
রোববার সন্ধ্যায় বাড়িটিতে জড়ো হয়েছিলেন একই পরিবারের সদস্যরা। সাপ্তাহিক নৈশভোজে ছিলেন ৯২ বছরের বৃদ্ধা থেকে সাত বছরের শিশুও। কয়েক সপ্তাহ আগেও এই বাড়িতে বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকতেন ৪৪ বছর বয়সী অ্যালান স্মিথ। পরে তাকে বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র থাকতে বলা হয়। ২৩ আগস্ট সন্ধ্যায় তিনি হঠাৎ সেখানে ফিরে আসেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই গুলির শব্দে ভেঙে যায় পারিবারিক জমায়েত। এরপর আগুন গ্রাস করে পুরো বাড়ি। রাত শেষ হওয়ার আগেই একই পরিবারের আটজনের মৃত্যু হয়। মৃত অবস্থায় পাওয়া যায় সন্দেহভাজন অ্যালান স্মিথকেও।
ঘটনাটি যুক্তরাষ্ট্রের মন্টানা অঙ্গরাজ্যের বিলিংসের পশ্চিম প্রান্তে, শহরসীমার বাইরে হোয়াইট স্টার সার্কেলের একটি বাড়িতে। ২৬ আগস্ট, বুধবার ইয়েলোস্টোন কাউন্টির শেরিফ কেন্ট ও’ডনেল নিহতদের পরিচয় আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেন। তারা হলেন ৭৩ বছর বয়সী ডানা স্মিথ, তার স্ত্রী ৭২ বছরের বারবারা স্মিথ, ডানার ৯২ বছর বয়সী মা এভলিন স্মিথ এবং তাদের ৩৯ বছর বয়সী মেয়ে মেগান আয়ারল্যান্ড-ঘেকিয়ের। নিহত চার শিশু হলো ১৫ বছরের ল্যান্ডন ঘেকিয়ের, ১৩ বছরের ওউয়েন আয়ারল্যান্ড, ১২ বছরের শার্লট ঘেকিয়ের এবং ৭ বছরের ক্লোয়ি আয়ারল্যান্ড।
নিহতদের পারিবারিক সম্পর্ক ছিল এমন: ডানা ও বারবারা ছিলেন অ্যালান ও মেগানের বাবা-মা এবং এভলিন ছিলেন তাদের দাদি। মেগানের আগের সংসারের দুই সন্তান ওউয়েন ও ক্লোয়ি এবং বর্তমান স্বামী অ্যাডাম ঘেকিয়েরের দুই সন্তান ল্যান্ডন ও শার্লটও সেদিন বাড়িটিতে ছিল। অর্থাৎ ল্যান্ডন ও শার্লট ছিলেন অ্যাডামের নিজের সন্তান, আর ওউয়েন ও ক্লোয়ি তার সৎ সন্তান। এভাবে একই পরিবারের চার প্রজন্মের আটজন এক সন্ধ্যায় প্রাণ হারান।
পুলিশের সর্বশেষ সময়রেখা অনুযায়ী, অ্যালান বিকেল ৫টা ৪৯ মিনিটে ওই এলাকায় পৌঁছান। এর প্রায় ১১ মিনিট পর প্রতিবেশীরা এমন কিছু শব্দ শুনেছিলেন, যেগুলো প্রথমে তাদের কাছে আতশবাজির শব্দ বলে মনে হয়েছিল। এর কিছুক্ষণ পর বাড়ি থেকে ৯১১-এ সাহায্য চেয়ে ফোন আসে। সন্ধ্যা ৬টা ৬ মিনিটে বাড়ির অগ্নিসংকেত বেজে ওঠে। প্রথম পুলিশ কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে পৌঁছান প্রায় ৬টা ১১ মিনিটে। তখনও গুলির শব্দ শোনা যাচ্ছিল।
পরে পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে জানা যায়, ৯১১-এ ফোনটি করেছিল ১২ বছরের শার্লট। তার বাবা অ্যাডাম ঘেকিয়ের বলেছেন, পুলিশ তাকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। পরিবারের বন্ধু জেনিফার মার্সারও বলেছেন, গুলির মধ্যে শার্লটই সাহায্য চেয়ে ফোন করেছিল এবং পরিবারের সদস্যদের বাঁচানোর চেষ্টা করেছিল। মেয়েটি অবশ্য নিজে আর বাড়ি থেকে বের হতে পারেনি।
পুলিশ বাড়িটির সামনে অ্যালানের মুখোমুখি হলে তিনি আবার ভেতরে ঢুকে পড়েন। সে সময় কর্মকর্তারা বাড়ির ভেতর থেকে আরও গুলির শব্দ শুনতে পান এবং ধোঁয়া বের হতে দেখেন। পরে অ্যালান বাড়ির পেছন দিক দিয়ে বেরিয়ে নিজের ওপর গুলি চালান। তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হলেও বাঁচানো যায়নি। শেরিফ ও’ডনেল জানিয়েছেন, পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই বাড়ির ভেতরে একাধিক জায়গায় আগুন লাগানো হয়েছিল বলে তদন্তকারীরা মনে করছেন।
গুলি চলতে থাকায় দমকলকর্মীরাও শুরুতে বাড়ির কাছে যেতে পারেননি। এর মধ্যেই আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এলাকাটি শহরসীমার বাইরে হওয়ায় সেখানে ফায়ার হাইড্র্যান্ট ছিল না; বাইরে থেকে পানি এনে আগুন নেভাতে হয়। শেষ পর্যন্ত বাড়িটি প্রায় পুরোপুরি পুড়ে যায়। ধ্বংসস্তূপ এতটাই নাজুক হয়ে পড়ে যে নিহতদের দেহাবশেষ উদ্ধার ও আলামত সংগ্রহের কাজও ধীরে করতে হচ্ছে।
কেন এই হত্যাকাণ্ড, সেই প্রশ্নের নিশ্চিত উত্তর এখনো মেলেনি। তবে পরিবারের সদস্য ব্র্যাড আয়ারল্যান্ড জানিয়েছেন, অ্যালান দীর্ঘদিন বাবা-মায়ের সঙ্গে ওই বাড়িতে থাকতেন। কয়েক সপ্তাহ আগে তাকে বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে বলা হয়। এরপর রোববার তিনি হঠাৎ ফিরে আসেন, যখন পরিবারের সদস্যরা নৈশভোজের জন্য একত্র হয়েছিলেন। বুধবার শেরিফও নিশ্চিত করেছেন, অ্যালান আগে ওই বাড়িতে থাকলেও ঘটনার সময় সেখানে বসবাস করছিলেন না।
অ্যালান সম্পর্কে পরিবার জানিয়েছে, তিনি মানুষের সঙ্গে খুব একটা মিশতেন না এবং দিনের বড় অংশ নিজের ঘরে কম্পিউটারের সামনে কাটাতেন। Eastern Washington University-তে পড়াশোনা করেছিলেন, কিন্তু স্থায়ীভাবে কোনো চাকরিতে থাকতে পারেননি। পুলিশ জানিয়েছে, এর আগে অ্যালানের সঙ্গে তাদের কোনো যোগাযোগের রেকর্ড ছিল না এবং ওই বাড়িতেও আগে পুলিশ ডাকার ঘটনা ঘটেনি। মন্টানা ও ওয়াশিংটনের অপরাধসংক্রান্ত নথিতেও তার বিরুদ্ধে আগের কোনো গ্রেপ্তার বা ফৌজদারি অভিযোগ পাওয়া যায়নি।
সেদিন বাড়িতে ছিলেন না মেগানের স্বামী অ্যাডাম ঘেকিয়ের। তিনি বিলিংসের বিমানবন্দরে কর্মরত ছিলেন। জরুরি যোগাযোগব্যবস্থায় এলাকায় গুলির ঘটনার খবর শুনে তিনি প্রথমে স্ত্রী ও সন্তানদের ফোন করতে শুরু করেন। কারও কাছ থেকেই উত্তর না পেয়ে গাড়ি নিয়ে হোয়াইট স্টার সার্কেলের দিকে ছুটে যান। সেখানে পৌঁছে দেখেন পরিবারের বাড়িটি আগুনে জ্বলছে। প্রায় দুই ঘণ্টা পর জানতে পারেন, তার স্ত্রী এবং পরিবারের চার শিশুর কেউ বেঁচে নেই।
অ্যাডাম জানিয়েছেন, তাদের পারিবারিক নৈশভোজ সাধারণত শুক্রবার হতো। সে কারণে রোববার ল্যান্ডন ও শার্লটের ওই বাড়িতে থাকার কথা ছিল না। তার ধারণা, অ্যালান হয়তো জানতেনও না যে তারা সেদিন সেখানে থাকবে। সেই শার্লটই শেষ মুহূর্তে ৯১১-এ ফোন করে সাহায্য চেয়েছিল।
স্মিথ পরিবার মূলত সিয়াটল এলাকার বাসিন্দা। মেগান প্রায় ছয় বছর আগে মন্টানায় চলে আসার পর তার বাবা-মাও বিলিংসে চলে আসেন। ডানা স্মিথ মার্কিন বিমানবাহিনীতে চাকরি করেছিলেন এবং পরে Boeing-এ কাজ করেন। বারবারা ছিলেন শিক্ষক। এভলিন কাছাকাছি একটি প্রবীণ নিবাসে থাকতেন। রোববার তিনিও পরিবারের সঙ্গে নৈশভোজে যোগ দিতে এসেছিলেন।
Associated Press ও USA Today-এর সঙ্গে Northeastern University পরিচালিত হিসাব অনুযায়ী, এটি ২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ২২তম গণহত্যা (mass killing)। তাদের হিসাবে, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে হামলাকারী ছাড়া চার বা তার বেশি মানুষ নিহত হলে সেই ঘটনাকে এই তালিকায় রাখা হয়। এ বছরের ২২টি ঘটনার মধ্যে ১৫টিই পারিবারিক বা ঘরোয়া বিরোধ থেকে ঘটেছে বলে জানিয়েছেন ডেটাবেসটির তত্ত্বাবধায়ক ও Northeastern University-এর অপরাধবিজ্ঞানী জেমস অ্যালান ফক্স। বিলিংসের ঘটনাটি গত এপ্রিলের পর যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে প্রাণঘাতী এমন ঘটনা।
বুধবারও পোড়া বাড়িটির ধ্বংসস্তূপে আলামত খুঁজছিলেন তদন্তকারীরা। আগুনে পুড়ে যাওয়া অংশ সরাতে সরাতে তারা বোঝার চেষ্টা করছেন, রোববার সন্ধ্যায় বাড়িটির ভেতরে ঠিক কোন ক্রমে ঘটনাগুলো ঘটেছিল। ঘটনাস্থল থেকে অস্ত্রও উদ্ধার করা হয়েছে। ময়নাতদন্তও চলছে। কেন অ্যালান নিজের পরিবারের ওপর গুলি চালালেন, সেই সবচেয়ে বড় প্রশ্নটির উত্তরও এখনো অজানা। শেরিফ ও’ডনেলের কথায়, তদন্তে অনেক প্রশ্নের উত্তর মিলবে; আবার কিছু প্রশ্নের উত্তর হয়তো কখনোই পাওয়া যাবে না।
তথ্যসূত্র: The Associated Press, CBS News, USA Today









