সম্পাদকের পাতা

উত্তর আমেরিকায় বাংলাদেশী রেস্টুরেন্ট

নজরুল মিন্টো

ঘরোয়া রেস্টুরেন্ট

উত্তর আমেরিকার বিস্তৃত ভূখণ্ডে যত বাংলাদেশি অভিবাসী এসেছেন, তাদের জীবনের শুরুটা প্রায় সকলেরই এক শূন্যতা থেকে। সেই শূন্যতার বুকেই কেউ গড়েছেন রেস্টুরেন্ট, কেউ ঢুকেছেন কিচেনে। কেবল জীবিকা নয়, ছিল আত্মপ্রতিষ্ঠার আর্তি। যুক্তরাষ্ট্রের ব্যস্ত ম্যানহাটান হোক কিংবা টরন্টোর জমাটবাঁধা হিমেল সন্ধ্যা—বাংলাদেশিরা চুপিচুপি গড়ে তুলেছে এক ইন্ডাষ্ট্রি। রেষ্টুরেন্ট ইন্ডাষ্ট্রি।

এই ইন্ডাষ্ট্রিকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে ব্যাপক কর্মসংস্থান। শুধু বাংলাদেশি নয়—অনেক ভারতীয়, পাকিস্তানি, এমনকি স্থানীয় কানাডিয়ান ও আমেরিকান নাগরিকরাও আজ কাজ করছেন এই রেস্টুরেন্টগুলোতে।

সবচেয়ে গর্বের বিষয় হলো—এই শিল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশ পেয়েছে এক নতুন পরিচিতি, এক সাংস্কৃতিক মর্যাদা। একসময় যে বাংলাদেশ কেবল সস্তা শ্রমের উৎস হিসেবে পরিচিত ছিল, আজ সেই বাংলাদেশের নাম উচ্চারিত হয় ‘পদ্মা’, ‘মেঘনা’, ‘সুরমা’, ‘যমুনা’, কিংবা ‘কর্ণফুলী’ নামের রেস্টুরেন্টে।

উত্তর আমেরিকার মানুষ আজ ‘Padma Garden’, ‘Surma Tandoori’, ‘Jamuna Grill’, ‘Meghna Palace’, ‘Dhanshiri Dining’, কিংবা ‘Kushiara Curry House’ নাম শুনলেই এক ধরনের রন্ধনশৈলী, অতিথিপরায়ণতা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ছোঁয়া অনুভব করেন। এসব নাম শুধুই জায়গার নাম নয়—এসব নাম বয়ে আনে নদীর ঢেউ, এবং স্বপ্নভেজা একটি ভূখণ্ডের গন্ধ। বলার অপেক্ষা রাখে না, বহির্বিশ্বে বাংলাদেশ নামটিকে এক নতুন মর্যাদায় উন্নীত করেছেন রেষ্টুরেন্ট ব্যবসায়ীরা এবং রেষ্টুরেন্ট কর্মচারীরা।

কিছুদিন আগে লন্ডন থেকে টরন্টো আসেন ‘সাপ্তাহিক জনমত’-এর প্রধান সম্পাদক সৈয়দ নাহাশ পাশা। তিনি একটি ব্যতিক্রমী কাজ শুরু করেছেন—বিশ্বব্যাপী ‘ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্ট’ নামে পরিচিত একটি খাদ্য-সংস্কৃতি ও রন্ধনশিল্পকে কেন্দ্র করে ‘কারি লাইফ’ নামের একটি ম্যাগাজিন চালু করেছেন, যেখানে এ শিল্পে যুক্ত অভিবাসীদের সংগ্রাম, সাফল্য আর রন্ধনভিত্তিক ঐতিহ্য তুলে ধরা হচ্ছে।

নাহাশ পাশা বলেন, ব্রিটেনে ভিন্ন সংস্কৃতি-কৃষ্টির মধ্যেও বাংলাদেশীরা নিজেদের ভিতকে মজবুত করেছেন তাদের নানামুখী উদ্ভাবনী শক্তি দিয়ে। বাংলাদেশী খাবার আজ ব্রিটিশদের মূল খাদ্যাভ্যাসকে বদলে দিয়েছে। পুরো ব্রিটেনে টিক্কা মাসালার জয়জয়কার। অথচ পঞ্চাশ বছর আগে যারা জাহাজে করে এসে লন্ডনের ইস্ট এন্ডে প্রথম পা রাখেন, তাদের বেশিরভাগই কোনো আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত রাঁধুনি ছিলেন না—তাদের কেবল ছিল কল্পনা, সাহস আর সীমাহীন পরিশ্রম।আজ বাংলাদেশী রেস্টুরেন্ট ব্যবসা নিছকই ছোটখাটো ব্যবসার গন্ডিতে আবদ্ধ নয়, এটা এখন বিশাল ‘কারি ব্যবসা’ হিসেবে খ্যাতি লাভ করেছে।

ব্রিটেনসহ ইউরোপের আনাচে-কানাচে ‘ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্ট’ হিসেবে পরিচিত এই কারি ব্যবসার মূল কান্ডারী হচ্ছেন বাংলাদেশীরা। রেস্টুরেন্টগুলোর মালিক বাংলাদেশী হলেও এগুলোর নাম ‘ইন্ডিয়ান’ কেন? এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, এটা একটা ব্রান্ড নেম হিসেবে স্বীকৃত। যেমন চাইনিজ ফুড, থাই ফুড, গ্রিক ফুড ইত্যাদি। রেস্টুরেন্টগুলোতে যে খাবার পরিবেশন করা হয় তা ভারত বিভক্তির আগে থেকে শত শত বছর ধরে ‘ইন্ডিয়ান’ হিসেবেই পরিচিত। তবে অনেকে আজকাল নাম পরিবর্তন করে বাংলাদেশী রাখছেন।

‘কারি লাইফ’ ম্যাগাজিন প্রতিবছর লন্ডনে আয়োজন করে ‘কারি লাইফ অ্যাওয়ার্ডস’, যেখানে উপস্থিত থাকেন ব্রিটিশ রাজনীতিক, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব এবং সফল রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ীরা।

যুক্তরাষ্ট্রে আজ প্রায় ৪,০০০-এর বেশি ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্ট রয়েছে, যার প্রায় ৮৫–৯০ শতাংশ বাংলাদেশী মালিকানাধীন বলে বিভিন্ন বাণিজ্যিক রিপোর্টে জানা যায়। নিউ ইয়র্ক সিটির সিক্সথ স্ট্রিটে গেলে চোখে পড়ে একের পর এক রেস্টুরেন্ট: ‘তাজমহল’, ‘ঢাকা গার্ডেন’, ‘রূপসী বাংলা’—যার অনেকগুলোর পেছনেই রয়েছে বৃহত্তর সিলেট থেকে আসা স্বপ্নবাজ রন্ধনশিল্পীদের গল্প।

সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার সিরাজ চৌধুরী ও গোলাপগঞ্জ উপজেলার আবদুল মালিক হলেন নিউ ইয়র্কে ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্ট ব্যবসার অগ্রপথিক। ১৯৬০ সালে সিরাজ চৌধুরি ‘কোহিনুর’ এবং আব্দুল মালিক ‘শাহবাগ’ নামে দু’টি রেষ্টুরেন্ট প্রতিষ্ঠিত করে নগরবাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। শহরে নতুন ধরনের রেস্টুরেন্টের সাইন দেখে সে সময় নিউ ইয়র্ক টাইমস পত্রিকা এর ওপর বিশাল এক নিবন্ধ প্রকাশ করে।

নিউ ইয়র্কের রেস্টুরেন্ট ইতিহাসে এই প্রতিষ্ঠানগুলো শুধু খাবারের নয়, অভিবাসী সংগ্রাম ও সাংস্কৃতিক অবদানেরও সাক্ষী।

আজ যুক্তরাষ্ট্রের এমন কোনো বড় বা মাঝারি শহর নেই যেখানে বাংলাদেশী মালিকানাধীন রেস্টুরেন্ট চোখে পড়বে না। আরও বড় কথা এ শহরগুলোতে যেসব ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্ট রয়েছে তার নব্বই ভাগ মালিকানা বাংলাদেশীদের।

সিলেটের বালাগঞ্জ উপজেলার আবদুস সামাদ ‘রয়েল বেঙ্গল’ নামে টরন্টোর প্রথম ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্ট প্রতিষ্ঠা করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতাপূর্বকালে ঐ রেস্টুরেন্টটি ছিল বাঙালিদের কেন্দ্রবিন্দু। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত বাঙালি ছাত্ররা নিয়মিত এখানে আড্ডা দিতেন। ১৯৭১ সালে রয়েল বেঙ্গল রেস্টুরেন্টকে কেন্দ্র করেই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিভিন্ন কর্মতৎপরতা পরিচালিত হতে থাকে। ঐ সময় টরন্টোর একমাত্র সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব কানাডা, টরন্টোর অফিস হিসেবেও রেস্টুরেন্টটি ব্যবহৃত হয়।

মনট্রিয়লেও রন্ধন ইতিহাস গড়ে তুলেছিলেন সিলেটের মফিজউল্লাহ ও শফিকুল হক দুরুদ, যাঁরা ১৯৭১ সালে ‘কারি হাউস’ নামের রেস্টুরেন্ট চালু করেন।

আজকের দিনে কানাডা জুড়ে প্রায় ৫০০ ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্ট রয়েছে, যার মধ্যে শতাধিক মালিকানা বাংলাদেশীদের দখল। শুধু কুইবেকেই প্রায় ৭৫ শতাংশ ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্টের মালিক বাঙালি। টরন্টো, অটোয়া, লন্ডন (অন্টারিও), হ্যামিলটন, উইন্ডসর, কিচেনার, গুয়েলফ, সেন্ট ক্যাথারিনস, পিটারব্যুরো, অকভিল—প্রায় প্রতিটি শহরেই বাংলাদেশীরা রন্ধন শিল্পে নিজেদের এক উজ্জ্বল পরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। অন্যদিকে, ভ্যাঙ্কুভার, ক্যালগোরি এবং সাসকাচোয়ানেও এই ধারা সম্প্রসারিত হয়েছে। যারা একদিন অচেনা শহরে কাজ খুঁজতে এসেছিলেন, তারাই আজ মালিক, উদ্যোক্তা, সংস্কৃতির বাহক।

উত্তর আমেরিকায় বাংলাদেশি রেস্টুরেন্টের সাফল্য কেবল অর্থনৈতিক নয়, সাংস্কৃতিক বিজয়েরও গল্প। এই সম্ভাবনার জয়যাত্রা যেন অব্যাহত থাকে—এটাই প্রত্যাশা।


Back to top button
🌐 Read in Your Language