শিল্পের আলোয় উজ্জ্বল টরন্টো সংস্কৃতি সংস্থার বার্ষিক উৎসব

ওটোয়া,২৯ মে – প্রবাসে সংস্কৃতি কখনো শুধু বিনোদনের আয়োজন নয়। এটি শেকড়ের সঙ্গে নতুন প্রজন্মের পরিচয়, আর দূর দেশের মাটিতে আপন পরিচয়কে বাঁচিয়ে রাখার এক গভীর প্রয়াস। জীবনযাপনের ব্যস্ততা, পেশাগত চাপ, ভাষার দূরত্ব এবং ভিন্ন সংস্কৃতির প্রবল প্রবাহের মধ্যেও যখন মানুষ গান, কবিতা, নাটক, নৃত্য ও সম্মিলিত শিল্পচর্চার দিকে ফিরে আসে, তখন বোঝা যায় সংস্কৃতি এখনও মানুষের ভেতরের সবচেয়ে কোমল, সবচেয়ে মানবিক জায়গাটিকে জাগিয়ে রাখে।
এই চেতনা নিয়েই টরন্টো সংস্কৃতি সংস্থার দুই দিনব্যাপী বার্ষিক উৎসব ২০২৬ সম্পন্ন হলো। ২৩ ও ২৪ মে মারখাম শহরের স্থানীয় একটি ইভেন্ট অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত এ উৎসব ছিল অভিবাসী বাঙালির সাংস্কৃতিক প্রাণের এক উজ্জ্বল সমাবেশ। বৃষ্টিস্নাত দিনের আবহও দর্শকশ্রোতার আগ্রহে কোনো ভাটা ফেলতে পারেনি। বরং বিপুল উপস্থিতি জানান দিল, মন ছুঁয়ে যাওয়ার মতো নান্দনিক আয়োজন হলে টরন্টোর সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষ এখনও ঘর ছেড়ে মঞ্চের কাছে আসেন, শিল্পীর কণ্ঠে নিজেদের খুঁজে নেন, নাটকের সংলাপে জীবনের প্রতিচ্ছবি দেখতে চান।

শক্তিমান অভিনেতা অনির্বাণ ভট্টাচার্যের শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের গল্প ‘মশা’ অবলম্বনে পাঠাভিনয় উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ ছিল। কণ্ঠ, অভিব্যক্তি ও নাটকীয় উপস্থাপনার মধ্য দিয়ে তিনি গল্পপাঠকে এক অভিনব শিল্পরূপে দর্শকের সামনে হাজির করেন। জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী পৌষালী ব্যানার্জী এবং অন্তরা মিত্রের সংগীত পরিবেশনা উৎসবকে দেয় ভিন্ন মাত্রা। তাঁদের কণ্ঠে শ্রোতারা খুঁজে পান পরিচিত সুরের আবেগ, সংগীতের মাধুর্য এবং শিল্পের প্রাণময়তা।

উৎসবের আরেকটি উল্লেখযোগ্য পর্ব ছিল কৃষ্ণকলি সেনগুপ্ত পরিচালিত চিল্ড্রেন কয়্যার ‘বরিষ ধরা মাঝে শান্তির বাণী’। শিশুদের সম্মিলিত কণ্ঠে শান্তি, সম্প্রীতি ও মানবতার বার্তা যেন নতুনভাবে ধ্বনিত হয়। ড. সংযুক্তা ব্যানার্জী পরিচালিত ‘ডন অব এ নিউ এইজ’ উপস্থাপনায় ছিল সময়, চেতনা ও নবজাগরণের ইঙ্গিত। পুজা বিশ্বাসের পরিচালনায় ‘উত্তম কুমার, দ্য শো ম্যান অব বেঙ্গলি সিনেমা’ ছিল বাংলা চলচ্চিত্রের এক কিংবদন্তির প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য। শঙ্খচিল থিয়েটারের নাটক ‘অডিশন’ দর্শকদের নাট্যরসের সঙ্গে ভাবনার জায়গাও তৈরি করে দেয়। ব্যান্ড দল বাঙালিয়ানার সংগীতায়োজন উৎসবের আবহকে করে তোলে আরও প্রাণবন্ত ও উচ্ছল।

টরন্টো সংস্কৃতি সংস্থার জন্মকথা কিছুটা অন্যরকম। ২০০৪ সালে কয়েকজন আড্ডাবাজ, সংস্কৃতিপ্রেমী বাঙালির ভাবনা থেকে জন্ম নেয় টরন্টো সংস্কৃতি সংস্থা, সংক্ষেপে টিএসএস। কফির আড্ডা, স্মৃতিমেদুর মন, গান, কবিতা, নৃত্য এবং প্রবাসের মাটিতে বাংলা সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার তাগিদ থেকেই শুরু হয়েছিল এই পথচলা। উদ্দেশ্য ছিল, প্রবাসী বাঙালির হৃদয়ে সযত্নে লালিত শিল্পস্মৃতিকে মঞ্চে ফিরিয়ে আনা এবং নতুন প্রজন্মের হাতে বাংলা সংস্কৃতির সৌন্দর্য, ঐতিহ্য ও মানবিকতার প্রদীপ তুলে দেওয়া।
সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখে টিএসএস ধারাবাহিকভাবে আয়োজন করে আসছে বার্ষিক পারফর্মিং আর্ট উৎসব। বছরের পর বছর ধরে এ আয়োজন শুধু একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হিসেবে নয়, বরং প্রবাসী জীবনে বাঙালিত্বের এক সম্মিলিত উৎসব হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। সংগঠনের আয়োজনের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এখানে বক্তার পর বক্তা মঞ্চে উঠে সময় দখল করেন না। এ বছরও তার ব্যত্যয় ঘটেনি। পরিচালকবৃন্দ একবার মঞ্চে এসে স্পন্সর, পৃষ্ঠপোষক, শিল্পী ও শুভানুধ্যায়ীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং আজীবন সম্মাননা প্রদানের মধ্যেই আনুষ্ঠানিক পর্ব সীমাবদ্ধ রাখেন।

এই সংযমই টিএসএসের আয়োজনকে আলাদা মর্যাদা দেয়। মঞ্চ এখানে বক্তৃতার ভারে ক্লান্ত হয় না। মঞ্চ থাকে শিল্পীর, সুরের, সংলাপের, নৃত্যের এবং দর্শকের অনুভবের জন্য। প্রবাসী সমাজে অনেক আয়োজন দীর্ঘ আনুষ্ঠানিকতায় মূল শিল্পপর্বের প্রাণশক্তি হারিয়ে ফেলে। কিন্তু টরন্টো সংস্কৃতি সংস্থা সেই জায়গায় পরিমিতিবোধের এক সুন্দর দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
টিএসএসের মূল লক্ষ্য শুধু অনুষ্ঠান করা নয়। তাদের লক্ষ্য প্রজন্মকে সুকুমারবৃত্তির চর্চায় উৎসাহিত করা এবং সংস্কৃতির মাধ্যমে মানুষে মানুষে মেলবন্ধন তৈরি করা। সেই কারণেই শুরু থেকেই তারা শিশু কিশোরদের প্রযোজনা মঞ্চে আনছে। প্রবাসে জন্ম নেওয়া বা বেড়ে ওঠা সন্তানদের কাছে বাংলা সংস্কৃতি যেন শুধু বাবা মায়ের স্মৃতির বিষয় হয়ে না থাকে, বরং নিজেদের পরিচয়ের অংশ হয়ে ওঠে, এই প্রয়াস টিএসএসের কর্মকাণ্ডে স্পষ্ট।
এ বছর আজীবন সম্মাননা প্রদান করা হয় ডা. সঞ্জীব মুখার্জীকে। চিকিৎসাক্ষেত্রে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদান এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে তাঁর নিরলস প্রজ্ঞা ও সম্পৃক্ততার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে টরন্টো সংস্কৃতি সংস্থা তাঁকে এ সম্মাননা প্রদান করে। প্রবাসী সমাজে এমন মানুষদের স্বীকৃতি দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ, যারা পেশাগত সাফল্যের পাশাপাশি সমাজ, সংস্কৃতি ও মানবিক মূল্যবোধের সঙ্গে নিজেদের যুক্ত রাখেন।
‘সম্প্রীতির বন্ধনে এক হোক মানবতা’ শীর্ষক উৎসব উপলক্ষে প্রতি বছরের মতো এবারও টরন্টো সংস্কৃতি সংস্থা একটি দৃষ্টিনন্দন স্মারক প্রকাশ করে। স্মারকটি শুধু উৎসবের আনুষ্ঠানিক প্রকাশনা নয়, বরং প্রবাসী সাংস্কৃতিক চর্চার দলিল। এতে থাকে স্মৃতি, শুভেচ্ছা, ভাবনা এবং একটি সাংস্কৃতিক যাত্রার নথি।
এই দুই দিনব্যাপী উৎসব সফল করার পেছনে ছিল বহু মানুষের সম্মিলিত শ্রম। দর্শকশ্রোতারা টিকেট কেটে অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে সহযোগিতা করেছেন। বিজ্ঞাপনদাতারা বিজ্ঞাপন দিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছেন। শুভানুধ্যায়ী ও পৃষ্ঠপোষকরা আর্থিক সহায়তা দিয়েছেন। শিল্পী, কলাকুশলী ও সংগঠকরা দিয়েছেন শ্রম, সময়, মেধা ও আন্তরিকতা। এই সম্মিলিত অংশগ্রহণই উৎসবকে করেছে সার্থক, প্রাণবন্ত, রঙিন ও আনন্দময়।
টিএসএসের এই আয়োজন তাই শুধু একটি উৎসবের সমাপ্তি নয়। এটি অভিবাসী বাঙালির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের আরেকটি উজ্জ্বল অধ্যায়। গান, নাটক, নৃত্য, পাঠাভিনয়, শিশু কিশোরের সম্মিলিত কণ্ঠ এবং মানুষের মিলনমেলায় যে আলো জ্বলে উঠেছে, তা হয়তো অডিটোরিয়ামের মঞ্চে শেষ হয়ে যায়নি। সেই আলো ছড়িয়ে পড়েছে মানুষের মনে, পরিবারে, প্রজন্মে, স্মৃতিতে এবং ভবিষ্যতের সাংস্কৃতিক পথচলায়।
কৃতজ্ঞতা: আহমেদ হোসেন









