
বিশ্বকাপের আসর একটি শহরকে কোটি কোটি মানুষের সামনে নিজের পরিচয় তুলে ধরার সুযোগ এনে দেয়। দর্শক যখন বিমান থেকে নামেন, স্টেডিয়ামের পথে হাঁটেন, স্থানীয় ক্যাফেতে বসে কফি খান কিংবা সমুদ্রের ধারে সূর্যাস্ত উপভোগ করেন, তখন তাঁর কাছে বিশ্বকাপের স্মৃতি শুধু একটি ম্যাচ নয়, একটি শহরেরও গল্প হয়ে ওঠে। ২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপে সেই গল্প সবচেয়ে সুন্দরভাবে লিখেছে কানাডার ভ্যাঙ্কুভার।
বিশ্বকাপের ১৬টি আয়োজক শহরের মধ্যে আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সাময়িকী Sports Illustrated ভ্যাঙ্কুভারকে এক নম্বরে স্থান দিয়েছিল। শহরের অবকাঠামো, যাতায়াত ব্যবস্থা, স্টেডিয়ামের অবস্থান, আবহাওয়া, পর্যটনের সুযোগ এবং সম্ভাব্য দর্শক-অভিজ্ঞতা বিবেচনা করে করা এই মূল্যায়ন শুধু একটি শহরের প্রশংসা নয়; এটি প্রমাণ করে, একটি বিশ্বমানের ক্রীড়া আয়োজন সফল করতে কেবল বড় স্টেডিয়াম থাকলেই হয় না, প্রয়োজন সুপরিকল্পিত একটি নগরব্যবস্থা। বিশ্বকাপ শেষে ভ্যাঙ্কুভারের আয়োজনও সেই আগাম মূল্যায়নকে যথার্থ প্রমাণ করেছে।
ভ্যাঙ্কুভারের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল এর অবস্থান। শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত বিসি প্লেস স্টেডিয়ামে পৌঁছাতে দর্শকদের আলাদা কোনো ঝামেলায় পড়তে হয়নি। ভ্যাঙ্কুভার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে স্কাইট্রেনে উঠে অল্প সময়েই স্টেডিয়ামের কাছে পৌঁছে যাওয়া সম্ভব হয়েছে। ব্যক্তিগত গাড়ি কিংবা যানজটপূর্ণ দীর্ঘ সড়কযাত্রার ওপর নির্ভর করতে হয়নি। ফলে স্থানীয় মানুষ থেকে শুরু করে বিদেশি দর্শক, সবার জন্য যাতায়াত ছিল সহজ, দ্রুত এবং স্বস্তিদায়ক।
বিশ্বের অনেক বড় ক্রীড়া আয়োজনে স্টেডিয়াম শহরের কেন্দ্র থেকে দূরে হওয়ায় একটি ম্যাচ দেখতেই দর্শকদের দিনের বড় অংশ পথে কাটাতে হয়। ভ্যাঙ্কুভারে অভিজ্ঞতাটি ছিল ভিন্ন। বিসি প্লেসের আশপাশেই ছিল রেস্তোরাঁ, বার, হোটেল, বিনোদনকেন্দ্র ও ওয়াটারফ্রন্টে যাওয়ার সুযোগ। ম্যাচের আগে সমর্থকেরা শহরের বিভিন্ন স্থানে সময় কাটিয়েছেন, আবার খেলা শেষে সহজেই ফিরে গেছেন নিজেদের হোটেল বা থাকার জায়গায়। শহরটির হাঁটাচলার উপযোগী পরিবেশ তাঁদের গাড়ির জানালার বাইরে এসে ভ্যাঙ্কুভারকে আরও কাছ থেকে আবিষ্কারের সুযোগ করে দিয়েছে। ফলে বিশ্বকাপের উৎসব শুধু স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে আটকে থাকেনি; ছড়িয়ে পড়েছিল আশপাশের সড়ক, জনপরিসর, রেস্তোরাঁ এবং সমর্থকদের বিভিন্ন মিলনস্থলে।
প্রকৃতিও যেন ভ্যাঙ্কুভারের পক্ষে খেলেছে। উত্তর আমেরিকার অনেক আয়োজক শহরের তুলনায় এখানকার গ্রীষ্মকাল ছিল মৃদু ও আরামদায়ক। প্রচণ্ড গরমের চাপ তুলনামূলক কম থাকায় দর্শকেরা ম্যাচের বাইরেও দীর্ঘ সময় শহরের উন্মুক্ত স্থানে কাটাতে পেরেছেন। নীল আকাশ, পাহাড়, সমুদ্র ও সবুজে ঘেরা ভ্যাঙ্কুভার তাই শুধু একটি আয়োজক শহর হিসেবে নয়, বিশ্বকাপের সঙ্গে ভ্রমণের আনন্দ মিলিয়ে নেওয়ার এক স্মরণীয় গন্তব্য হিসেবেও নিজেকে তুলে ধরেছে।
ভ্যাঙ্কুভার মোট সাতটি বিশ্বকাপ ম্যাচ আয়োজন করেছে। এর মধ্যে ছিল পাঁচটি গ্রুপপর্বের ম্যাচ, যার দুটিতে খেলেছে কানাডা; পাশাপাশি অনুষ্ঠিত হয়েছে রাউন্ড অব ৩২-এর একটি এবং রাউন্ড অব ১৬-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ লড়াই। কাতারের বিপক্ষে কানাডার ৬-০ গোলের ঐতিহাসিক জয় বিসি প্লেসকে পরিণত করেছিল লাল-সাদা উৎসবের এক বিশাল মঞ্চে। সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে পরের ম্যাচে ফল অনুকূলে না এলেও গ্যালারিতে স্বাগতিক সমর্থকদের আবেগ ও উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। জাতীয় সংগীত, পতাকার ঢেউ এবং দর্শকদের উচ্ছ্বাসের মধ্য দিয়ে ভ্যাঙ্কুভার বিশ্ববাসীর সামনে কানাডীয় ফুটবল সংস্কৃতির নতুন আত্মবিশ্বাস তুলে ধরেছে।
ভ্যাঙ্কুভার প্রমাণ করেছে, বড় ম্যাচ পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা, নিরাপত্তাব্যবস্থা ও অবকাঠামো তাদের রয়েছে। দর্শকদের প্রবেশ, গণপরিবহন পরিচালনা, স্বেচ্ছাসেবকদের সহায়তা এবং ম্যাচ-পরবর্তী বিপুল জনস্রোত নিয়ন্ত্রণের মতো কঠিন দায়িত্ব সফলভাবে সামলে শহরটি বিশ্বকাপের অন্যতম সুসংগঠিত আয়োজক হিসেবে নিজের পরিচয় তুলে ধরেছে।
ভ্যাঙ্কুভারের এই সাফল্য শুধু ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার নয়, পুরো কানাডার জন্যই গর্বের। ২০১০ সালের শীতকালীন অলিম্পিকের পর আবারও শহরটি বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেছে কানাডার আতিথেয়তা, শৃঙ্খলা ও বড় আন্তর্জাতিক আয়োজন পরিচালনার সামর্থ্য। মাঠে কানাডার ফুটবল নতুন ইতিহাস লিখেছে, আর মাঠের বাইরে ভ্যাঙ্কুভার দেশটির আধুনিক, বহুসাংস্কৃতিক ও অতিথিবান্ধব পরিচয়কে আরও উজ্জ্বল করেছে।
বিশ্বকাপের মতো আসর একটি শহরের অর্থনীতিতেও বড় প্রভাব ফেলে। হাজার হাজার দেশি-বিদেশি দর্শক হোটেলে থেকেছেন, স্থানীয় রেস্তোরাঁয় খেয়েছেন, দোকানপাটে কেনাকাটা করেছেন এবং বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্র ঘুরে দেখেছেন। এর ফলে স্থানীয় ব্যবসা, পর্যটন ও সেবাখাত উল্লেখযোগ্যভাবে লাভবান হয়েছে। বিশ্বকাপ শেষ হলেও পর্যটন, বিনিয়োগ ও আন্তর্জাতিক পরিচিতির মাধ্যমে সেই অর্থনৈতিক প্রভাব আরও অনেক দিন অনুভূত হবে।
তবে ভ্যাঙ্কুভারের সবচেয়ে বড় অর্জন শুধু তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শহরটির আন্তর্জাতিক পরিচিতির প্রসার। বিশ্বকাপের সম্প্রচারে বিসি প্লেসের পাশাপাশি বারবার দৃশ্যমান হয়েছে ভ্যাঙ্কুভারের পাহাড়, সমুদ্র, ওয়াটারফ্রন্ট ও আধুনিক নগরজীবন। ফলে ফুটবল দেখতে বসা দর্শকেরা একই সঙ্গে একটি আকর্ষণীয় ভ্রমণ গন্তব্য হিসেবেও শহরটিকে নতুন করে দেখেছেন। একটি সফল ক্রীড়া আয়োজন কোনো শহরের আন্তর্জাতিক পরিচিতি কতটা বাড়াতে পারে, ভ্যাঙ্কুভার তার উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে থাকবে।
বিশ্বকাপ শেষ হয়েছে। স্টেডিয়ামের আলো নিভেছে, গ্যালারি খালি হয়েছে, উৎসবের পতাকাও একসময় সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু কয়েক সপ্তাহের সেই আয়োজন ভ্যাঙ্কুভারের নগরজীবন, আতিথেয়তা ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের যে ছবি বিশ্বের কোটি দর্শকের সামনে তুলে ধরেছে, তা সহজে মুছে যাওয়ার নয়। ২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে স্পেন। কিন্তু আয়োজনের দিক থেকে যদি কোনো শহর নিজেকে সত্যিকারের বিজয়ী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে থাকে, তবে সেই নাম নিঃসন্দেহে ভ্যাঙ্কুভার।
তথ্যসূত্র:
Sports Illustrated
FIFA World Cup 26 Vancouver









