কানাডা

টরন্টোতে অর্ণব-সুনিধির জমজমাট লাইভ অনুষ্ঠান

নজরুল মিন্টো

টরন্টো, ১০ আগস্ট – কিছু গান শুধু শোনা হয় না, একসময় সেগুলো জীবনের কোনো না কোনো স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে যায়। প্রথম প্রেম, বন্ধুদের আড্ডা কিংবা একা কাটানো কোনো সন্ধ্যা মনে করিয়ে দেয় সেই সুর। শনিবার রাতে টরন্টোর এমনই এক লাইভ অনুষ্ঠানে আবহ তৈরি করেছিলেন জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী সায়ান চৌধুরী অর্ণব ও সুনিধি নায়েক। শত শত সংগীতপ্রেমীর কণ্ঠ আর হাততালিতে গমগম করছিল অডিটোরিয়াম।

গতকাল ৮ আগস্ট, শনিবার অনুষ্ঠিত হয় সংগীতসন্ধ্যা ‘হোক কলরব কানাডা’। Bangladesh Canada Event Forum আয়োজিত অনুষ্ঠানটির ভেন্যু ছিল Toronto Pavilion। কয়েক দিন আগেই সব টিকিট বিক্রি হয়ে যাওয়ায় শেষ মুহূর্তে টিকিটের খোঁজে আসা অনেককেই ফিরে যেতে হয়েছে। অডিটোরিয়াম ছিল কানায় কানায় পূর্ণ। সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় অনুষ্ঠান শুরুর কথা থাকলেও বৈদ্যুতিক গোলযোগের কারণে প্রায় আধঘণ্টা দেরিতে শুরু হয়। রাত সাড়ে এগারোটা পর্যন্ত চলা সংগীতসন্ধ্যায় অর্ণব ও সুনিধির পরিবেশনা উপভোগ করেন টরন্টো ও আশপাশের এলাকা থেকে আসা এক হাজারের বেশি শ্রোতা। অনুষ্ঠানটির প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিল Mir Jewel Printing।

অনুষ্ঠানে আগত দর্শকদের মধ্যে তরুণ-তরুণীদের উপস্থিতি ছিল বিশেষভাবে চোখে পড়ার মতো। বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ এ কারণে যে, অর্ণবের অনেক জনপ্রিয় গান প্রায় দুই দশক ধরে শ্রোতাদের মুখে মুখে ফিরছে। ‘সে যে বসে আছে’, ‘তোমার জন্য’ কিংবা ‘হোক কলরব’ প্রকাশের সময় যাঁরা শিশু ছিলেন, তাঁদের অনেকেই এখন এসব গানে অর্ণবের সঙ্গে কণ্ঠ মেলাচ্ছেন। এদিনের অনুষ্ঠান আবারও দেখাল, সময় পেরোলেও তাঁর অনেক গান নতুন প্রজন্মের শ্রোতাদের কাছেও আবেদন হারায়নি।

অর্ণবের পুরো নাম সায়ান চৌধুরী অর্ণব। বাংলাদেশের সমকালীন সংগীতে তাঁকে শুধু গায়ক বললে পরিচয় অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তিনি গীতিকার, সুরকার, সংগীত পরিচালক, প্রযোজক এবং চিত্রশিল্পীও। তাঁর বেড়ে ওঠার একটি বড় সময় কেটেছে শান্তিনিকেতনের পাঠভবনে। পরে বিশ্বভারতীর কলাভবনে পড়াশোনা করেন। রবীন্দ্রসংগীত, লোকগান, বাউল ঐতিহ্য, পাশ্চাত্য সংগীত ও চিত্রকলার প্রভাব তাঁর কাজেও দেখা যায়। গত দুই দশকে এসব ধারার মিশেলে তিনি নিজের একটি স্বতন্ত্র সংগীতভাষা তৈরি করেছেন। কখনও বিষণ্নতা, কখনও প্রেম, কখনও আবার জীবন নিয়ে প্রশ্ন তাঁর গানের পরিচিত বৈশিষ্ট্য।

সুনিধি নায়েকের সংগীতের শিকড়ও শান্তিনিকেতনে। পশ্চিমবঙ্গের আসানসোলে বেড়ে ওঠা সুনিধি ছোটবেলা থেকেই সংগীতের সঙ্গে যুক্ত। বিশ্বভারতীতে পড়তে এসে রবীন্দ্রসংগীত নিয়ে তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা আরও গভীর হয়। সেই শিক্ষার ছাপ তাঁর গায়কিতে স্পষ্ট, তবে পরিবেশনায় রয়েছে সমকালীনতার স্বাচ্ছন্দ্যও। অর্ণবের সঙ্গে বিভিন্ন পরিবেশনা এবং পরে কোক স্টুডিও বাংলায় অংশ নেওয়ার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশেও তাঁর পরিচিতি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।

অর্ণব ও সুনিধির সম্পর্কের গল্পটিও সংগীতকে ঘিরে। বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অনুষ্ঠানে সুনিধির গান শুনে অর্ণব মুগ্ধ হয়ে তাঁকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন। মজার ব্যাপার হলো, সুনিধি তখন অর্ণবকে খুব একটা চিনতেন না। পরে পরিচয় বাড়ে এবং ২০১৯ সালে তাঁদের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হয়। করোনাকালে অর্ণব শান্তিনিকেতনে আটকে পড়লে দুজনের একে অপরকে আরও কাছ থেকে জানার সুযোগ হয়। ২০২০ সালের ২৮ অক্টোবর পশ্চিমবঙ্গের আসানসোলে সুনিধির বাড়িতে ঘনিষ্ঠজনদের উপস্থিতিতে তাঁরা বিয়ে করেন।

অর্ণব-সুনিধিকে নতুন প্রজন্মের আরও বড় শ্রোতাগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে ‘কোক স্টুডিও বাংলা’। আন্তর্জাতিক Coke Studio-এর বাংলাদেশ সংস্করণটি যাত্রা শুরু করে ২০২২ সালে। শুরু থেকেই এর অন্যতম প্রধান কারিগর ছিলেন অর্ণব। প্রথম তিন মৌসুমে মিউজিক কিউরেটর হিসেবে তিনি লোকসংগীত, আঞ্চলিক গান, রবীন্দ্রসংগীত, আধুনিক গান, রক ও র‌্যাপসহ নানা ধারার শিল্পী ও সংগীতকে একই প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসেন। পুরোনো অনেক গান সেখানে নতুন সংগীতায়োজনে ফিরে এসেছে, একই সঙ্গে অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত অনেক শিল্পীও পৌঁছে গেছেন বিপুলসংখ্যক শ্রোতার কাছে।

অর্ণব ও সুনিধির কনসার্টের পেছনে যার ছবি স্ক্রিনে দেখা যাচ্ছে তিনি এ আয়োজনের কিছু না হলেও এই ছবির বদলে অনুষ্ঠানের অংশ হয়ে গেছেন। (ছবি কৃতজ্ঞতা: ব্যারিষ্টার সূর্য চক্রবর্তী)

সুনিধিও কোক স্টুডিও বাংলার শুরু থেকেই এই যাত্রার অংশ। প্রথম মৌসুমের ‘হেই সামালো’তে তিনি ছিলেন শিল্পীদের একজন। দ্বিতীয় মৌসুমে অর্ণব ও সুনিধির ‘সন্ধ্যাতারা’ বিশেষভাবে আলোচিত হয়। চলতি চতুর্থ মৌসুমেও রয়েছে তাঁর উপস্থিতি। গত ২৫ জুলাই প্রকাশিত ‘পাতার বাঁশরি’ গানে ঈশানের সঙ্গে কণ্ঠ দিয়েছেন সুনিধি। কোক স্টুডিও বাংলার এসব পরিবেশনা তাঁকে বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের শ্রোতাদের কাছেও পরিচিত একটি কণ্ঠে পরিণত করেছে।

কোক স্টুডিও বাংলার একটি বড় সাফল্য হলো, পুরোনো ও নতুন সংগীতের মাঝখানের দূরত্ব অনেকটাই কমিয়ে আনা। যে তরুণ নিয়মিত রবীন্দ্রসংগীত কিংবা লোকগান শোনেন না, তিনিও নতুন সংগীতায়োজনে সেই গান শুনছেন। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের কারণে অর্ণবের পুরোনো গানও একই সঙ্গে নতুন শ্রোতার কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। শনিবার Toronto Pavilion-এ তরুণদের ব্যাপক উপস্থিতির পেছনে অর্ণবের দীর্ঘদিনের জনপ্রিয়তার পাশাপাশি এই নতুন করে আবিষ্কারের গল্পটিও রয়েছে।

রাত সাড়ে এগারোটার দিকে অনুষ্ঠান শেষ হলেও দর্শকদের মধ্যে তখনও ছিল উচ্ছ্বাস। অনেকেই বলছিলেন, তৃপ্তি নিয়ে ঘরে ফিরছেন। প্রায় পুরো সন্ধ্যা ধরে শিল্পীদের সঙ্গে দর্শকদের যে সংযোগ তৈরি হয়েছিল, সেটিই ছিল আয়োজনটির সবচেয়ে বড় সাফল্য। পূর্ণ অডিটোরিয়াম, পরিচিত গানে শত শত কণ্ঠের সাড়া এবং অর্ণব-সুনিধির পরিবেশনা মিলিয়ে টরন্টোর ‘হোক কলরব’ হয়ে উঠেছিল বাংলা গানের একটি স্মরণীয় সন্ধ্যা।

ছবি কৃতজ্ঞতা: জিসান সুলতানা

এনএন/ ১০ আগস্ট ২০২৬


Back to top button