সম্পাদকের পাতা

ফিনিক্স শহর যে গল্পের সাক্ষী

নজরুল মিন্টো

ফিনিক্স শহরের আকাশে তখনও পূর্ণোদয়ের আলো ছড়িয়ে পড়েনি, কাচের জানালায় ভেসে বেড়াচ্ছিল বিবর্ণ সোনালি আভা। পাখিরা ডাকছিল, অথচ সেই ডাকে ছিল না কোনো সুর—ছিল কেবল এক রুদ্ধ হাহাকার। অ্যারিজোনার ল্যাভিন এলাকার ৪০তম অ্যাভিনিউ আর বেসলাইন রোডের সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে থাকা একটি সাধারণ দোতলা বাড়িতে শুরু হয়েছিল এক অসাধারণ সকালের নির্মম ট্র্যাজেডি। এই গল্পটি কোনো রূপকথা নয়। এটি এক নিঃশব্দ বিচ্ছেদের, চাপা দীর্ঘশ্বাসের, এবং এমন এক অভিবাসী জীবনের গল্প—যেখানে স্বপ্নের দেশও শেষমেশ মৃত্যুস্থল হয়ে দাঁড়ায়।

সাইদা সোহালি আক্তার সেই ভোরেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন—আর নয়। দীর্ঘ ২৯ বছরের দাম্পত্যে যা হারিয়েছেন, তার মধ্যে সবকিছুর চেয়ে বেশি কেটেছে নিজের আত্মমর্যাদা। আজ তিনি স্বামী আবুল আহসান হাবিবের পাশে নয়, বরং পুলিশের সাহায্যে মুক্তির পথে হাঁটবেন। এই দেশ, যুক্তরাষ্ট্র, তাকে অন্তত একটি সুরক্ষা আদেশ তো দিতে পারে, পারে তো একটুখানি নিশ্চিন্ত নিঃশ্বাস।

তাদের দুই ছেলে—একজন ২৬, আরেকজন ২১ বছরের। বড় ছেলেটি ছিল তখন ঘরের বাইরে। আর ছোটটি, মায়ের পাশে, এক ধৈর্যশীল পাহারাদারের মতো। সকালের ৯টা ২৬ মিনিটে ফিনিক্স পুলিশ এসে পৌঁছাল। দুজন অফিসার গেটের সামনে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা করল, “Ma’am, are you okay?” তিনি ‘ওকে’ ছিলেন না।

মাগুরা জেলার এক নিরীহ পাড়ায় একদিন জন্ম নিয়েছিল এই গল্পের শুরু। হাবিব ছিলেন এলাকার পরিচিত মুখ—মধ্যবিত্ত ঘরের মেধাবী ছেলে। আর সাইদা—সুন্দরী, বিনয়ী, স্বপ্নদ্রষ্টা। প্রেম হয়নি, কিন্তু শ্রদ্ধা ছিল, ছিল এক ধরনের পারিবারিক সম্মতি। ২৯ বছর আগে, সমাজের ছকে বাধা বিয়েতে কোনো প্রণয়ের প্রয়োজন হয়নি। প্রথমে ঢাকায়, পরে আমেরিকায়।

২০০৬ সালে তারা অভিবাসন পান যুক্তরাষ্ট্রে। শুরুটা ছিল কঠিন, কিন্তু সম্ভবনাময়। হাবিব একটি রেস্টুরেন্টে কাজ নেন, সাইদা বিউটিশিয়ান হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলেন। সন্তানদের স্কুলে ভর্তি করানো, ছোট ছোট ঘরের মধ্যে বড় বড় স্বপ্ন বোনা—সবকিছুই চলছিল ছিমছাম। কিন্তু স্বপ্ন অনেক সময় একপাক্ষিক হয়।

ক্যান্সারে আক্রান্ত হাবিব ক্রমে হয়ে উঠলেন এক বিষণ্ণ, অস্থির পুরুষ। আর্থিক অনিশ্চয়তা, শারীরিক যন্ত্রণা, এবং অনুশোচনার এক অদৃশ্য আগুনে পুড়তে পুড়তে তিনি হয়ে উঠলেন সহিংস। হাতে হাত নয়, উঠে এলো কণ্ঠে গালি, আচরণে খোঁচা। সাইদা সহ্য করেছেন—সন্তানদের মুখ চেয়ে। পুলিশ একাধিকবার এসেছে—তবে কোনো ফাইল খুলে আর কিছু হয়নি।

কোভিড মহামারিতে তারা দুজনই চাকরি হারান। হাবিবের মানসিক অবস্থা আরও ভেঙে পড়ে। তিনি অবিশ্বাসী হয়ে পড়েন, ভাবেন সবাই তাকে ছেড়ে যাবে। সাইদা তখনো চুপচাপ মেনে নেন। কিন্তু সেপ্টেম্বরের সেই সকালে, তিনি অন্যরকম এক সিদ্ধান্ত নিলেন।

শেষ ফোনকল
৯টা ২৬ মিনিটে পুলিশ এসে কিছু কাগজ বুঝিয়ে দিয়ে বলে, “Here is how you file a protection order.” তারা চলে যায়।

৯টা ৫১ মিনিটে সাইদা আবার ফোন করেন। তিনি ছিলেন আতঙ্কিত, কাঁপছিলেন। পুলিশ তখনো ফোনের অপর প্রান্তে—হঠাৎ গুলির শব্দ।

ফিনিক্স পুলিশ ছুটে আসে। ভেতরে পড়ে আছে দুইটি নিথর দেহ। হাবিবের হাতে ধরা একটি রিভলভার, যার গুলিতে সাইদার বুক চিরে গেছে, আর নিজের কপালেও রেখেছে শেষ চিহ্ন।

ঘরের দেয়ালে ঝুলানো দেয়ালঘড়ি থেমে গেছে ৯টা ৫৩ মিনিটে। রান্নাঘরের টেবিলে পড়ে আছে দুটো মগ—একটিতে আধা খাওয়া কফি, অন্যটি খালি। ফ্রিজের গায়ে একটুকরো নোট—“Dinner at 8 – boys’ favorite.” কে জানত, সেই রাত আর কারো হবে না।

ছোট ছেলে তখন মাত্র বাইরে গিয়েছিল কিছু বাজার আনতে। ফিরে এসে দেখেন পুলিশ, অ্যাম্বুলেন্স, আর এক মহা নিরবতা।

ফিনিক্স শহর এই গল্পের সাক্ষী। একটি দম্পতির ধ্বংস, দুই সন্তানের জীবনের চিরস্থায়ী দাগ, এবং সমাজের কাছে প্রশ্নচিহ্ন হয়ে রইল এই মৃত্যু।


Back to top button
🌐 Read in Your Language