
দিগন্তজোড়া আকাশ আর লেক অন্টারিওর জলরেখায় দাঁড়িয়ে গড়ে উঠেছে এক আধুনিক মহানগর টরন্টো। যার বুকে গড়ে উঠেছে বৈচিত্র্যের গাছ, যার শাখা-প্রশাখায় বাস করে বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আগত মানুষেরা। শহরটি যেন কাচে মোড়ানো আধুনিকতা আর অভিবাসীদের বুকে লুকানো শত সহস্র গল্পের মিশ্রণ।
এই বহুজাতিক টরন্টোরই অদূরে বিস্তৃত লেকশোর এলাকা—যেখানে ঝকঝকে সূর্যালোকে পানির ওপর ঝিলিক খেলে যায়, আর কংক্রিটের উঁচু ভবনগুলো দাঁড়িয়ে থাকে নীরব সাক্ষীর মতো। কিন্তু সৌন্দর্যের আড়ালেও কখনো কখনো জন্ম নেয় বিভীষিকা।
২০১২ সালের এক উজ্জ্বল সকালে, মানুষের স্বাভাবিক ব্যস্ততার ভিড়ের মধ্যেই হঠাৎ নেমে আসে মৃত্যুর ছায়া। লেকশোরের একটি আধুনিক আবাসিক ভবনের তৃতীয় তলার এক অ্যাপার্টমেন্টে রক্তাক্ত অবস্থায় পাওয়া যায় এক নারীর নিথর দেহ। পুলিশের উপস্থিতিতে ধীরে ধীরে উদঘাটিত হয় ভয়াবহ সত্য—হত্যাকারী আর কেউ নয়, তার নিজের স্বামী।
নাজমা জামান। সিরাজগঞ্জের মেয়ে। ছোটবেলা থেকেই স্বাধীনচেতা ও শিক্ষানুরাগী এই নারী ঢাকার একটি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন। তার স্বামী মোহাম্মদ শফি জামাল ছিলেন কুমিল্লার এক মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান।
১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে পারিবারিকভাবে তাদের বিয়ে হয়। ১৯৯৪ সালে মোহাম্মদ প্রথম কানাডায় পাড়ি জমান, টরন্টোতে এসে একটি ফ্যাক্টরিতে কাজ শুরু করেন। পরবর্তীতে স্বাধীন পেশায় ট্যাক্সি চালানো শুরু করেন। ১৯৯৬ সালে তিনি স্পন্সর করে নাজমা ও তাদের চার সন্তানকে কানাডায় নিয়ে আসেন। তারা বসতি গড়েন ইটোবিকোতে একেবারে লেক অন্টারিওর কাছাকাছি। পরবর্তী সময়ে ২০০৮ সালে তারা বাসা বদল করে একই এলাকার একটি ১২ তলা অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিং-এ চলে যান।
নতুন দেশে এসে নাজমা নিজের মতো করে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন জীবন। তিনি ইংরেজি শেখার জন্য ভর্তি হন একটি স্কুলে, যুক্ত হন কমিউনিটি সেন্টারে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে এবং ২০০৫ সালে একটি ডে-কেয়ার সেন্টারে চাকরি গ্রহণ করেন। ধীরে ধীরে তিনি কানাডিয়ান সমাজের মূল স্রোতে জড়িয়ে পড়েন। কিন্তু এই পরিবর্তন মোহাম্মদ শফি জামালের কাছে ছিল অগ্রহণযোগ্য।
মোহাম্মদ জামাল চেয়েছিলেন তার স্ত্রী ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরিধান করুক, বাইরে কম যাক, এবং পরিবারের প্রতি সম্পূর্ণ আনুগত্য বজায় রাখুক। তিনি স্ত্রীর কর্মজীবনকে অপমানজনক ও “পশ্চিমা প্রভাব” বলে মনে করতেন। দাম্পত্যের ভেতর চলতে থাকে নিয়ন্ত্রণ, সন্দেহ, মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের এক দীর্ঘ অধ্যায়।
২০০৫ সাল থেকেই বাড়তে থাকে সহিংসতা। ২০১১ সালে নাজমা গোপনে নারী আশ্রয়কেন্দ্রে যোগাযোগ করেন এবং বিচ্ছেদের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন।
২০১২ সালের ১৮ জুনের সকাল। মোহাম্মদ জামাল ৯১১-এ কল করে জানান, তার স্ত্রী আত্মহত্যা করেছেন। পুলিশ এসে দেখে, শোবার ঘরের মেঝেতে পড়ে আছেন নাজমা—রক্তে ভেজা, নিথর। বুক ও পেটে একাধিক ছুরিকাঘাত।
২০১৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি, মোহাম্মদ জামালকে দ্বিতীয় ডিগ্রি হত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। দেয়া হয় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। কোর্টরুমে মোহাম্মদ জামাল প্রথমে দাবি করেন, এটি আত্মহত্যা। পরে বলেন, কোনো অনুপ্রবেশকারী হত্যা করেছে। কিন্তু সাক্ষ্য, ফরেনসিক প্রমাণ তার বয়ান মিথ্যা প্রমাণ করে।
নাজমা জামানের নামে ছিল তিন লাখ বিশ হাজার কানাডিয়ান ডলারের জীবনবীমা। তার মৃত্যুর পর স্বামী মোহাম্মদ শফি জামাল আদালতে দাবি করেন, তিনি এ অর্থের বৈধ উত্তরাধিকারী। কিন্তু আদালত ‘হত্যাকারী উত্তরাধিকার পেতে পারে না’—এই নীতি (যা “ঘাতক বিধি” বা Slayer Rule নামে পরিচিত) অনুসরণ করে রায় দেয় যে, স্বামী এই অর্থ পাওয়ার কোনো অধিকার রাখেন না।
আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, যিনি নিজেই স্ত্রীকে হত্যা করেছেন, তিনি সেই স্ত্রীর নামে করা বীমার অর্থ গ্রহণ করতে পারেন না—এটি ন্যায়নীতির পরিপন্থী। ফলে বীমার সম্পূর্ণ অর্থ তাদের সন্তানদের নামে স্থানান্তর করা হয়, যাতে অন্তত তারা মায়ের স্মৃতি ও ন্যায়বিচারের একটি প্রতীকরূপে এই অর্থের মাধ্যমে এগিয়ে যেতে পারে।









