কানাডা

তারুণ্যের উচ্ছ্বাসে মুখর টরন্টোর ৯ম বাংলাদেশ ফেস্টিভ্যাল

নজরুল মিন্টো

টরন্টো, ৩ জুন – টরন্টোর বাঙালি কমিউনিটির ক্যালেন্ডারে বাংলাদেশ ফেস্টিভ্যাল এখন আর কেবল একটি বার্ষিক আয়োজন নয়, এটি হয়ে উঠেছে প্রতীক্ষার এক পরিচিত নাম। গত নয় বছর ধরে ধারাবাহিক আয়োজন, জনপ্রিয় শিল্পীদের অংশগ্রহণ, বৈচিত্র্যময় পরিবেশনা এবং বিপুল দর্শকসমাগমের কারণে এই উৎসব ঘিরে বছরজুড়েই থাকে আলাদা কৌতূহল। কে আসবেন, কে গান শোনাবেন, মঞ্চে কী নতুনত্ব থাকবে, এসব নিয়ে আগ্রহ থাকে দর্শক ও সংস্কৃতিপ্রেমীদের মধ্যে। এবারের আয়োজনেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। সেই প্রতীক্ষা ও আগ্রহের আবহেই গত ১৬ মে সন্ধ্যায় পর্দা ওঠে বহুল প্রতীক্ষিত ৯ম বাংলাদেশ ফেস্টিভ্যালের বর্ণাঢ্য আয়োজনের।

কানাডার বাংলাদেশি কমিউনিটির অন্যতম বৃহৎ ইনডোর সাংস্কৃতিক আয়োজন হিসেবে এবারের বাংলাদেশ ফেস্টিভ্যাল আবারও দেখিয়েছে, প্রবাসে বাংলা সংস্কৃতির আবেদন এখনও কতটা প্রবল। জনপ্রিয় সাপ্তাহিক বাংলামেইলের উদ্যোগে আয়োজিত এই ফেস্টিভ্যাল দীর্ঘ পথচলায় টরন্টোর বাঙালিদের কাছে একটি সিগনেচার কমিউনিটি ইভেন্টে পরিণত হয়েছে। প্রতিবারের মতো এবারও আয়োজনের মধ্যে ছিল নতুনত্ব, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার স্পষ্ট প্রকাশ।

মূলধারার রাজনীতিবিদদের সাথে মঞ্চে বাংলাদেশ ফেস্টিভ্যালের প্রতিষ্ঠাতা কনভেনর শহিদুল ইসলাম মিন্টু

এবারের ফেস্টিভ্যাল উৎসর্গ করা হয় বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু এবং তাঁদের পরিবারগুলোর প্রতি সম্মান ও ভালোবাসা জানিয়ে। একই সঙ্গে অটিজম ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় নিবেদিত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের প্রতি জানানো হয় গভীর কৃতজ্ঞতা। উৎসবের আনন্দের ভেতর এমন মানবিক বার্তা আয়োজনটিকে আরও অর্থবহ করে তোলে। এতে বাংলাদেশ ফেস্টিভ্যাল শুধু বিনোদনের মঞ্চে সীমাবদ্ধ থাকেনি, সমাজের সংবেদনশীল বাস্তবতাকেও সাংস্কৃতিক আলোচনার অংশ করে তুলেছে।

ঠিক সন্ধ্যা ৬টা ৩০ মিনিটে টরন্টো প্যাভিলিয়নের দর্শকপূর্ণ মিলনায়তনে শুরু হয় ৯ম বাংলাদেশ ফেস্টিভ্যাল। অনুষ্ঠান শুরু হয় কানাডা ও বাংলাদেশের জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে। মঞ্চে তখন বাংলাদেশ ফেস্টিভ্যালের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আয়োজক, অতিথি ও অংশীজনেরা একসঙ্গে দাঁড়িয়ে দুই দেশের জাতীয় সংগীতে কণ্ঠ মিলান। প্রবাস জীবনের বাস্তবতায় এই দৃশ্য ছিল বিশেষ অর্থবহ। একদিকে জন্মভূমির স্মৃতি, অন্যদিকে বসবাসের দেশের প্রতি সম্মান, দুটি অনুভূতি যেন একই মঞ্চে এসে মিলিত হয়।

ল্যান্ড অ্যাকনলেজমেন্ট পাঠ করেন নির্জলা প্রিয়দর্শিনী

জাতীয় সংগীতের পর ল্যান্ড অ্যাকনলেজমেন্ট পাঠ করেন নির্জলা প্রিয়দর্শিনী। এরপর উপস্থাপন করা হয় বিভিন্ন পর্যায়ের শুভেচ্ছা বার্তা। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির পাঠানো শুভেচ্ছা বার্তাটি পাঠ করেন জাহরা চৌধুরী।

ফেস্টিভ্যালের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের জন্য মঞ্চে আমন্ত্রণ জানানো হয় সাপ্তাহিক বাংলামেইলের সম্পাদক, এনআরবি টিভির সিইও এবং বাংলাদেশ ফেস্টিভ্যালের প্রতিষ্ঠাতা কনভেনর শহিদুল ইসলাম মিন্টু, টরন্টোয় নিযুক্ত বাংলাদেশের কনসাল জেনারেল এমডি শাহ আলম খোকনসহ সম্মানিত অতিথিদের। কনসাল জেনারেলের বক্তব্যের মধ্য দিয়ে আয়োজনের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। পরে অতিথিরা একে একে তাঁদের শুভেচ্ছা বক্তব্যে বাংলা সংস্কৃতি বিকাশে আয়োজকদের ভূমিকার প্রশংসা করেন।

ফেস্টিভ্যালের সাংস্কৃতিক পর্ব শুরু হয় নৃত্যকলা কেন্দ্রের দৃষ্টিনন্দন পরিবেশনায়।

ফেস্টিভ্যালের সাংস্কৃতিক পর্ব শুরু হয় নৃত্যকলা কেন্দ্রের দৃষ্টিনন্দন পরিবেশনায়। কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা বিপ্লব কর ও দীপশিখা কর এবং বিভিন্ন বয়সের ক্ষুদে ও তরুণ নৃত্যশিল্পীদের অংশগ্রহণে মিলনায়তনে ছড়িয়ে পড়ে বাংলাদেশের শিল্পঐতিহ্যের আবহ। তাঁদের নৃত্যে ছিল ছন্দের শৃঙ্খলা, রুচির পরিমিতি এবং প্রবাসে বেড়ে ওঠা প্রজন্মের মধ্যে বাংলা সংস্কৃতিকে জাগিয়ে রাখার আন্তরিক প্রয়াস।

বাংলাদেশ ফেস্টিভ্যাল প্রতি বছর বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান জানিয়ে থাকে। সেই ধারাবাহিকতায় এবারের আয়োজনে সম্মাননা জানানো হয় বীর মুক্তিযোদ্ধা আইভেন ডি রোজারিওকে। “এক সাগর রক্তের বিনিময়ে” গানের সঙ্গে উপস্থিত দর্শক দাঁড়িয়ে তাঁকে শ্রদ্ধা জানান। মুহূর্তটি ছিল আবেগময় ও মর্যাদাপূর্ণ। প্রবাসের মঞ্চে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি এভাবেই নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে যায় শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা ও ইতিহাসের অনুভবে।

হলভর্তি দর্শক উপভোগ করছেন ফেস্টিভ্যালের অনুষ্ঠানমালা

এরপর টরন্টোর গুণী সংগীতশিল্পীরা মঞ্চে পরিবেশন করেন একের পর এক গান। সংগীত পরিবেশনায় ছিলেন মাসুদ আহমেদ, টিটো আহমেদ, এমরান হোসেন সুমন, ফারহানা লিমা, তাসমিনা খান ও শমিত বড়ুয়া। প্রতি বছর বিশেষ অবদানের জন্য বাংলাদেশ ফেস্টিভ্যালে এনআরবি অ্যাওয়ার্ড প্রদান করা হয়। এ বছর সংগীত শাখায় এ সম্মাননা লাভ করেন শমিত বড়ুয়া। তাঁর হাতে অ্যাওয়ার্ড তুলে দিয়ে প্রবাসে বাংলা গানের চর্চা ও অবদানের প্রতি সম্মান জানানো হয়।

স্থানীয় শিল্পীদের সংগীত পরিবেশনার পাশাপাশি নৃত্যও ছিল সাংস্কৃতিক পর্বের অন্যতম আকর্ষণ। গুণী নৃত্যশিল্পী নাহিদ নাসরিন নয়নের পরিবেশনা এবং চিত্র দাস ও চারুশি সেনের যুগল নৃত্য দর্শকদের প্রশংসা কুড়ায়। সংগীত, নৃত্য, মুক্তিযোদ্ধা সম্মাননা এবং এনআরবি অ্যাওয়ার্ড মিলিয়ে আয়োজনের প্রথম পর্বটি হয়ে ওঠে বৈচিত্র্যময় ও পরিপূর্ণ।

এবারের বাংলাদেশ ফেস্টিভ্যালে যুক্ত হয় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। প্রথমবারের মতো শুরু হয় “বাংলামেইল কবি ইকবাল হাসান সাহিত্য পুরস্কার ২০২৬”। বিশিষ্ট জুরিবোর্ডের সিদ্ধান্তে কানাডার ভ্যাঙ্কুভার নিবাসী কবি, কথাসাহিত্যিক, অনুবাদক ও সম্পাদক শাহানা আকতার মহুয়াকে এ পুরস্কারের জন্য নির্বাচন করা হয়। এক হাজার ডলারের চেক ও পুরস্কার প্রদানের জন্য মঞ্চে আসেন পয়েট লরিয়েট লিলিয়ান অ্যালেন। প্রবাসে বাংলা সাহিত্যচর্চাকে উৎসাহিত করার এই উদ্যোগ বাংলাদেশ ফেস্টিভ্যালের সাংস্কৃতিক পরিসরকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।

আয়োজনের বিভিন্ন পর্যায়ে সম্মানিত পৃষ্ঠপোষকদের হাতে ক্রেস্ট তুলে দিয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়। বরাবরের মতো এবারের ফেস্টিভ্যালেও মূলধারার রাজনৈতিক নেতৃত্বের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি ছিল। টরন্টোর মেয়র অলিভিয়া চাও মঞ্চে এসে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন। মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন ডলি বেগম এমপি, সালমা জাহিদ এমপি, অন্টারিওর অফিসিয়াল অপজিশন লিডার ম্যারিট স্টাইলস এমপিপি, আন্দ্রেয়া হ্যাজেল এমপিপি, ডেভিড স্মিথ এমপিপি, ক্রিস্টিন ওং ট্যাম এমপিপি, টরন্টো সিটি কাউন্সিলর ব্র্যাড ব্র্যাডফোর্ড ও পার্থি কান্দাভেল। শুভেচ্ছা বক্তব্যের পর তাঁরা আয়োজনে যুক্ত সম্মানিত পৃষ্ঠপোষকদের হাতে ক্রেস্ট তুলে দেন।

জনপ্রিয় সংগীত তারকা আরজিন কামাল। সুরের বৈচিত্র্য এবং প্রাণবন্ত উপস্থাপনায় তিনি প্রায় এক ঘণ্টা ধরে শ্রোতাদের আবিষ্ট করে রাখেন।

এরপর মঞ্চে আসেন জনপ্রিয় সংগীত তারকা আরজিন কামাল। তিনি একাধারে গীতিকার, সুরকার ও শিল্পী। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য এবং কানাডার নানা শহরে তিনি বাংলা গানকে ভিন্ন ভাষাভাষী শ্রোতাদের কাছেও পৌঁছে দিয়েছেন। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে একাধিক চলচ্চিত্রেও তিনি কণ্ঠ দিয়েছেন। টরন্টো প্যাভিলিয়নের মঞ্চে তাঁর পরিবেশনায় দর্শক মুগ্ধ হয়ে ওঠেন। মৌলিক গান, সুরের বৈচিত্র্য এবং প্রাণবন্ত উপস্থাপনায় তিনি প্রায় এক ঘণ্টা ধরে শ্রোতাদের আবিষ্ট করে রাখেন।

এরপর মঞ্চে আসেন তরুণ প্রজন্মের জনপ্রিয় শিল্পী মুজা। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে নিউইয়র্কে পাড়ি জমান তিনি। বিদেশে বেড়ে উঠলেও বাংলা গানের প্রতি ভালোবাসা তাঁকে ফিরিয়ে আনে ভাষা ও সুরের কাছে। বাংলা গানের পুরোনো ধারা, আঞ্চলিক সুর এবং আধুনিক উপস্থাপনাকে নতুনভাবে তুলে ধরার মাধ্যমে তিনি ইতিমধ্যে বাংলাদেশ ও প্রবাসে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। মঞ্চে তাঁর উপস্থিতি দর্শকদের মধ্যে উচ্ছ্বাস তৈরি করে। পরিচিত গানের সুরে শ্রোতারা কণ্ঠ মেলান। সিলেটি আঞ্চলিক গান ও আধুনিক সংগীতের মিশেলে তিনি জয় করে নেন ভক্তদের হৃদয়।

সঞ্চালনায় ছিলেন মাহবুব ওসমানী এবং অজন্তা চৌধুরী।

পুরো অনুষ্ঠান সঞ্চালনায় ছিলেন টরন্টোর দুই পরিচিত ও প্রিয় মুখ মাহবুব ওসমানী এবং অজন্তা চৌধুরী। তাঁদের সাবলীল উপস্থাপনা অনুষ্ঠানের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

উচ্ছ্বাস, কৃতজ্ঞতা ও আগামী দিনের প্রত্যাশা নিয়ে প্রায় মধ্যরাতে শেষ হয় ৯ম বাংলাদেশ ফেস্টিভ্যাল। বৈচিত্র্যময় অনুষ্ঠান উপভোগ শেষে টরন্টো প্যাভিলিয়ন থেকে বেরিয়ে আসা মানুষের মুখে ছিল আয়োজনের রেশ। কেবল গান, নৃত্য, সাহিত্য, সম্মাননা এবং তারুণ্যের অংশগ্রহণ নয়, বাংলাদেশ ফেস্টিভ্যাল মানুষের মিলিত হওয়ার, একসঙ্গে কিছু সময় কাটানোর এবং সংস্কৃতিকে ঘিরে আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার এক উৎসবমুখর উপলক্ষ হয়ে উঠেছে। আগামী বছর বাংলাদেশ ফেস্টিভ্যাল দশম বছরে পা দেবে। আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আরও নতুন ভাবনা ও সমৃদ্ধ পরিকল্পনা নিয়ে শিগগিরই ঘোষণা করা হবে পরবর্তী আয়োজনের তারিখ, স্থান ও শিল্পীদের নাম।

এনএন/ ৩ জুন ২০২৬


Back to top button
🌐 Read in Your Language