সম্পাদকের পাতা

প্রবাসীদের জন্য প্রক্সি নয়; অনলাইনে ভোট নিশ্চিত করতে হবে

নজরুল মিন্টো

বিদেশে বসবাসকারী প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা দীর্ঘদিনের এক গুরুত্বপূর্ণ দাবি। প্রায় তিন দশকের বেশি সময় ধরে এ বিষয়ে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। নির্বাচন কমিশন, সরকার, সুশীল সমাজ এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক, মতবিনিময় সভা, প্রেস কনফারেন্স এবং বিভিন্ন দেশে প্রচারণার মাধ্যমে আমরা এই ইস্যুটিকে সামনে নিয়ে আসার চেষ্টা করেছি।

১৯৯৮ সালে দেশের উচ্চ আদালত প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভোটাধিকার সংবিধান স্বীকৃত বলে ঘোষণা দিলেও দীর্ঘ ২৬ বছরেও সেই ঘোষণা বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি। গত পাঁচ বছরেও অন্তত ছয়বার এ ঘোষণা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, কিন্তু ভোটাধিকার প্রয়োগ থেকে বঞ্চিতই থেকেছেন প্রবাসীরা। তবে সরকার পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এক কোটি প্রবাসীর ভোট দেওয়ার সুযোগ রাখতে চায় নির্বাচন সংস্কার কমিশন। ইতিমধ্যে ৪০টি দেশে প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভোটার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।

২০০৭ সালে জাতীয় প্রেসক্লাবে প্রবাসীদের ভোটাধিকার সহ মৌলিক অধিকার নিয়ে মতবিনিময় সভা।

সম্প্রতি নির্বাচন কমিশনের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, প্রবাসী ভোটারদের জন্য ‘প্রক্সি ভোটিং’ চালুর কথা ভাবছে কমিশন। এ ব্যবস্থায় একজন প্রবাসী তার ভোট প্রদানের অধিকার নির্দিষ্ট একজন আত্মীয়কে দিতে পারবেন। প্রাথমিকভাবে বাবা, মা, ভাই, বোন, স্ত্রী, সন্তান বা রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয়দের প্রক্সি ভোটার হিসেবে মনোনীত করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এটি সম্পন্ন করার জন্য একটি নির্দিষ্ট অ্যাপের মাধ্যমে রেজিস্ট্রেশনের ব্যবস্থাও রাখা হচ্ছে।

২০০৮ সালে প্রবাসীদের ভোটাধিকার নিয়ে বাংলাদেশের প্রধান নির্বাচন কমিশনার এটিএম শামসুল হুদার সাথে বৈঠক।

কিন্তু প্রক্সি ভোটিং ব্যবস্থা প্রবাসীদের ভোটাধিকার সুরক্ষার পরিবর্তে জটিলতা তৈরি করতে পারে। প্রথমত, মনোনীত ব্যক্তি ভোটারের ইচ্ছার বিরুদ্ধে নিজের পছন্দমতো ভোট দিতে পারেন। দ্বিতীয়ত, এ ব্যবস্থার মাধ্যমে জাল ভোট প্রদান এবং কারসাজির আশঙ্কা রয়েছে। তৃতীয়ত, এটি গোপনীয়তার পরিপন্থী।

গত ৩০ ডিসেম্বর ২০২৪ বাংলাদেশের অন্তবর্তী সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেনের কাছে প্রবাসীদের ভোটাধিকার সহ ১৮টি দাবী তুলে ধরা হয়।

প্রক্সি ভোটিং সুবিধাজনক মনে হলেও এতে স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ রয়েছে। বর্তমানে অনলাইন ভোটিং ব্যবস্থার মতো আধুনিক প্রযুক্তিগত বিকল্প থাকা সত্ত্বেও প্রক্সি ভোটের মতো ঝুঁকিপূর্ণ পদ্ধতি চালু নিয়ে নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, প্রক্সি ভোটিংয়ের পরিবর্তে সরাসরি অনলাইন ভোটিং ব্যবস্থা চালু করাই হবে সবচেয়ে কার্যকর ও নিরাপদ সমাধান। বিশ্বব্যাপী প্রযুক্তির অগ্রযাত্রা আজ আমাদের দৈনন্দিন জীবনকে সহজতর করছে। ব্যাংকিং খাতসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হলে, নির্বাচন কমিশনও নিরাপদ অনলাইন ভোটিং ব্যবস্থা চালু করতে পারে। ইসি চাইলে এ বিষয়ে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে একটি নিরাপদ ও কার্যকর ভোটিং অ্যাপ তৈরি করতে পারে।

নির্বাচন কমিশন যদি সুপরিকল্পিতভাবে প্রযুক্তিনির্ভর এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, তবে এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে।


Back to top button
🌐 Read in Your Language