
টরন্টো ডাউনটাউনের স্টারবাকসের সেই নির্দিষ্ট টেবিলটিতে প্রায়ই দেখা মেলে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া কয়েকজন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর। স্টাইলিশ হেয়ারকাট, ঝকঝকে জ্যাকেট, দামি মোবাইল হাতে তাদের দেখলেই মনে হয় তারা একেকজন অভিজাত পরিবারের উত্তরাধিকারী। এছাড়া তাদের কথায় উচ্চারণের টানে বাংলাদেশী আবহ স্পষ্ট। হ্যাঁ, এরা সবাই বাংলাদেশ থেকে আগত।
এই তরুণ-তরুণীরা অন্যান্যদের মতো কানাডার বহুজাতিক শহরে স্বপ্ন খুঁজতে এসেছে। কিন্তু তাদেরই কেউ কেউ—অজান্তেই বা ইচ্ছাকৃতভাবে—জড়িয়ে পড়েছে এমন এক ছায়াময় জগতে, যেখানে প্রযুক্তির ভেতর লুকিয়ে আছে অপরাধের কুশলী ছক।
জানা যায়, ২০২০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত টরন্টো ও আশেপাশের অঞ্চলে একটি বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত স্ক্যামিং চক্র কানাডার রাজস্ব সংস্থা CRA (Canada Revenue Agency)-এর নাম ব্যবহার করে সংঘবদ্ধ আর্থিক প্রতারণা চালায়। তারা শতাধিক অভিবাসীকে লক্ষ্য করে প্রতারণা চালায় এবং প্রায় ১.২ মিলিয়ন কানাডিয়ান ডলার হাতিয়ে নেয়। তবে এ পর্যন্ত মোট অর্থের মধ্যে মাত্র $২৩০,০০০ ডলার উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে, যা বিভিন্ন ক্রিপ্টো ওয়ালেট থেকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।
এই চক্রের অপারেশন ছিল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত। তারা একটি তিন-স্তরবিশিষ্ট হায়ারার্কি (Hierarchy) তৈরি করেছিল—নেতৃত্বে ছিল দুইজন, যারা কিচেনার, ওয়াটারলু, কেমব্রিজ ও টরন্টো থেকে স্ক্রিপ্ট ডিজাইন করত। তাদের অধীনে ছিল চারজন কল সেন্টার অপারেটর, যারা মিসিসাগার একটি রেন্টেড অফিসে বসে প্রতিদিন কয়েকশো ফোন করত। নিচের স্তরে মানি মিউল (Money Mule) হিসেবে নিয়োজিত ছিল দুইজন শিক্ষার্থী, যারা নিজেদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট এবং ক্রিপ্টো ওয়ালেট ব্যবহার করত অর্থ পাচারে।
স্ক্যামের মূল কৌশল ছিল ভয় দেখিয়ে টাকা আদায়। স্ক্যামাররা CRA-এর আসল নম্বরের মতো দেখতে VoIP সফটওয়্যারের মাধ্যমে ফোন করত, যেখানে কলার আইডিতে দেখা যেত 1-800-959-8281। তারা বলত, “আপনার ট্যাক্স বাকি আছে। আপনি এখনই পরিশোধ না করলে জেল হবে বা আপনাকে ডিপোর্ট করা হবে।” কিছু ক্ষেত্রে, তারা ভুক্তভোগীদের ফেক CRA ওয়েবসাইটে রিডাইরেক্ট করত এবং সেখান থেকে ব্যাংক ডিটেইলস ও SIN নম্বর সংগ্রহ করত।
অবাক করার মতো তথ্য হলো, তারা একটি ৫৬ পৃষ্ঠার ট্রেনিং ম্যানুয়াল ব্যবহার করত। এতে ছিল ফেক স্ক্রিপ্ট, কানাডিয়ান একসেন্ট প্র্যাকটিস, এমনকি সাইকোলজিক্যাল স্ক্রিপ্টও—যেমন “আপনার স্পনসরশিপ বাতিল হতে পারে,” যা নতুন অভিবাসীদের মনে আতঙ্ক তৈরি করত। স্ক্যামাররা টরন্টোর দুইজন ইমিগ্রেশন কনসালট্যান্টকে অর্থ দিয়ে সম্ভাব্য ভুক্তভোগীদের (যারা কানাডায় নতুন এসেছেন) টার্গেট লিস্ট সংগ্রহ করত, যা আদালতে প্রমাণিত হয়েছে।
RCMP এবং CRA-এর ফ্রড ইনভেস্টিগেশন টিম ২০২৩ সালের এপ্রিলে “Operation Maple Syrup” নামে একটি যৌথ অভিযান শুরু করে। অক্টোবর ২০২২ সালে একজন ভুক্তভোগীর অভিযোগের পর তারা “Project Octavia” নামে একটি টাস্কফোর্স গঠন করে। ফেব্রুয়ারিতে তারা মিসিসাগার একটি কনডোতে কল সেন্টারের খোঁজ পায়। এরপর এপ্রিলে ছয়টি স্থানে একযোগে অভিযান চালায় এবং আটজনকে গ্রেফতার করে।
২৫ জুন ২০২৪-এ টরন্টো PEEL পুলিশ আরও একজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারকে গ্রেফতার করে, যিনি এই স্ক্যাম চক্রের জন্য অটোমেটেড কল ডায়ালিং সিস্টেম তৈরি করেছিলেন।
জব্দ করা হয় ১৪টি ল্যাপটপ, ৩২টি সিম বক্স, ২০০+ ভুক্তভোগীর ব্যক্তিগত তথ্য, এবং CRA লোগো সহ ফেক লেটার। অভিযুক্তদের মধ্যে অন্যতম ছিল শফিকুল ইসলাম, যার বাড়ি কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে। সে ২০১৮ সালে স্টুডেন্ট ভিসায় কানাডায় আসে এবং পরে রেস্টুরেন্ট ব্যবসা শুরু করে। অপর এক সদস্য রহিমুল হক, ঢাকার মিরপুরের বাসিন্দা ও কম্পিউটার সায়েন্সের প্রাক্তন ছাত্র, যিনি ফিশিং টুল ডেভেলপ করতেন।
তাদের মধ্যে জেসমিন আক্তার নামের এক তরুণী ছিল মানি মিউল, যার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ৩২০,০০০ ডলার জমা পড়েছিল। সে সিলেটের জকিগঞ্জের মেয়ে।
এই অর্থের একটি বড় অংশ ট্রান্সফার করা হয়েছিল ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে—Binance ও LocalBitcoins ব্যবহার করে। RCMP তাদের ব্যাংক রিপোর্ট অনুযায়ী TD ও RBC-র ১২টি অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করে।
তদন্তের সময় তারা দেখতে পায়, এই স্ক্যামাররা একটি Google Sheet ব্যবহার করত যেখানে ১২০০+ বাংলাদেশি অভিবাসীর নাম, ট্যাক্স হিস্ট্রি, সোশ্যাল মিডিয়া প্রোফাইল, এমনকি ট্রমা-পয়েন্ট নোট করা ছিল।
তদন্তে RCMP-র ডিজিটাল ফরেনসিক টিম অভিযুক্তদের Google Drive থেকে “CRA_Scam_2023_Backup” ফাইল উদ্ধার করে, যেখানে ছিল ভুক্তভোগীদের ভয়েস রেকর্ডিং, ট্রানজেকশন ডেটা, এবং কল অপারেটরদের রেটিং ফর্ম।
এই মামলার চার্জসমূহের মধ্যে রয়েছে:
Fraud Over $5,000 (Criminal Code Section 380): সর্বোচ্চ ১৪ বছর কারাদণ্ড।
Identity Fraud (Section 403): সর্বোচ্চ ৫ বছর।
Money Laundering (Proceeds of Crime Act): সর্বোচ্চ ১০ বছর।
২৫ জুন ২০২৪-এ টরন্টোতে মামলার শুনানির সময় প্রধান বিচারপতি মন্তব্য করেন, “এটি কানাডার ইতিহাসে সবচেয়ে সুপরিকল্পিত CRA ইম্পারসনেশন কেস।”
এই মামলাটি বর্তমানে Ontario Superior Court of Justice-এ চলমান।
অভিযুক্তদের মধ্যে ৫ জন জামিনে মুক্ত হয়েছে। তবে এদের শরীরে বিশেষ একটি ইলেকট্রনিক মনিটরিং ডিভাইস স্থাপন করা হয়েছে (তারা কোথায় যায়, কোথায় খায়, কার সাথে কথা বলে) যাতে তাদের সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রাখা যায়। দল নেতা শফিকুল ইসলাম সহ বাকি দুইজন পুলিশের বিশেষ তত্বাবধানে রয়েছে। তাদের সকলের পাসপোর্ট জব্দ করা হয়েছে।
বর্তমানে CRA তাদের সিস্টেমে Two-Factor Authentication বাধ্যতামূলক করেছে এবং এখন ফোন কলের সাথে একটি রেফারেন্স নম্বর দেয় যা গ্রাহককে অনলাইন অ্যাকাউন্টে যাচাই করতে হয়।
সর্বশেষ, নতুন আরেকটি গ্রুপের সন্ধান মিলেছে, এরা AI ভয়েস ক্লোনিং টেকনোলজি ব্যবহার করে স্ক্যাম চালাচ্ছে। আত্মীয়স্বজনের কণ্ঠস্বর নকল করে ফোন করে তারা জরুরি আর্থিক অনুরোধ জানায়।
যদি আপনার বা পরিচিত কারো কাছে CRA-এর নামে সন্দেহজনক ফোন আসে, তবে অবিলম্বে রিপোর্ট করুন Canadian Anti-Fraud Centre-এ: 1-888-495-8501 অথবা তাদের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে।
(আইনি ও নৈতিক কারণে এ চক্রের সাথে সংশ্লিষ্ট সকলের প্রকৃত নাম গোপন রাখা হয়েছে। সংযুক্ত ছবিটি প্রতীকী।)









