সম্পাদকের পাতা

অস্ট্রেলিয়ায় সড়ক দুর্ঘটনায় বাংলাদেশি শিক্ষার্থী তাসনিম ঐশির মৃত্যু

নজরুল মিন্টো

উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন নিয়ে দেশ ছেড়েছিলেন মাত্র তিন মাস আগে। সামনে ছিল নতুন জীবন, নতুন বিশ্ববিদ্যালয়, নতুন অভিজ্ঞতা। বাংলাদেশের পরিচিত ক্যাম্পাস ছেড়ে পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার এক বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজের পরবর্তী অধ্যায় শুরু করেছিলেন তাসনিম ঐশি। কিন্তু সেই পথচলাই থেমে গেল এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায়। বৃহস্পতিবার সকালে পার্থের উত্তরে ইন্ডিয়ান ওশান ড্রাইভে প্রাণ হারিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এই শিক্ষার্থী। একই গাড়িতে থাকা আরও তিন বাংলাদেশি আহত হয়েছেন। কয়েক হাজার মাইল দূরে থাকা পরিবার, আত্মীয়স্বজন, সহপাঠী ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য ৮ অক্টোবরের সকালটি হয়ে উঠেছে গভীর বেদনার এক দিন।

পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার ব্রেটন বে এলাকায় সিবার্ড রোডের কাছাকাছি ইন্ডিয়ান ওশান ড্রাইভে স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার সকাল ৭টা ৪৫ মিনিটে দুর্ঘটনাটি ঘটে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ধূসর রঙের একটি BMW সেডান দক্ষিণমুখে যাচ্ছিল। একপর্যায়ে গাড়িটি রাস্তা থেকে সরে গিয়ে গাছের সঙ্গে সজোরে ধাক্কা খায়। এতে গাড়িটির সামনের যাত্রী আসনে বসা ২২ বছর বয়সী তাসনিম ঐশি ঘটনাস্থলেই মারা যান। তাঁর সঙ্গে থাকা বাকি তিনজন আহত হন।

দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থলে ছুটে যায় পুলিশ, সেন্ট জন অ্যাম্বুলেন্স, দমকল ও জরুরি সেবার একাধিক দল। পাঠানো হয় উদ্ধারকারী হেলিকপ্টারও। গাড়িটি রাস্তার ধারের গাছপালা ও ঝোপের মধ্যে ঢুকে পড়ায় উদ্ধারকর্মীদের কাজ আরও কঠিন হয়ে ওঠে। তারা ধ্বংসস্তূপ ও গাছের ডালপালা সরিয়ে গাড়ির ভেতরে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন। তাসনিম তখন গুরুতর অবস্থায় গাড়ির ভেতরে আটকা পড়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। উদ্ধারকাজ শেষ হওয়ার পর সড়কটি কয়েক ঘণ্টা বন্ধ রাখা হয়।

তাসনিম ঐশির পরিচয় এখন এই ট্র্যাজেডির কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইন্যান্স বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী ছিলেন। উচ্চশিক্ষার জন্য প্রায় তিন মাস আগে অস্ট্রেলিয়ায় যান এবং এডিথ কোয়ান ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা শুরু করেন। এক তরুণ শিক্ষার্থীর এই আকস্মিক মৃত্যু শুধু তাঁর পরিবারের জন্য নয়, বরং দেশের শিক্ষাঙ্গন ও প্রবাসী বাংলাদেশি সমাজের জন্যও বড় শোকের খবর হয়ে এসেছে। যে শিক্ষাজীবন অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত খুলে দেওয়ার কথা ছিল, সেটিই শেষ হলো এক নির্মম দুর্ঘটনায়।

আহত তিন বাংলাদেশির নাম লাবিব, ঈশিতা ও বিপুল বলে জানা গেছে। অস্ট্রেলীয় সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, আহতদের মধ্যে ২১ বছর বয়সী চালকসহ তিনজন রয়েছেন। অন্য দুই যাত্রী একজন পুরুষ ও একজন নারী, উভয়ের বয়স বিশের কোঠায়। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, তাঁদের আঘাত গুরুতর নয়।

ইন্ডিয়ান ওশান ড্রাইভ পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার একটি সুপরিচিত উপকূলীয় সড়ক। পার্থের উত্তরাঞ্চল থেকে বিস্তৃত এই মহাসড়ক দিয়ে পর্যটক, স্থানীয় বাসিন্দা এবং দূরপাল্লার চালকরা নিয়মিত যাতায়াত করেন। সমুদ্রঘেঁষা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণে এটি অনেকের কাছে আকর্ষণীয় একটি পথ হলেও সড়কটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে একের পর এক গুরুতর দুর্ঘটনার ইতিহাস। সিবার্ড, ল্যান্সেলিন, গ্যাবাডাহসহ আশপাশের এলাকায় অতীতেও একাধিক প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা ঘটেছে। তাই বৃহস্পতিবারের এই দুর্ঘটনা নতুন করে সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার উপপ্রধানমন্ত্রী রিটা সাফিওটি দূরপাল্লার যাত্রীদের সতর্ক থাকার, যাত্রাপথে বিরতি নেওয়ার এবং পূর্ণ মনোযোগ রেখে গাড়ি চালানোর আহ্বান জানিয়েছেন।

তাসনিম ঐশির মৃত্যু অস্ট্রেলিয়ায় উচ্চশিক্ষা নিতে যাওয়া বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জীবনযাত্রার বাস্তবতাকেও সামনে এনে দিয়েছে। প্রতি বছর বহু তরুণ-তরুণী উন্নত শিক্ষার সুযোগ ও উজ্জ্বল ভবিষ্যতের আশায় দেশ ছেড়ে অস্ট্রেলিয়ায় যান। সেখানে গিয়ে তাঁদের অনেককেই নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের চাপ, বাসস্থান, কাজ, যাতায়াত, মানসিক চাপ, আর্থিক টানাপোড়েন সব মিলিয়ে প্রবাসজীবনের শুরুর সময়টা সহজ হয় না। তাসনিমও হয়তো সেই স্বাভাবিক সংগ্রামের মধ্য দিয়েই নিজের পথ গড়ে নিচ্ছিলেন। কিন্তু জীবনের সেই সফর নির্মমভাবে থেমে গেল এমন এক সময়ে, যখন তাঁর সামনে ছিল দীর্ঘ ভবিষ্যৎ।

বাংলাদেশে তাঁর পরিবারের জন্য এ খবর এক অপূরণীয় আঘাত। যে মেয়েকে উচ্চশিক্ষার জন্য অনেক আশা নিয়ে এত দূরে পাঠানো হয়েছিল, তাঁর ফেরার কথা ছিল অর্জন ও অভিজ্ঞতার গল্প নিয়ে। সেই জায়গায় এখন ফিরে এসেছে মৃত্যুসংবাদ। অন্যদিকে আহত লাবিব, ঈশিতা ও বিপুলের পরিবারও উৎকণ্ঠায় রয়েছেন। তাঁরা দ্রুত সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসবেন, এখন সেটিই স্বজনদের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।

পার্থের বাংলাদেশি কমিউনিটির ভেতরেও নেমে এসেছে শোক। প্রবাসজীবনে এমন দুর্যোগে স্বদেশিদের পাশে দাঁড়ানো একটি বড় মানবিক দায়িত্ব। কমিউনিটির সদস্যরা আহতদের খোঁজখবর নিচ্ছেন, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছেন এবং প্রয়োজনে সহায়তার পথও খুঁজছেন। বিদেশের মাটিতে একজনের বিপদ প্রায়ই সবার বেদনায় পরিণত হয়। তাসনিম ঐশির মৃত্যু সেই প্রবাসী সংহতির অনুভূতিকেও নতুন করে নাড়া দিয়েছে।

তথ্যসূত্র: WA Police, 7NEWS Australia, The West Australian, Yanchep News Online

Back to top button
🌐 Read in Your Language