার সঙ্গে বদলেছে মঞ্চের রং, বদলেছে আবহ। কখনো কোমল, কখনো তেজি, কখনো উৎসবমুখর। বাংলা নৃত্যের নানা ধারাকে এক সুতোয় গেঁথে সাজানো হয়েছিল পুরো আয়োজন।


তবে এই অনুষ্ঠানের সৌন্দর্য শুধু প্রশিক্ষিত শিল্পীদের নিখুঁত পদক্ষেপে ছিল না। তার চেয়েও বড় আনন্দ ছিল অনেক নতুন মুখের মঞ্চে ওঠা। কারও জীবনের এটাই প্রথম নৃত্য পরিবেশনা। হয়তো পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে বুক ধুকপুক করছিল, হয়তো প্রথম কয়েকটি পদক্ষেপে ছিল সামান্য জড়তা। কিন্তু সুর শুরু হলে ভয় কোথায় যেন মিলিয়ে গেল।


আবার কেউ কেউ অনেক বছর পর ফিরে এসেছেন মঞ্চে। জীবনের ব্যস্ততা, সংসার, কাজ, সময়ের দূরত্ব, কত কিছু পেরিয়ে একদিন যে পায়ে নূপুর বেঁধেছিলেন, সেই পা আবার ছন্দ খুঁজে নিয়েছে। তাঁদের জন্য হয়তো কয়েক মিনিটের একটি নাচ কেবল একটি পরিবেশনা ছিল না, ছিল বহুদিন আগের নিজের কাছে ফিরে যাওয়া।
সেই সন্ধ্যায় তাই মঞ্চে শুধু নৃত্যই হয়নি, কিছু স্বপ্নও ফিরে এসেছে। নতুন কারও স্বপ্নের শুরু হয়েছে, পুরোনো কারও স্বপ্ন আবার আলো দেখেছে।

গীতাঞ্জলি মিউজিক একাডেমির শিল্পীদের পাশাপাশি অনুষ্ঠানে অংশ নেয় টরন্টোর আরও কয়েকটি নৃত্যদল। অরুণা হায়দারের সুকন্যা নৃত্যাঙ্গন, ইত্তেলা আলীর IMCL, চিত্রা দাসের সুর ঝঙ্কার, গার্গী লাহিড়ী এবং Rhythm of Souls-এর শিল্পীরাও নিজেদের পরিবেশনা নিয়ে মঞ্চে আসেন। এক দল থেকে আরেক দল, এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্ম, সবাই মিলে সন্ধ্যাটিকে তৈরি করেন বাংলা নৃত্যের এক মিলনমেলায়।


আর সেই মিলনমেলার সবচেয়ে সুন্দর দিকগুলোর একটি ছিল বাংলা ভাষাভাষী নয়, এমন শিশু-কিশোরদের অংশগ্রহণ। বাংলা তাদের ঘরের ভাষা নয়, কিন্তু বাংলা গানের সুরে তাদের পা থেমে থাকেনি। হাতের ভঙ্গি, মুখের অভিব্যক্তি, ছন্দের সঙ্গে শরীরের দোল, সবকিছুতেই ছিল আন্তরিকতা।

প্রবাসে সংস্কৃতির পথটা এমনই। কখনো তা ঘরের ভেতর থেকে বাইরে আসে, কখনো নিজের ভাষার সীমানা পেরিয়ে অন্য ভাষার শিশুর হাত ধরে। সেদিন খোলা আকাশের নিচে বাংলা নাচে অন্য সংস্কৃতির ছেলে-মেয়েদের অংশ নিতে দেখে মনে হচ্ছিল, সংস্কৃতি আসলে কোনো কাঁটাতার মানে না। সুর যদি হৃদয়ে পৌঁছায়, ছন্দের ভাষা বুঝতে অভিধান লাগে না।



অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া শিল্পীদের মধ্যে ছিলেন আরিয়ানা, সুমিষ্টা, অস্মিতা, প্রান্তি, ইরা, সুকন্যা, রোদেলা, আস্থা, আলভিনা, সূচনা, ডালিয়া, পিউ, লিসা, সীমা, সঞ্চিতা, মিতা, অচিরা, পারভীন, অনুশ্রী, শাপলা, গ্রেলান, শতাব্দী, রিয়া, লীনা, দিতি, কান্তা, রোহান, আরোন, অপূর্ব, অর্পণ, অরুণা হায়দার, ইত্তেলা আলী, গার্গী লাহিড়ী, চিত্রা দাস, জেমস, নওশিন, নাসিফা, নায়োমি, শ্রেয়া, মেধা ও প্রার্থনা।


গীতাঞ্জলি মিউজিক একাডেমির পক্ষ থেকে অনুষ্ঠানে উপস্থিত সবাইকে ধন্যবাদ জানান অপরূপ বড়ুয়া।

ঘড়ির কাঁটা তখন রাত ১০টার দিকে এগোচ্ছে। প্রায় চার ঘণ্টার নাচ, সুর, আলো আর হাততালির পর অনুষ্ঠানও ধীরে ধীরে শেষের পথে। সব শিল্পী আবার একসঙ্গে মঞ্চে এলেন। বেজে উঠল ‘পুরনো সেই দিনের কথা’। পরিচিত সুরটি যেন মুহূর্তেই সন্ধ্যার সব দৃশ্যকে এক জায়গায় এনে দাঁড় করাল। যারা একটু আগে আলাদা আলাদা পরিবেশনায় মঞ্চে উঠেছিলেন, এবার তাঁরা সবাই একসঙ্গে। মনে হচ্ছিল, একটি অনুষ্ঠান শেষ হচ্ছে না, বরং কয়েক ঘণ্টার আনন্দকে সবাই মিলে স্মৃতির ভেতর তুলে রাখছেন। কিন্তু গল্পের শেষ তখনো বাকি।


মঞ্চের আনুষ্ঠানিক পরিবেশনা শেষ হওয়ার পর শিল্পীরা নেমে এলেন মাঠে। দর্শকদেরও ডাকা হলো সঙ্গে। বেজে উঠল ধামাইলের সুর। কেউ হাত ধরলেন পাশের মানুষটির, কেউ বৃত্তে দাঁড়ালেন, কেউ তাল ধরলেন। একটু একটু করে বড় হতে লাগল সেই বৃত্ত। কিছুক্ষণ পর কে শিল্পী, কে দর্শক, তা আলাদা করে বোঝার উপায় রইল না।

সকাল থেকে যে বৃষ্টি অনুষ্ঠানটিকে অনিশ্চয়তার মধ্যে রেখেছিল, সেই বৃষ্টিতে ধোয়া মাঠেই তখন সবাই নাচছেন। ভেজা ঘাসের ওপর পায়ের ছন্দ, মাথার ওপর অন্ধকার আকাশ, চারপাশে নিঃশব্দ বন, আর মাঝখানে ধামাইলের বৃত্ত ঘুরছে।
হয়তো প্রকৃতিও তখন দূর থেকে সেই দৃশ্য দেখছিল। সকালে যে আকাশ বলেছিল, ‘দেখি, তোমরা কতদূর নাচতে পারো’, রাতের শেষে সেই আকাশের নিচেই শিল্পী ও দর্শক একসঙ্গে নেচে যেন তার উত্তর দিয়ে দিলেন। ‘আজি আনন্দে নাচো’ তাই কেবল একটি নৃত্যানুষ্ঠানের নাম হয়ে থাকল না। বৃষ্টির সঙ্গে লড়াই করে, ভয় ভুলে, বয়স ভুলে, ভাষার সীমানা ভুলে কয়েক ঘণ্টার জন্য সবাই সত্যিই আনন্দে নেচেছিলেন।
রাত ১০টার দিকে ধামাইলের শেষ বৃত্তটিও ধীরে ধীরে ভেঙে গেল। দর্শকরাও ফিরতে শুরু করলেন। বৃষ্টিভেজা মাঠ আবার ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে এলো। কিন্তু যে সন্ধ্যা কিছুক্ষণ আগে সুর, নাচ আর মানুষের মিলনে জেগে উঠেছিল, তার রেশ তখনো লেগে রইল ভেজা ঘাসে, আলো নিভে আসা মঞ্চে আর ফিরে যাওয়া মানুষের মনে।
এনএন/ ২৬ আগস্ট ২০২৬









