কানাডা

টরন্টোতে সিএসি-র পিকনিক যেন চট্টগ্রামবাসীর স্মৃতির মহামিলন

টরন্টো, ২৬ জুলাই –  কানাডার বুকে এক টুকরো চট্টগ্রাম! সম্প্রতি অনুষ্ঠিত হলো ‘চট্টগ্রাম অ্যাসোসিয়েশন অব কানাডা’ (CAC)-র বার্ষিক পিকনিক-২০২৬। জমকালো এই আয়োজনে প্রবাস জীবনের ব্যস্ততা ভুলে এক সুতোয় গাঁথলেন হাজারো প্রবাসী। মেজবানি স্বাদ, চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী শুঁটকি, শিশুদের খেলাধুলা থেকে শুরু করে বিশাল পর্দায় ফিফা বিশ্বকাপের ফাইনাল প্রদর্শনী – সব মিলিয়ে টরন্টোর উপকণ্ঠে গড়ে উঠেছিল এক টুকরো আনন্দদীপ্ত বাংলাদেশ। পড়ুন আয়োজনের বিস্তারিত বিশ্লেষণ।

টরন্টো থেকে প্রায় ১২০ কিলোমিটার দূরে পিটারবোরোর নান্দনিক বিভারমিড পার্ক। সবুজ গাছপালা, শান্ত নদীর জলধারা আর নির্মল বাতাসের মধ্যে গত ১৯ জুলাই (রবিবার) অনুষ্ঠিত হলো ‘চট্টগ্রাম অ্যাসোসিয়েশন অব কানাডা’-র বার্ষিক পিকনিক-২০২৬। সকালের প্রথম সূর্যরশ্মির সঙ্গে সঙ্গেই পার্কটি যেন পরিণত হয় প্রবাসে এক টুকরো আস্ত চট্টগ্রামে।

পরিবার, বন্ধু-বান্ধব কিংবা বহুকাল পর দেখা হওয়া পরিচিত মুখগুলোর মেলামেশায় গোটা ভেন্যু রূপ নেয় ভালোবাসা, ঐক্য ও ভ্রাতৃত্বের এক অনন্য মিলনমেলায়।

দিনের শুরুতেই অতিথিদের বরণ করে নেওয়া হয় চট্টগ্রামবাসীর ঐতিহ্যবাহী হাসিমুখ ও উষ্ণতায়। পরিবেশন করা হয় আন্তরিকতায় ভরা সুস্বাদু প্রাতঃরাশ। প্রবাসের ব্যস্ত ও যান্ত্রিক জীবন থেকে ক্ষণিকের জন্য বের হয়ে প্রাতঃরাশের টেবিলে সবাই যেন ফিরে গিয়েছিলেন শৈশবের সেই গ্রামবাংলার স্নিগ্ধ সকালগুলোতে। আয়োজকদের ভাষায়, “এখানে কেউ অতিথি ছিলেন না—সবাই ছিলেন একই পরিবারের সদস্য।”

শিশু থেকে প্রবীণ আনন্দের ছোঁয়া লেগেছিল সবার মাঝে। দৌড় প্রতিযোগিতা, বাচ্চাদের দূরন্ত খেলাধুলা এবং মহিলাদের প্রাণবন্ত উপস্থিতি পুরো মাঠকে মুখরিত করে তোলে। প্রতিযোগিতা শেষে বিজয়ী ও অংশগ্রহণকারীদের হাতে তুলে দেওয়া হয় চমৎকার সব উপহার।

পিকনিকের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল মধ্যাহ্নভোজ। মেন্যুতে ছিল : সাদা ভাত ও বুটের ডাল, তন্দুরি চিকেন ও মাটন কারি ও চিংড়ি ভুনা ও ডিমের কারি।

তবে সব খাবারকে ছাপিয়ে আলোচনার কেন্দ্রে ছিল চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী শুঁটকি মাছের তরকারি। পিকনিক স্পটেই আয়োজন করা হয়েছিল লাইভ শুঁটকি রান্না। রান্নার সুবাস চারদিকে ছড়িয়ে পড়লে প্রবাসীরা যেন মুহূর্তের জন্য ফিরে যান নিজ শিকড়ে। অনেকেই আবেগপ্লুত হয়ে মন্তব্য করেন, “বহু বছর পর এই স্বাদ মুখে দিয়ে মনে হলো মায়ের হাতের রান্না খাচ্ছি।” খাবার শেষে ছিল গরম চা, বেলা বিস্কুট, মহেশখালীর সুগন্ধি পান ও বিশেষ জর্দার আড্ডা।

এই আয়োজনের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর দিক ছিল পার্কের বিশাল LED স্ক্রিনে সরাসরি ফিফা বিশ্বকাপ ফাইনাল প্রচার। হাজারেরও বেশি প্রবাসী ফুটবলপ্রেমী একসঙ্গে বসে ও দাঁড়িয়ে এই শ্বাসরুদ্ধকর মুহূর্ত উপভোগ করেন। গোলের রোমাঞ্চে অচেনা মানুষগুলোও একে অপরকে জড়িয়ে ধরে উল্লাস প্রকাশ করেন।

বিকেলের ঢলে পড়া রোদে শুরু হয় মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। স্থানীয় ও অতিথি শিল্পীদের সুমধুর গান, আবৃত্তি এবং নান্দনিক উপস্থাপনা দর্শক-শ্রোতাদের মুগ্ধ করে রাখে। আড্ডার ফাঁকে পরিবেশন করা হয় ঝালমুড়ি, মিষ্টি ও তরমুজ।

দিনের শেষ ভাগে আয়োজিত হয় র‍্যাফেল ড্র। ১৫টি আকর্ষণীয় পুরস্কারের মধ্যে সবচেয়ে বড় চমক ছিল টরন্টো-ঢাকা-টরন্টো রিটার্ন বিমান টিকিট।

সংগঠনের সভাপতি জনাব শাহাব সিদ্দিকী বুলবুলের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক ড. মঞ্জুর মোরশেদসহ ট্রাস্টি ও উপদেষ্টাদের দিকনির্দেশনায় অনুষ্ঠানটি সাফল্যমণ্ডিত হয়। পিকনিক কমিটির কনভেনর ও পরিচালকদের নিখুঁত পরিকল্পনা এবং বিপুল সংখ্যক স্বেচ্ছাসেবকের অক্লান্ত পরিশ্রম পুরো আয়োজনকে কোনো প্রকার বিশৃঙ্খলা ছাড়াই এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়।

সন্ধ্যা ৯টায় নদীর জলে সোনালি আলো ছড়িয়ে যখন সূর্য অস্ত যাচ্ছিল, তখন বিদায়ের ঘণ্টা বাজে। তবে সেই বিদায় বিচ্ছেদের ছিল না, ছিল আগামী বছর আরও বড় পরিসরে এক হওয়ার অঙ্গীকার।

প্রবাসের বুকে এই আয়োজন প্রমাণ করেছে চট্টগ্রাম শুধু একটি ভৌগোলিক সীমানা নয়, চট্টগ্রাম হলো শিকড়, পরিবার ও আত্মার এক অবিচ্ছেদ্য টান।


Back to top button