
গ্রেটার টরন্টো এলাকার একটি ঘনবসতিপূর্ণ শহর ব্রাম্পটন। যেখানে নতুন অভিবাসীদের স্বপ্ন আর বাস্তবতার সংঘাতে গড়ে ওঠে প্রতিদিনের গল্প। এখানে একদিকে ঝকঝকে রাস্তা, শহুরে সুউচ্চ ভবন আর অন্যদিকে, ভারী পর্দা টানা উইন্ডোর আড়ালে লুকিয়ে থাকে শত সহস্র অভ্যন্তরীণ যন্ত্রণা। এই শহরটি যেন একটি বহুত্ববাদী নীলিমা—যেখানে ভারতীয়, শ্রীলঙ্কান, পাকিস্তানি ও বাংলাদেশিদের পাশাপাশি নানা জাতিগোষ্ঠীর মানুষ গড়ে তুলেছে একটি অন্তর্মুখী সমাজ। সেই সমাজের একটি নির্জন কোণে, এক সকালে সবার অগোচরে নিভে যায় একটি জীবন।
নাদিয়া হক। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কানাডিয়ান তরুনী। ২০০৫ সালে তিনি তার পরিবারের সাথে কানাডায় এসেছিলেন। তার বাবা ছিলেন ঢাকার সিরামিক ফ্যাক্টরির একজন ম্যানেজার, আর কানাডায় এসে কাজ করেন পিয়ারসন এয়ারপোর্টে। মা ছিলেন একজন গৃহিণী, যিনি পরবর্তীতে ওয়ালমার্টে পার্ট-টাইম চাকরি নেন। তিন ভাইবোনের মধ্যে নাদিয়া ছিলেন বড়। তার ছোট ভাই কলেজে, আর ছোট বোন নার্সিং স্টুডেন্ট।
নাদিয়া Brampton Civic Secondary School-এ পড়াশোনা করেন। পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ করতেন, বন্ধুদের মাঝে ছিলেন হাসিখুশি।
২০১২ সালে ব্রাম্পটনের একটি বাংলাদেশি কমিউনিটি ইভেন্টে মোহাম্মদ হক নাদিয়াকে প্রথম দেখেন। তারপর নাদিয়ার বাবাকে সরাসরি প্রস্তাব দেন। মোহাম্মদ তখন স্টুডেন্ট ভিসায় আসা একজন অভিবাসী। নাদিয়া প্রথমে রাজি ছিলেন না, কিন্তু পরিবারের চাপে ২০১৩ সালে তাকে বিয়ে করেন।
বিয়ের পর থেকেই শুরু হয় নিয়ন্ত্রণ। মোহাম্মদ হক ছিলেন একজন সন্দেহপ্রবণ স্বামী। নাদিয়ার চলাফেরা, পোশাক, বন্ধুবান্ধব সবকিছু নিয়েই ছিল সীমাহীন প্রশ্ন, নিষেধাজ্ঞা। প্রতিবেশীরা বলতেন, “ওদের বাসা থেকে প্রায়ই ঝগড়ার আওয়াজ শোনা যেত।”
২০১৪ সালের শেষ দিকে নাদিয়া সিদ্ধান্ত নেন যে, তিনি এই সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসবেন। তিনি গোপনে তালাকের জন্য আইনি সহায়তা নেওয়া শুরু করেন।
সন্দেহজনিত কারণে মোহাম্মদ বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে নাদিয়ার অন্য কারও সাথে সম্পর্ক আছে। এক বিকেলে তিনি নাদিয়ার ফোন চেক করেন, এবং কিছু টেক্সট বার্তা দেখে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন।
২৫ নভেম্বর, ২০১৫। সকাল থেকে দিনটি অস্বাভাবিক ছিল। প্রতিবেশী বলেন, “সকালেই দেখি মোহাম্মদ গাড়ি ওয়াশ করছে, অথচ বাতাসে একটা অদ্ভুত ভার।” বিকেলে তীব্র ঝগড়া শুরু হয়। চিৎকার, কান্না, এবং তারপর—নীরবতা।
পুলিশ যখন আসে, তখন নাদিয়ার নিথর দেহ পড়ে ছিল বেডরুমের মেঝেতে। ফরেনসিক রিপোর্ট অনুযায়ী, তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়।
মোহাম্মদ হক প্রথমে পালানোর চেষ্টা করলেও, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাকে গ্রেফতার করা হয়।
মোহাম্মদ হকের বিরুদ্ধে আনা হয় প্রথম-ডিগ্রি হত্যার অভিযোগ। প্রসিকিউটর পল রেনউইক বলেন, “তিনি নাদিয়াকে হত্যা করেছেন কারণ সে মুক্তি চেয়েছিল।”
বিচারক ব্রুস ডার্নোর কণ্ঠে বাজা সেই শব্দগুলো যেন আদালতের দেয়াল কাঁপিয়ে দেয়: “This was not just a murder. This was erasure of identity, freedom and future.”
তিনি বলেন, “আপনি শুধু নাদিয়াকে হত্যা করেননি, আপনি তাকে বারবার হত্যা করেছেন।” বিচারকের ভাষায় ফুটে ওঠে মোহাম্মদ হকের অপরাধের তালিকা:
প্রথমে নাদিয়ার স্বাধীনতাকে হত্যা করেন—তাকে বন্ধু ও পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে।
আপনি তার স্বপ্নকে হত্যা করেন—নাদিয়ার কলেজে ভর্তি চিঠি ছিঁড়ে ফেলেন।
শেষপর্যন্ত, তার শরীরকে ধ্বংস করেন—নৃশংসভাবে আঘাত করে, শ্বাসরোধে হত্যা করে।
তারপর রায় উচ্চারিত হয়: আজীবন কারাদণ্ড।
“লাইফ মিনস লাইফ,” বিচারক বলেন—একটি বাক্য, যা কেবল আইনি সংজ্ঞা নয়, বরং ইতিহাসের এক গভীর উচ্চারণ।
রায় ঘোষণার মুহূর্তটি ছিল নাটকীয়। মোহাম্মদ হক আদালতের মাঝখানে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে ওঠেন, “এটা অন্যায়! সে আমার স্ত্রী ছিল!”
বিচারক ডার্নো শান্ত কণ্ঠে উত্তর দেন, “না, সে একজন মানুষ ছিল—যার অধিকার আপনার চেয়ে বেশি ছিল।”









